আজকে যারা নিজেদের ওয়ারাছাতুল আম্বিয়া ওয়াল মুরছালিন বলে দাবি করে বেড়াচ্ছে, যারা নিজেদের ইছলামের ঠিকাদার বলে থাকে, বা নিজের ব্লাইন্ড ফলোয়ার দিয়ে মানুষকে কনভিন্স করে গুমরাহ করছে, তারা কি আসলেই দ্বীনের মুবাল্লিগ। একজন মুবাল্লিগ্ব আসলে কেমন হবে? দ্বীনের খেদমতগার য়া’লিমকে কেমন হতে হবে? অলি-আউলিয়াকে কেমন হতে হবে? একেবারে হুবুহু সেরূপ, যেরূপ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম করে দেখিয়েছেন, তাইনা?
য়া’লিম, মুয়া’ল্লিম, মুবাল্লিগ্বের সঙ্গা সহজে বোঝার জন্যে পবিত্র আল কুরআনের কয়েকটি আয়াত শরীফ আমি আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপন করবো। যাতে আপনাদের পূর্ণ ধারনা চলে আসে, তাদের ব্যপারে যাদের আমরা য়া’লিম, মুফতি, দ্বীনের ঠিকাদার মনে করতেছি, তাদের মধ্যে কি এই ছিরত বিদ্যমান যা ছুন্নাহ হিসেবে নিজেদের মধ্যে কায়েম করার কথা ছিলো?
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (یَرۡفَعِ اللّٰهُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡكُمۡ ۙ وَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡعِلۡمَ دَرَجٰتٍ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ) তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের মর্যাদা উন্নীত করেন। আর যাদেরকে (মহান আল্লাহ তায়ালা) ঈলম আতা করে (য়া’লিম) বানিয়েছেন, তিনি তাদের উচ্চ মাক্বাম আতা করেন। আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমরা যা করো সে সম্পর্কে সম্যক অবগত। (ছুরা মুজাদালাহ ৫৮:১১)
মহান আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ (اِنَّمَا یَخۡشَی اللّٰهَ مِنۡ عِبَادِهِ الۡعُلَمٰٓؤُا ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِیۡزٌ غَفُوۡرٌ) মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বান্দাদের মধ্যে প্রকৃত উ’লামায়ে কেরাম তাঁরাই, যারা সত্যিকার অর্থে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকেই ভয় করেন (অর্থাৎ ক্বলবে খাশিহ লাভ করেন)। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা পরাক্রমশালী ও অতিশয় ক্ষমাশীল। (ছুরা ফাতির ৩৫:২৮)
আর য়া’লিম ও অজ্ঞের মধ্যে তফাৎ এনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (قُلۡ هَلۡ یَسۡتَوِی الَّذِیۡنَ یَعۡلَمُوۡنَ وَ الَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ؕ اِنَّمَا یَتَذَكَّرُ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ) (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি তাদের বলুনঃ যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? (না, কখনোই নয়)। বরং (এই কথাগুলো) কেবল তারাই অনুধাবন করে, যাদের রয়েছে অন্তর্দৃষ্টি ও বিবেক। (ছুরা ঝুমার ৩৯/৯)
আর হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (عَنْ أَبِي أُمَامَةَ الْبَاهِلِيِّ، قَالَ ذُكِرَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَجُلاَنِ أَحَدُهُمَا عَابِدٌ وَالآخَرُ عَالِمٌ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " فَضْلُ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِي عَلَى أَدْنَاكُمْ " . ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " إِنَّ اللَّهَ وَمَلاَئِكَتَهُ وَأَهْلَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ حَتَّى النَّمْلَةَ فِي جُحْرِهَا وَحَتَّى الْحُوتَ لَيُصَلُّونَ عَلَى مُعَلِّمِ النَّاسِ الْخَيْرَ) হযরত আবূ উমামাহ আল-বাহিলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-এর নিকট দুই ব্যক্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হলঃ- তাদের একজন ছিলেন আ’বিদ (ঈবাদতকারী), আর অন্যজন ছিলেন য়া’লিম (ঈলমুল্লার অধিকারী)। তখন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেনঃ একজন য়া’লিমের মর্যাদা একজন য়া’বিদের উপর এমন, যেমন আমার মর্যাদা তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে নিচু স্তরের একজনের উপর।” এরপর রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’য়ালা, তাঁর ফেরেশতাগণ, আসমান ও যমীনের সকল বস্তুঃ- এমনকি তার গর্তের ভিতরে থাকা পিঁপড়া পর্যন্ত, এবং মাছ পর্যন্ত, তারা সবাই মানুষের মাঝে কল্যাণ শিক্ষা দানকারী ব্যক্তির জন্য দরূদ পাঠ করে। (তিরমিজী ২৬৮৫)
কালামুল্লাহ শরীফ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সিফত মুবাল্লিগ হিসেবে কীরূপ ছিলেন তা বর্ণনা করতেছেন। মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেনঃ (ہُوَ الَّذِیۡ بَعَثَ فِی الۡاُمِّیّٖنَ رَسُوۡلًا مِّنۡہُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ وَ یُزَکِّیۡہِمۡ وَ یُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَ الۡحِکۡمَۃَ وَ اِنۡ کَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ لَفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ) তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি জাহিল আরবদের মধ্যে থেকে তাদেরই একজনকে রছুল বানিয়ে পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের উপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার আয়াত শরীফ সমূহ তিলাওয়াত করেন। আর তাদের নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করেন, এবং পবিত্র কিতাব (আল ক্বুরআনর জাহেরি বাতেনি) ঈলম শিক্ষা দেন, ও (বাতেনী য়ী’লম বোঝার) হিকমত বা প্রজ্ঞার দীক্ষাও দেন। অথচ এ লোকগুলোই (রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আসার) আগে (পর্যন্ত) সুস্পষ্ট গুমরাহীতে নিমজ্জিত ছিলো। (সূরাহ জুমুয়াহ শরীফ ৬২/২) মহান আল্লাহ তা’য়ালা তিনি একিই বিষয়ে আরো স্পষ্ট করেই বলেনঃ (كَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا فِیۡكُمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡكُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡكُمۡ اٰیٰتِنَا وَ یُزَكِّیۡكُمۡ وَ یُعَلِّمُكُمُ الۡكِتٰبَ وَ الۡحِكۡمَۃَ وَ یُعَلِّمُكُمۡ مَّا لَمۡ تَكُوۡنُوۡا تَعۡلَمُوۡنَ) (সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্যে) যেভাবে আমি তোমাদের মধ্যে থেকেই একজনকে রছূল বানিয়ে পাঠিয়েছি, যিনি তোমাদের উপর আমার আয়াত শরীফ সমূহ তিলাওয়াত করবেন, আর তোমাদের নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করে দেবেন, এবং পবিত্র কিতাব (আল ক্বুরআনর জাহেরি বাতেনি) ঈলম শিক্ষা দেবেন আর (বাতেনী য়ী’লম বোঝার) হিকমত বা প্রজ্ঞার দীক্ষা সহ এমন বিষয়েরও দীক্ষা দিবেন, যা এর আগে তোমরা জানতেই না। (ছুরা বাকারা শরীফঃ ২/১৫১)
প্রথমতো (أُمِّيِّيْنَ) “উম্মিয়্যিনা” দ্বারা এমন আরবদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাদের অধিকাংশ জাহেলিয়াতে লিপ্ত ছিলো। কিন্তু এদেরকে বিশেষ করে উল্লেখ করার অর্থ এই নয় যে, রছুলে পাক ছল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার রিছালাত অন্য কোন মিল্লাতের জন্য ছিল না। কিন্তু সর্বপ্রথম যেহেতু সম্বোধন তাদেরকেই করা হয়েছে, তাই তাদের উপর ছিল মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বেশী অনুগ্রহ।
মুয়াল্লীম হিসেবে নবী-রাসূল য়ালাইহিমুছ ছালাম প্রেরণের উদ্দেশ্য বর্ণনা প্রসঙ্গে রছুলে পাক ছল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার তিনটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছেঃ
১) প্রথমতোঃ আল কুরআনের আয়াত শরীফ মানুষের উপর তেলাওয়াতের গূন। আয়াতে বর্ণিত ‘তেলাওয়াত’ শব্দের বাহ্যিক অর্থ অনুসরণ করা। পরিভাষায় শব্দটি কালাম পাঠ করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। (آيَات) ‘আয়াত’ বলে আল কুরআনের আয়াত শরীফকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ রছুলে পাক ছল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামকে প্রেরণ করার এক উদ্দেশ্য এই যে, তিনি মানুষের উপর আল কুরআনের আয়াতসমূহ পাঠ করবেন।
২) দ্বিতীয় হচ্ছেঃ উম্মতকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল প্রকার অপবিত্ৰতা থেকে পবিত্র করা, আয়াতে উল্লেখিত (يُزَكِّيهِمْ) শব্দটি ‘তাযকিয়াহ’ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। ‘তাযকিয়াহ’ শব্দটি অভ্যন্তরীণ দোষ থেকে পবিত্র করার অর্থে অধিকতর ব্যবহৃত হয়; অৰ্থাৎ নফসের পূজায় লিপ্ত হয়ে কুফর, শিরক ও কুচরিত্ৰতায় যারা ডুবে থাকে তাদের পবিত্র করা। কোন সময় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সর্বপ্রকার পবিত্রতার জন্যেও ব্যবহৃত হয়। এখানে এই ব্যাপক অর্থই উদ্দেশ্য।
৩) কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়া। এখানে ‘কিতাব’ বলে পবিত্র ক্বুরআন এবং হিকমত’ বলে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম থেকে বর্ণিত উক্তিগত ও কর্মগত শিক্ষাসমূহ বোঝানো হয়েছে বলে অধিকাংশ তফছীরকারক এখানে হিকমতের তাফসীর করেছেন ছুন্নাহ। (ফাতহুল কাদীর)
যাইহোক আমরা ইনশাআল্লাহ আমাদের ঈলম দ্বারা এঁর যতটুকু হক্ব ব্যখ্যা করা যায় করবো।
মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, ঐ জাহিল অর্থাৎ আরবদের মধ্যে তিনি স্বীয় রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামকে প্রেরণ করেন। এটা এই জন্যে যে, যেন হযরত ইবরাহীম য়ালাইহিছ ছালামের দোয়া কবূল হয়েছে এটা বোঝা যায়। তিনি মক্কা শরীফ বাসীর জন্যে আল্লাহ্ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেছিলেন যে, (رَبَّنَا وَ ابۡعَثۡ فِیۡهِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡهُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡهِمۡ اٰیٰتِكَ وَ یُعَلِّمُهُمُ الۡكِتٰبَ وَ الۡحِكۡمَۃَ وَ یُزَكِّیۡهِمۡ ؕ اِنَّكَ اَنۡتَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَكِیۡمُ) হে আমাদের রব! আপনি তাদের মধ্য থেকে তাদেরই একজনকে রছুল বানিয়ে পাঠিয়ে দিন, যিনি তাদের উপর আপনার আয়াত শরীফ সমূহ তিলাওয়াত করবেন, এবং পবিত্র কিতাব (আল ক্বুরআনর জাহেরি বাতেনি) ঈলম শিক্ষা দেবেন আর (সেই অনুসারে চলার কৌশল) হিকমতের দীক্ষাও দিবেন, এবং তাদের নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করবেন। নিশ্চয়ই আপনি মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (ছুরা বাক্বরহ ২/১২৯) এটা ছিলো ইবরাহীম য়ালাইহিছ ছালাম উনার শেষ দোয়া। মহান আল্লাহ তা'য়ালা হযরত ইবরাহীম য়ালাইহিছ ছালামের এ দোয়াও কবূল করেন। ঐ সময় সমস্ত মাখলুকের জন্যে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের কঠিন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। আহলে কিতাবের শুধুমাত্র কতক লোক হযরত ঈসা য়ালাইহিছ ছালামের সত্য দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। উনারা ‘গুলু’ ‘জফা’ ইফরাত ও তাফরীত হতে বেঁচে ছিলেন। তাঁরা ছাড়া দুনিয়ার সমস্ত মানুষ সত্য দ্বীনকে ভুলে বসেছিল এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালার অসন্তুষ্টির কাজে জড়িয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় রছুল ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামকে প্রেরণ করলেন। তিনি ঐ নিরক্ষরদের উপর মহান আল্লাহ তা’য়ালার আয়াতসমূহ পাঠ করলেন, তাদেরকে নফসের নাপাকি হতে পবিত্র করলেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিলেন। অথচ ইতিপূর্বে তারা ঘোর বিভ্রান্তিতে ছিল। আরবরা হযরত ইবরাহীম আলাহিছ ছালামের দ্বীনের দাবীদার ছিল বটে, কিন্তু অবস্থা এই ছিল যে, তারা ঐ দ্বীনকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও বদল করে ফেলেছিল। তারা ঐ দ্বীনের মধ্যে এতো বেশী পরিবর্তন আনয়ন করেছিল যে, তাওহীদ শিরকে এবং বিশ্বাস সন্দেহে পরিবর্তিত হয়েছিল। তারা নিজেরাই বহু কিছু বিদআত আবিষ্কার করে নিয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালার দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছিল যেরূপ আজ সহিহ দ্বীনের ঠিকাদার আহলে হাদিছ, ছালাফি, দেওবন্দি, ও কথিত অনেক ছুন্নীই করেছে কিন্তু মানতে নারাজ। অনুরূপভাবে আহলে কিতাবও তাদের কিতাবগুলো বদলিয়ে দিয়েছিল, সাথে সাথে অর্থেরও পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। সুতরাং মহান আল্লাহ তা’য়ালা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামকে আযীমুশশান শরীয়ত এবং পরিপূর্ণ দ্বীনসহ দুনিয়াবাসীর নিকট প্রেরণ করেন, যেন তিনি এই গোলযোগ মিটিয়ে দিতে পারেন। তিনি যেন আহলে কিতাবের নিকট মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার আসল আহকাম পৌঁছিয়ে দেন, উনার সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির আহকাম জনগণকে জানিয়ে দেন, এমন আমল তাদেরকে বাতলিয়ে দেন যা তাদেরকে বেহেশতের নিকটবর্তী করবে এবং জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ লাভ করাবে, তিনি সমস্ত মাখলুকের জন্যে পথ প্রদর্শক হোন, শরীয়ত তরিকত মা’য়রিফাত হক্বিকতের মূল সকল শাখাই শিক্ষা দেন, ছোট বড় কোন কথা ও কাজ না ছাড়েন, সবারই সমস্ত শক-সন্দেহ দূর করে দেন এবং জনগণকে এমন দ্বীনের উপর আনয়ন করেন যার মধ্যে সর্বপ্রকারের মঙ্গল বিদ্যমান রয়েছে। এসব মহান দায়িত্ব পালনের জন্যে মহান আল্লাহ তায়ালা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের মধ্যে এমন শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গী ইন্সটল করে প্রেরন করেন যা না উনার পূর্বে কারো মধ্যে ছিল এবং না উনার পরে কারো মধ্যে থাকবে।
মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেনঃ (كَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا فِیۡكُمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡكُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡكُمۡ اٰیٰتِنَا وَ یُزَكِّیۡكُمۡ وَ یُعَلِّمُكُمُ الۡكِتٰبَ وَ الۡحِكۡمَۃَ وَ یُعَلِّمُكُمۡ مَّا لَمۡ تَكُوۡنُوۡا تَعۡلَمُوۡنَ فَاذۡكُرُوۡنِیۡۤ اَذۡكُرۡكُمۡ وَ اشۡكُرُوۡا لِیۡ وَ لَا تَكۡفُرُوۡنِ) (সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্যে) যেভাবে আমি তোমাদের মধ্যে থেকেই একজনকে রছূল বানিয়ে পাঠিয়েছি, যিনি তোমাদের উপর আমার আয়াত শরীফ সমূহ তিলাওয়াত করবেন, আর তোমাদের নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করে দেবেন, এবং পবিত্র কিতাব (আল ক্বুরআনর জাহেরি বাতেনি) ঈলম শিক্ষা দেবেন আর (বাতেনী য়ী’লম বোঝার) হিকমত বা প্রজ্ঞার দীক্ষা সহ এমন বিষয়েরও দীক্ষা দিবেন, যা এর আগে তোমরা জানতেই না। অতএব (এই নিয়ামত লাভের কারনে) তোমরা আমার যিকির করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করবো। আর তোমরা আমার শাকির বান্দা হয়ে যাও, অকৃতজ্ঞ হয়ে আমার সাথে কুফরী করো না। (ছুরাহ বাকারা শরীফঃ ২/১৫১-১৫২) একিই বিষয়ের আলাপই করছেন, তবে এইখানে স্পষ্ট করেই বলেছেন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম মুমিনদের জন্যে কি, যেমনঃ (لَقَدۡ مَنَّ اللّٰهُ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اِذۡ بَعَثَ فِیۡهِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡ اَنۡفُسِهِمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡهِمۡ اٰیٰتِهٖ وَ یُزَكِّیۡهِمۡ وَ یُعَلِّمُهُمُ الۡكِتٰبَ وَ الۡحِكۡمَۃَ ۚ وَ اِنۡ كَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ لَفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা মু’মিনদের উপর বড় অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদেরই মধ্যে থেকে তাদেরই একজনকে রছূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের উপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার আয়াত শরীফ সমূহ তিলাওয়াত করেন। আর তাদের নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করেন, এবং পবিত্র কিতাব (আল ক্বুরআনর জাহেরি বাতেনি) ঈলম শিক্ষা দেন আর (সেই অনুসারে চলার কৌশল) হিকমতেরও দীক্ষা দেন। অথচ এ লোকগুলোই (রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আসার) আগ (পর্যন্ত) সুস্পষ্ট গুমরাহীতে নিমজ্জিত ছিলো। (ছুরাহ আলে ইমরান ৩/১৬৪) এই আয়াত প্রমাণ করে, রছূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হলেন আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত। আর নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া করা কুরআনেরই নির্দেশ। এই নির্দেশ কেবল হাক্বিকি ঈবাদতকারিই মানতে পারবে, লোক দেখানো আ’বিদ, নামাজী, মুল্লা, ওয়াজি, মুফতির পক্ষে সম্ভব না, যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِن كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ) তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার শুকরিয়া আদায় করো, যদি তোমরা উনারই ঈবাদত করে থাকো। (ছুরা বাকারা শরীফঃ ২/১৭২)
আয়াতের তাফসীরে কিতাবে হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের পার্শ্বে বসেছিলাম এমন সময় উনার ওপর ছুরাহ জুম’য়াহ শরীফ অবতীর্ণ হয়। জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম! (اَخَرِيْنَ مِنْهُمْ) দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে?” কিন্তু তিনি কোন উত্তর দিলেন না। তিনবার এই প্রশ্ন করা হয়। আমাদের মধ্যে হযরত ছালমান ফারসী য়ালাইহিছ ছালাম তিনিও ছিলেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মুবারক হাতখানা হযরত ছালমান ফারসী য়ালাইহিছ ছালামের উপর রেখে বললেনঃ “ঈমান যদি সারিয়্যা নক্ষত্রের নিকট হতো তাহলেও এই লোকগুলোর মধ্যে এক বা কয়েক ব্যক্তি এটা পেয়ে যেতো।” এ রিওয়াইয়াত দ্বারা বোঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী ছুরাহ এবং এটাও প্রমাণিত হচ্ছে যে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে নবী, শুধু আরববাসীদের জন্যে নন। কেননা, তিনি এই আয়াত শরীফের তাফসীরে পারস্যবাসীদের সম্পর্কে উপরোক্তে মন্তব্য করেন। এ জন্যেই তো রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম পারস্য ও রোমের সম্রাটদের নিকট ইছলামের দাওয়াতনামা প্রেরণ করেছিলেন।
যাইহোক এবার আমরা মূল ব্যখ্যায় চলে যাই। আপনি যখন ক্বুরআন তিলাওয়াত করেন তখন কার উপর তা পাঠ করেন? যখন আপনার ছফিনা খতম করা হয় মাইকে সারা রাত ধরে, তখন সেই হাফিজ কার উপর তিলাওয়াত করে? যখন ক্বুররা তার সুরেলা কন্ঠের কারনে আল ক্বুরআনর মাহফিলে ডাক পায় টাকার বিনিময়ে গিয়ে তিলাওয়াত করে কার উপর তিলাওয়াত করে? বাস্তবতা হলো এরা আল ক্বুরআনর তিলাওয়াত করাই কেবল শিখেছে, কিন্তু এরা এটা শিখেনাই মানুষের উপর কীভাবে ক্বুরআন পাঠ করা হবে। (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ) আর তিনি (অর্থাৎ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) উনার যারা উম্মত তাদের উপর আল ক্বুরআনুল কারিমের তিলাওয়াত করেন। নিজের উম্মতদের উপর। জানার বিষয় হলো ক্বলামুল্লাহ শরীফের তিলাওয়াত কারো উপর করার মানে আসলে কি? যখন কেউ ক্বুরআন পাঠ করে, আর তখন তার জবান তার ক্বলবের সাথে যুক্ত থাকে, আর ক্বুরআন পাঠ করা হয়, যার সম্মুখে পাঠ করা হয়, কুরআনের সেই আয়াত ও তিলাওয়াত থেকে উৎপন্ন নূর তার কলবের মধ্যে চিরস্থায়ী ইন্সটল হয়ে যায়। এই হচ্ছেন (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ)। যদি কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তাহলে সম্মুখে যে বসা থাকবে শোনার জন্যে, তার কলবের মধ্যে সেই আয়াত ও তিলাওয়াত থেকে উৎপন্ন নূর তার কলবের মধ্যে চিরস্থায়ী ইন্সটল হয়ে যাবে। এই জীবনে আর ঐ আয়াত শরীফের নূর ও ফায়েজ কখনোই কমবেনা। অর্থাৎ আয়াত শরীফের মধ্যে হুকুম আহকাম নামক কমান্ডের যে প্রোগ্রাম বিদ্যমান থাকবে তা কলব নামক দেহ ডিভাইসের অপারেটিং সিস্টেমে ডেফল্ট প্রোগ্রাম হিসেবে লকড অবস্থায় ইন্সটল হয়ে যাবে। কোন সয়তান ভাইরাস হয়ে হানা দিলেও তা ডিলিটের কোন অপশন থাকবেনা। বরং যখন প্রয়োজন হবে নির্দ্বিধায় সেই আয়াতগুলি অটো রান করবে হুকুম আহকাম হিসেবে দৈনন্দিন জীবনে।
(یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ) তো এক তো এই কোয়ালিটি থাকা দরকার য়া’লিমে হক্বের মধ্যে। কি ধরণের কোয়ালিটি? সে যখন কালামুল্লাহ শরীফের তিলাওয়াত করে, তখন শ্রবণকারীর ক্বলবের মধ্যে সেই আয়াত শরীফ নূর সহ ইন্সটল হয়ে যায়। যেরূপ আমরা ক্বলবি যিকির করলে, পাক জাতের হক্ব নাম “আল্লাহু” আমাদের কলবে যান এবং প্রত্যেকটা হৃদস্পন্দনের সাথে ঘষা খান ফলে নূর উৎপন্ন হয়। তেমনি কালামুল্লাহ শরীফের আয়াতের মধ্যে ঘর্ষণ জরুরী নূর বানাতে হলে। এখন তুমি ক্বুরআন শরীফ যে শ্রবন করো, স্বাধ পাওনা তাইনা? ক্বুরআন শরীফ কি? নূর বানানোর কাঁচামাল। উদাহরণস্বরূপ তোমাকে কোন খাবার রান্না করতে হবে, তোমাকে সিলেটের আখনি বানাতে হবে। তো এর কাঁচামাল কি? চাল, তেল, মশলা, গোশত। অনুরূপভাবে ক্বুরআনুল কারীম হলেন নূর বানানোর, ইমান বানানোর উপাদান। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম যখন উম্মতের উপর আয়াত শরীফ পাঠ করতেন তখন উনার সকল লতিফাই এই তিলাওয়াতে শরীক হতেন। আর ভেতরে ঘর্ষণের ফলে নূর বাহীরে আসতেন। ক্বুরআনুল কারিমের আয়াত শরীফ মুহম্মদি সিনার সাথে ঘর্ষণ খান, এরপর জবান মুবারকের সাথে ঘর্ষণ খেয়ে সোজা আপনার কলবে গিয়ে ইন্সটল হয়ে যায়। (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ) তিনি তোমাদের উপর আয়াত শরীফ পাঠ করেন, এক তো হলো তিলাওয়াত করা, কিন্তু এটা সেটা না, ক্বুরআনুল কারিম বলছেন (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ) তাদের উপর পাঠ করুন। অতএব যারা উনার হাক্বিকি ছ্বহবত নিতে আসতো, তখন ছ্বহবতের ফলে তাদের ক্বলব জারি হতো, আর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তখন যে তিলাওয়াল করতেন তা তাদের কলবে ইন্সটল হয়ে যেতো। যারা ছ্বহবতে উন্মাদ থাকতো যেমন আছ্বহাবে ছুফফা, তাদের শুধু ক্বলবই না রূহ-ও মুনাওয়ার ছিলো, জারি ছিলো, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তখন উনার তিলাওয়াত তাদের ক্বলব রূহ উভয়েই ইন্সটল হয়ে যেত।
ঈলমের চেয়ে সহবত কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা একটি হাদিছ শরীফ বল্লেই বুঝতে পারবেন?
রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের কাতিব হানযালাহ আল উছাইয়িদী রদ্বিআল্লাহু আনহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিআল্লাহু আনহু আমার সঙ্গে দেখা করলেন এবং আমাকে প্রশ্ন করলেন, হে হানযালাহ! রদ্বিআল্লাহু আনহু আপনি কেমন আছেন? তিনি বলেন, জবাবে আমি বললাম, হানযালাহ্ তো মুনাফিক হয়ে গেছে। আবু বকর ছিদ্দীক য়ালাইহিছ ছালাম সে সময় বললেন, সুবহানাল্লাহ আপনি এটা কি বলছেন? হানযালাহ রদ্বিআল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, যখন আমরা রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের কাছে থাকি, তিনি আমাদের আখিরাত তথা যান্নাত ও যাহান্নামের কথা শুনিয়ে দেন, যেন আমরা উভয়টি চাক্ষুষ দেখছি। কিন্তু যখন আমরা রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের ছ্বহবত থেকে বের হয়ে আপনজন, স্ত্রী-সন্তান এবং ধন-সম্পদের মধ্যে নিমগ্ন হয়ে যাই তখন আমরা এর অনেক বিষয়ই ভুলে যাই। আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিআল্লাহু আনহু বললেন, মহান আল্লাহ তা’য়ালার কছম আমারও একই অবস্থা। নিশ্চয়ই আমরা এ বিষয় নিয়ে (রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের) সাক্ষাৎ করবো। তারপর আমি এবং আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিআল্লাহু আনহু রওনা করলাম এবং এমনকি রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের কাছে চলে গেলাম। আমি বললাম, ইয়া রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম, হানযালাহ্ মুনাফিক হয়ে গেছে। রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, তা কীরূপে?
আমি বললাম, আমরা যখন আপনার ছ্বহবতে থাকি, আপনি আমাদের যান্নাত-যাহান্নামের কথা স্বরন করিয়ে দেন, যেন আমরা তা সরাসরি দেখতে পাই। তারপর আমরা যখন আপনার নিকট হতে বের হই এবং স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদের মধ্যে নিমগ্ন হই সেসময় আমরা এর অনেক বিষয় ভুলে যাই। রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেনঃ যে সত্তার হাতে আমার জীবন আমি উনার কসম করে বলছি! আমার ছ্বহবতে থাকাকালে তোমাদের যে অবস্থা হয়, যদি তোমরা সবসময় এ অবস্থায় অনড় থাকতে এবং সার্বক্ষণিক মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকিরে পড়ে থাকতে, তাহলে অবশ্যই ফেরেশতা য়ালাইহিমুছ ছালামগণ তোমাদের বিছানায় ও রাস্তায় তোমাদের সাথে মুসাফাহ করতেন। কিন্তু হে হানযালাহ! এক ঘণ্টা (মহান আল্লাহ তায়ালার জিকরে) আর এক ঘণ্টা (দুনিয়াবী কাজে ব্যয় করবে) অর্থাৎ আস্তে আস্তে (চেষ্টা কর)। এ কথাটি তিনি (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) তিনবার বললেন। (ইছলামিক ফাউন্ডেশন ৬৭১৩, ইছলামিক সেন্টার ৬৭৬৯)। এই হচ্ছে ছ্বহবতে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম। এখন কথা হলো উনারা ছ্বহবতে থেকে কি শিখতেন? দেখি হাদিছে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামে কি আছে। জুনদুব বিন আবদুল্লাহ্ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের ছ্বহবতে ছিলাম। আমরা ছিলাম শক্তিশালী এবং সক্ষম যুবক সম্প্রদায়। আমরা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের থেকে ক্বুরআনুল কারিম শেখার পূর্বে ঈমান শিখতাম, অতঃপর ক্বুরআন শিখতাম, তখন ক্বুরআন শরীফ পাঠ করলে ইহা দ্বারা আমাদের ঈমান বেড়ে যেত। (ইবনে মাজাহ শরীফ ৬১)
এখন যারা য়া’লীম, ওয়ারাছাতুল আম্বিয়া দাবীদার, তারা কি এরূপ ছ্বহবতে ঈমান আতা করে? আচ্ছা কারো ক্বলবে ঈমান কীভাবে ঢুকাতে হয় তারা কি তা জানে?
যাইহোক আবার চলে আসি মূল প্রসঙ্গেঃ (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ) তিনি তোমাদের উপর আয়াত শরীফ পাঠ করেন। অর্থাৎ তুমি এমনভাবে আয়াত শরীফ পাঠ করো, যেনো তোমার সিনা থেকে আয়াত শরীফের হুকুম আহকাম ও নূর মুবারক বের হয়ে সম্মুখে থাকা সবার ক্বলবের মধ্যে দাখিল হয়ে যায়, ইন্সটল হয়ে যায়। কখনোই আর ডিলিট না হয়। একেবারে ডিফল্ট হয়েই যেনো ইন্সটল হয়। (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ) মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুম অনুসারে এটাই প্রথম গূন একজন হাক্বিকি য়া’লীমের। য়া’লিম হলে এরূপই হও, কেনো এরূপ হবে? বলো? জবাব দাও? কারন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এরূপ করে দেখিয়েছেন। এটাই য়া’লিম হওয়ার প্রথম ছুন্নাহ। তোমাদের নিকট শুধু মানুষের বাড়িতে কদু দিয়ে গোশত খাওয়া, মিষ্টি খওয়া, রমজান এলে খেজুর খাওয়া ছুন্নত স্বরনে আছে?
এই ছুন্নাহ কোথায় যাবে? সবচেয়ে বড় ছুন্নাহ? রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামইতো দ্বীনের তাবলীগের মাধ্যমে ইছলাম প্রচার করেছেন। তো তুমি কোন ধরণের ইছলাম প্রচার করে বেড়াচ্ছ? তাবলীগে দ্বীনের বেলায় কেনো তুমি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছুন্নতের উপর আমল করনা? ঐরকম তাবলীগ কেনো করনা যেরকম রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম দ্বীনের তাবলীগ করে দেখিয়েছেন, আমাদের করার জন্য ছুন্নাহ হিসেবে রেখে গেছেন। অনুরূপ তিলাওয়াত করো যেরূপ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তিলাওয়াত করেছেন। (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ) আমার পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমার আয়াত শরীফ সমূহ পাঠ করেন তোমাদের উপর। তো আমরা প্রথম গূন পেয়ে গেলাম প্রকৃত য়া’লীমে দ্বীনের। কিন্তু আমাদের মধ্যে যারা য়া’লিম বা ক্বুররা আছে তাদেরকে কি (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ) এর মিছদ্বাক হিসেবে পাওয়া যাবে? না কস্মিনকালেও না। আমাদের সম্মুখে থাকা ছালাফি আহলে হাদিছের মুল্লাদের যাদের এখন ইছলামের ঠিকাদার হিসেবে মনে করা হয়, যারা ক্বুরআন শরীফের আয়াত সমূহ পাঠ করে থাকে, অথচ তা তাদের নিজেদের কোন কাজে আসেনা সেখানে এই আয়াত শরীফের মিছদ্বাক কীভাবে হবে? যেমন, হাদিছ শরীফে এসেছেঃ
মাওলা আলী কাররমাল্লাহু ওয়াঝাহু য়ালাইহিছ ছালাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, শেষ যামানায় এমন একদল মানুষের আবির্ভাব হবে, যারা হবে কমবয়স্ক এবং যাদের বুদ্ধি হবে স্বল্প। তবে এদের কথা হবে মনোমুগ্ধকর ভালো হক্ব কথা, কিন্তু তারা ইছলাম থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেভাবে ধনুক থেকে তীর বেরিয়ে যায়। তাদের ঈমান তাদের গলার নিচে পৌঁছবে না অর্থাৎ কলব পর্যন্ত যাবেনা। (বুখারী শরীফ ৫০৫৭)
এইযে ছালাফি বক্তারা আজকে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া ও লাইফে বিদ্যমান, উপরোক্ত হাদিছ শরীফের সকল গূনই এদের মধ্যে বিদ্যমান। প্রথমত এদের বয়স কম। প্রজ্ঞা, বুদ্ধি ও হিকমাহ নাই। যদিওবা তারা মানুষকে মনোমুগ্ধকর ভালো হক্ব কথা বলবে কিন্তু তারা পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। তারা কিছু অংশ মানবে কিছু মানবে না। তারা ক্বুরআন পাঠকারী হবে, তবে ক্বুরআন বুঝতে তারা সক্ষম হবে না। ঈলমগত দৈন্যতা থাকবে।
যেমন আবু সাঈদ খুদরী রদ্বিআল্লাহু আনহু বলেনঃ আমরা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের নিকটে উপস্থিত ছিলাম। তিনি গণীমতের কিছু মাল বণ্টন করছিলেন। তখন বনু তামীম গোত্রের ‘যুল খুওয়াইছারা’ নামক এক ব্যক্তি এসে বলল, হে নবী! আপনি ইনছাফ করুন’। তখন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, তোমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি ইনছাফ না করি, তাহ’লে কে ইনছাফ করবে? আমি যদি ইনছাফ না করি, তাহ’লে তো তুমি ধ্বংসপ্রাপ্ত ও নিষ্ফল হবে। সাইয়্যিদুনা হজরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিআল্লাহু আনহু বললেন, ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম! আপনি আমাকে অনুমতি দিন, আমি এর গর্দান উড়িয়ে দেই। তিনি বললেন, ‘ওকে যেতে দাও। (অন্য বর্ণনায় তিনি বললেন) ‘না, আমি মহান আল্লাহ তাআলার নিকট পানাহ চাই, তুমি যদি এমন কাজ কর, তাহলে লোকেরা বলবে, আমি আমার সাথীদের হত্যা করি। (তোমরা না জানলেও আমি জানি) তার এমন কিছু সঙ্গী-সাথী রয়েছে, যাদের নামাযের তুলনায় তোমাদের নিজের নামায এবং তাদের রোজার তুলনায় তোমাদের নিজেদের রোজাকে তুচ্ছ মনে হবে তোমাদের নিকট। অথচ এরা ক্বুরআন পাঠ করে ঠিকই, কিন্তু ক্বুরআন তাদের কণ্ঠনালীর নিম্নদেশে প্রবেশ করে না। এরা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে, যেমন তীর শিকার ভেদ করে বেরিয়ে যায়। অন্য বর্ণনায় এসেছে, লোকটি চলে যাওয়ার পর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, ঐ ব্যক্তির বংশ থেকে এমন কিছু লোক আসবে যারা ক্বুরআন পড়বে ঠিকই, কিন্তু ক্বুরআন তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তারা ইছলাম থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেমন শিকারের দেহ ভেদ করে তীর বের হয়ে যায়। এই ব্যক্তিই ছিল প্রথম ‘খারেজী’ যে নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের বণ্টনের ব্যাপারে প্রশ্ন তোলে এবং নিজ প্রবৃত্তির রায়কে প্রাধান্য দেয় অর্থাৎ নিজ নফসের আনুগত্য করে। (বুখারী শরীফঃ ৩৬১০, ৭৪৩২, মুসলিম শরীফ ১০৬৩, ১০৬৪; মিশকাত ৫৮৯৪)
অতএব এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে এইযে সালাফি আহলে হাদিসের কথিত যুবক য়া’লিম সম্প্রদায় রয়েছে যারা মনোমুগ্ধকর ভালো হক্ব কথা বলছে ঠিকিই কিন্তু তা তাদের নিজেদের কলবেই ঢুকছেনা সেখানে (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ) এঁর মিছদ্বাক হিসেবে তাদেরকে চিন্তা করাই হাস্যকর।
এবার আসি, দ্বিতীয় গূনের ব্যপারে। দ্বিতীয় গূন কি? (وَ یُزَکِّیۡہِمۡ) আমার পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তোমাদের নফসের তাজকিয়া করে থাকেন। তামাম দুনিয়ার মধ্যে যতো ফেরকা, যতো দল মত আছে, তাদের সবাইকে সম্মান ও ইজ্জতের সাথেই বলছি, তোমাদের মধ্যে যদি এই গূন না থাকে তাহলে মিম্বরে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম থেকে সরে দাড়াও। টাকার বিনিময়ে করা ওয়াজ নসিহতকে দ্বীনের কাজ হিসেবে বলা ছেড়ে দাও। নিজেকে আর য়া’লিম বলনা। য়া’লিম তখন বলবে যখন সুন্নতে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামে এসে যাবে। আর মুবাল্লীগদের জন্যে সুন্নতে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হচ্ছেন তিনি কুরআনের আয়াত পাঠ করে শ্রবণকারীদের কলবকে রৌওশন করে দিবে। (وَ یُزَکِّیۡہِمۡ) আর তোমাদের নফসের তাজকিয়া করে থাকেন। এরপর (وَ یُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَ الۡحِکۡمَۃَ) প্রথমে তো তিলাওয়ার দ্বারা আয়াত শরীফের হুকুম ও আহকাম নূর সহ সিনার মধ্যে ইন্সটল করে দেবেন। যা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার কলবে আল্লাহ পাক জিব্রাইল য়ালাইহিছ ছালাম দ্বারা ইঙ্ক্রিপ্টেড অবস্থায় ইন্সটল করিয়ে দেন আযাযিলের বাহিনী শায়াতিন নামক ভাইরাসদের আক্রমণ ছাড়া। হুজুরে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মাকাম এমন যে তিনি উনার কলবে ইন্সটল করা সেই কালামে নূরুল্লাহ উম্মতের কলবে ইন্সটল করে দিবেন। একারনেই (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ) তিনি পাঠ করেন আমার আয়াত তোমাদের উপর আর তোমাদের নফসের তাজকিয়া করে থাকেন। (وَ یُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَ الۡحِکۡمَۃَ) আর এই যে কিতাব আল ক্বুরআন এর ইলিম তোমাদের হাদিয়া করে থাকেন। (وَ الۡحِکۡمَۃَ) আর এই কিতাবের যে রাজ, যা আম পাবলিক বা সাধারণ মানুষের বোঝের বাহীরে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম সেই হিকমত বা ঈলমও তোমাদের আতা করেন।
এখন তিন জিনিষ এখান থেকে ক্লিয়ার হয়ে গেছে। (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ) তিনি আয়াত শরীফকে ট্র্যান্সফার করেন তিলাওয়াত দ্বারা আর তোমাদের সিনার মধ্যে তা ইন্সটল করে দেন নূর সহ যা উনার সিনার মধ্যে ইন্সটল করে দিয়েছিলেন আল্লাহ পাক। (وَ یُزَکِّیۡہِمۡ) আর তোমাদের পাক পবিত্র করেন, তোমাদের নফসের তাজকিয়া করে থাকেন। আর তোমাদের সিনায় এই কিতাবের ইলিমও ইন্সটল করে দেন, এছাড়াও ইন্সটল করেন কিতাবের ইলমের সাথে সেটা গভীরভাবে বোঝার হিকমত। এখন তোমরা আমাকে বলো, এখানে একটা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছেঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম যাদের মধ্যে এই তিন জিনিষ ইন্সটল করে দিয়েছেন তারাই কি হাক্বিকি য়া’লিম নন? তাহলে সেই তরীকায় শতাব্দীর পর শতাব্দী যারা এই ধারা অব্যাহত রেখে চলেছেন তারাই কি মূল য়া’লিম নন? নাকি কথিত সার্টিফিকেট ওয়ালা মুল্লারাই হাক্বিকি য়া’লিম যাদের মধ্যে এই তিন গূন বিদ্যামান নাই? এখন কেউ ফেইক না রিয়েল এর প্রমান কীভাবে হবে? যদি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম থেকে তালীমের এই পর্যন্ত ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে তাহলে এই তিন গুন মওজুদ থাকবে। আর সেটা কি কি? (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ وَ یُزَکِّیۡہِمۡ وَ یُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَ الۡحِکۡمَۃَ) অতএব উক্ত তিন জিনিসের নূর তোমার সিনায় যদি য়া’লিম দাবিকারী ইন্সটলে ব্যর্থ হয় তাহলে বুঝে নেবে সে ফেইক য়া’লিম। (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ وَ یُزَکِّیۡہِمۡ) আর যদি তার ছ্বহবতে তোমার নফসের তাজকিয়া না হয় তাহলে সে ফেইক, মিথ্যা য়া’লিম। আর এই কিতাবের ঈলম ও হিকমত তথা তাবিল, বাতেনি তাফসীর তোমার ক্বলবে সিনায় ইন্সটল করতে না পারে তাহলে সে ফেইক মিথ্যা য়া’লিম। যে তা’য়লীম ক্রমান্বয়ে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার থেকে এসেছে বা উনি সরাসরি কাউকে রুহানীভাবে শিক্ষা দিয়েছেন তার মধ্যে এই তিন জিনিসের ক্ষমতা মওজুদ থাকবেই। না থাকলে ফেইক। তুমি তার ছ্বহবতে বসবে, সে তোমাদের উপর আয়াত পাঠ করবে আর এর নূর তোমার সিনায় ইন্সটল হয়ে যাবে (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ)। তুমি সেই আলীমের ছ্বহবতে বসবে তিনি দৃষ্টি দিয়ে তোমার নফসের তাজকিয়া করে দেবেন। নিজে নিজেই উপলব্ধি করবে যে জীবন বদলে যাচ্ছে। অটোম্যাটিক গুনাহের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি হয়ে যাবে। কোন কিছুই করার দরকার নাই, কেবল তার সোহবতেই বসে থাকো এতেই তোমার জীবন বদলে যাবে বুঝতে পারবে যে আলীমের দেখা পেয়ে গেছো। অতএব মানুষকে ছ্বহবতে বসিয়ে তাদের নফছের তাজকিয়া করাই ছুন্নতে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম। আর এরূপ মানুষকেই আহলে জিকর বলা হয়ে থাকে যাদের থেকে দ্বীন শিখতে মহান আল্লাহ পাক উনার সরাসরি হকুম বিদ্যমানঃ (فَسۡـَٔلُوۡۤا اَہۡلَ الذِّکۡرِ اِنۡ کُنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ) দ্বীনের কোন বিষয়ে তোমরা যদি না জানো তাহলে যারা আমার আহলে জিকর বা (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ وَ یُزَکِّیۡہِمۡ وَ یُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَ الۡحِکۡمَۃَ) এর তিন কুসুসিয়াত ওয়ালা য়া’লিম তাদের থেকে জেনে নাও, বলা হয়নি ফেইসবুকার, ইউটিউবার, বা টেলিভিশন মুল্লা থেকে ঈলম, দ্বীন অর্জন করতে।
মানুষ ডিগ্রী ওয়ালা মুলভি খুব পছন্দ করে আজকাল, তাই ভাবলাম মুলবির সঙ্গা দেই, যেনো কথাবার্তা বললে হুস থাকে কোথায় কি বলছে। তাই যারা জ্ঞানি তারা কি করবে? ডিগ্রী ওয়াল মুলবি খুজবে ফেইসবুক, ইউটিউব, টেলিভিশনে নাকি (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ)’র ফায়েজ তার সিনার মধ্যে ফিল হচ্ছে কিনা সেটা দেখবে? অতঃপর দেখবে (وَ یُزَکِّیۡہِمۡ) সে কি তাদের নফছের তাজকিয়া করতে সক্ষম কি না। তো নফছের তাজকিয়া করা কি হলো? ছুন্নতে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম।
আজকে মানুষ যখন য়া’লিম উলামার নিকট যায়, তারা যে ক্বুরআনুল কারিমের আয়াত শরীফ পাঠ করে, তখন কি সে এই পজিশনে উপস্থিত থাকে? (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ) না বরং তখন যারা শুনতে যায় তাদের অশিকাংশই গাফেল থাকে, বিলিভ হয়না? তাহলে যেকোন ক্বুরআনখানীতে, মিলাদ মাহফিলের আলোচনায় চেয়ে দেখ মনোযোগ দিয়ে, দেখবে অধিকাংশ মোবাইলে ব্যাস্ত নতুবা গল্পে। এর কারন কি? এর কারন কোন য়া’লিম আজ পর্যন্ত তাদের উপর আয়াত শরীফ পাঠ করে আয়াত শরীফের হুকুম আহকাম সহ নূর মুবারক ইন্সটল করতে পারেনাই তাই তারা মালিকের ঐ হুকুমেরও ভয় করেনা (وَ اِذَا قُرِیٴَ الۡقُرۡاٰنُ فَاسۡتَمِعُوۡا لَهٗ وَ اَنۡصِتُوۡا لَعَلَّکُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ) যখন (তোমাদের সম্মুখে) আল কুরআনের তিলাওয়াত করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগের সাথে উনাকে শ্রবণ করবে এবং নীরব নিশ্চুপ হয়ে থাকবে, যাতে করে তোমরা রহমত লাভ করতে পারো। (ছুরাহ আল আ’য়রফ ৭/২০৪) এখন আমাদের জানা য়া’লীমের পাঠ করা আয়াত শরীফ ও উনার নূর মুবারক কীভাবে ইন্সটল হবে? এরা যারা য়া’লিম তারা নিজেরাই জানেনা যে য়া’লিম হতে হলে উক্ত ৩ গূনের অধিকারী হতে হবে।
আজকে আমাদের যারা কথিত দুনিয়া খেয়ে মোটা মোটা পেট বানানো য়া’লিম, বাবা, মুফতি, মুহাদ্দিছেরা, তারা যদি (یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ) এর মিছদ্বাক হতো তাহলে মসজিদের ছফ ভরাই থাকতো ফজর ইশায় আর জুমুয়াহ শরীফের নামাজে। অথচ কি দেখা যায়? জুমুয়াহ শরীফের খুতবার সময় আমাদের এইসব মোটা মোটা আল্লামার আয়াত পাঠের বিপরীতে মসজিদের বাহীরে বসে মানুষ আড্ডা দিচ্ছে, অনেকে তো আবার খুৎবাকেই বেছে নেয় ঘুমানোর মুক্ষম সময় মনে করে। আবার অনেকে ইকামত শুরু হলেই মসজিদে ঢুকে দুই রাকাত পড়েই দেয় দৌড়।
এছাড়াও যে নিজেকে ওয়ারাছাতুল আম্বিয়া ওয়াল মুরছালিন বলে সমাজে জাহির করতে চায়, সে প্রথমেই জেনে নিবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ওয়ারিশ হতে হলে নবীজি নিজের পরিচয় কীভাবে দিচ্ছেন ওয়ারিশ দাবীদারদের ব্যপারে তা জানা। জাবের বিন আবদুল্লাহ রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত তিনি বলেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ (إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَبْعَثْنِي مُعَنِّتًا وَلَا مُتَعَنِّتًا وَلَكِنْ بَعَثَنِي مُعَلِّمًا مُيَسِّرًا) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে কঠোরতা আরোপকারী কিংবা দ্বীনের কঠিন বিধান জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া ব্যক্তি হিসেবে নয়; বরং সহজভাবে তা’য়লীম প্রদানকারী এক মু’য়াল্লিম হিসেবে প্রেরণ করেছেন। (মুছলিম শরীফ ১৪৭৮)
তিনি উক্ত হাদিছে পাকে ৪ টি জিনিসের কথা বলেছেন, দুইটা মু’য়াল্লীম হিসেবে উনার মধ্যে নাই, আর মু’য়াল্লীম হিসেবে দুইটা উনার মধ্যে আছে, বা আল্লাহ পাক দিয়ে পাঠিয়েছেন।
যা নাই সেগুলো হলোঃ
مُعَنِّتًا - শাব্দিক অর্থঃ কষ্টদাতা, কষ্ট সৃষ্টি করে এমন ব্যক্তি, কষ্ট
দিয়ে পরীক্ষা নেয় বা ভার চাপায়, যেকোন কিছুতে বাধ্য করে এমন কঠোর শাসক।
مُتَعَنِّتًا - শাব্দিক অর্থঃ জেদ করে দ্বীনে কষ্টকর বিষয় চাপানো ব্যক্তি, অহংকারপূর্ণভাবে দ্বীনের কঠোরতা আরোপকারী, “হ্যাঁ আমি বলেছি, তাই মানো” এমন আচরণকারী ব্যক্তি, যুক্তিহীন এবং গোঁয়ার।
যা আছে সেগুলো হলোঃ
مُعَلِّمًا - শাব্দিক অর্থঃ ঈলম শিক্ষাদানকারী, যিনি মানুষকে ঈলম শিক্ষা দেন,
গাইড বা দীক্ষাদানকারী মুর্শিদ,
مُيَسِّرًا - শাব্দিক অর্থঃ সহজকারী, সহজ পথ দেখানো ব্যক্তি, যিনি জটিলতাকে সরিয়ে সহজতা আনার চেষ্টা করেন, যিনি সহজে বুঝিয়ে দেন জটিল করেন না।
এখন বুঝে নাও তোমরা যে য়া’লীম য়া’লীম জিকির করো যার তার বিষয়ে, তারা কি আদৌ য়া’লীম?
অতএব, একজন প্রকৃত য়’লিম হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি শুধু মুখে নয় বরং অন্তর দিয়ে ঈলম ধারণ করেন, এবং মানুষের অন্তরে নূর সৃষ্টি করেন। মানুষকে বেদ্বীন থেকে দ্বীনদার বানান। নবীর রেখে যাওয়া দ্বীনের উপর উনার উম্মতরা যাতে সঠিকভাবে পরিচালিত হয় সেই চেষ্টায় রত থাকেন।