
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিতে চাই। আমরা তামাকজাত জর্দাকে হারাম বলেছি কোনো ব্যক্তিগত অপছন্দ, সামাজিক রুচি কিংবা প্রচলিত অভ্যাসের বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যে নয়। বরং ক্বুরআন শরীফ, ছুন্নাহ শরীফ, উছূলে ফিক্বহ এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তথ্যসমূহ বিবেচনা করেই এই হুকুম প্রদান করেছি।
এক্ষেত্রে কারও ব্যক্তিগত অভ্যাসকে আক্রমণ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন জর্দা ব্যবহার করেছেন অথবা কোনো অজ্ঞ য়ালীম অতীতে একে মুবাহ বলেছেন, এই কারণে তাঁর প্রতি অসম্মান প্রদর্শনেরও অবকাশ নেই। তবে শরঈ হুকুম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তি, অভ্যাস কিংবা সামাজিক প্রচলনের চেয়ে দলিল এবং সেই দলিলের যথাযথ প্রয়োগই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
আমার আলোচনার বিষয় পানের সঙ্গে ব্যবহৃত তামাকজাত জর্দা। সাধারণ পানপাতা, তামাকবিহীন সুগন্ধি কিংবা অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্যকে এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না।
প্রথম দলিলঃ পবিত্র ও অপবিত্র বস্তুর বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বিধান
মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ (وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ) অর্থাৎ, আর তিনি তাদের জন্য পবিত্র ও উত্তম বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং তাদের জন্য নিকৃষ্ট ও অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করেন। (ছুরাহ আল-আ‘য়রাফ, আয়াত শরীফ ১৫৭।)
এই আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মাধ্যমে পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল এবং খবীছ বস্তুসমূহ হারাম হওয়ার মূলনীতি বর্ণনা করেছেন।
এখানে خَبَائِثَ শব্দটির তাৎপর্য বুঝতে হবে।
কোনো বস্তুকে শুধু ব্যক্তিগত অপছন্দ কিংবা দুর্গন্ধের ভিত্তিতে খবীছ সাব্যস্ত করার কোন সুযোগ নাই। শরীয়তের বিবেচনায় তার প্রকৃতি, ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দলিল দিয়েই কেবল তা সাব্যস্ত করা যায়।
সুতরাং জর্দাকে এই আয়াত শরীফের আওতায় আনার ক্ষেত্রে আমাদের ইস্তিদলাল কেবল তার স্বাদ, গন্ধ কিংবা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং এমন একটি তামাকজাত বস্তুর ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার মধ্যে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ক্ষতিকর ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানের উপস্থিতি চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত।
অর্থাৎ খবায়িছের সাধারণ নীতি, ক্ষতির নিষেধাজ্ঞা এবং জর্দার বাস্তব বৈশিষ্ট্য একত্রে বিবেচনা করেই তাহরীমের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হচ্ছে।
দ্বিতীয় দলিলঃ নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করার নিষেধাজ্ঞা
মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ (وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ) অর্থাৎ, আর তোমরা নিজেদের হাত দ্বারা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ, আয়াত শরীফ ১৯৫।)
এই আয়াত শরীফের অবতরণের প্রেক্ষাপট এবং তাফছীরের আলোচনায় মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথে ব্যয় করা ও তা পরিত্যাগের বিষয় রয়েছে। কাজেই আয়াত শরীফটি জর্দা সম্পর্কে সরাসরি নাযিল হয়েছে, এমন দাবি আমরা করতে যাচ্ছিনা কিন্তু আয়াত শরীফটির সঙ্গে অন্যান্য শরঈ দলিল মিলিয়ে আত্মবিনাশ ও গুরুতর ক্ষতির কারণ থেকে বিরত থাকার একটি সাধারণ নীতি আমরা সহজেই পাই।
এখানে প্রশ্ন হলো, কোনো মানুষ কি এমন একটি বস্তুকে নিয়মিত ভোগ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, যার সঙ্গে মুখগহ্বর, খাদ্যনালি ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত?
কেউ বলতে পারেন, জর্দা ব্যবহারকারী প্রত্যেক ব্যক্তির ক্যানসার হয় না। আমার জবাব হলো, প্রত্যেক ব্যক্তির ক্যানসার হওয়া কোনো বস্তুর ক্যানসার সৃষ্টিকারী প্রকৃতি প্রতিষ্ঠার শর্ত নয়। ক্ষতিকর বস্তুর প্রভাব ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু সেই কারণে বস্তুর প্রতিষ্ঠিত ক্ষতিকর প্রকৃতি অস্বীকার করা যায় না। শরীয়ত মানুষের জীবন ও সুস্থতা সংরক্ষণের বিধান দিয়েছেন। ফলে প্রমাণিত গুরুতর ক্ষতির কারণকে সাধারণ ভোগ্য অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়ে শরীয়তের ক্ষতি প্রতিরোধমূলক নীতিসমূহই প্রযোজ্য হবে।
তৃতীয় দলিলঃ আত্মবিনাশের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নির্দেশ
মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ (وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا) অর্থাৎ আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। (ছুরাহ আন-নিছা, আয়াত শরীফ ২৯।)
এখানেও একটি পার্থক্য পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন, জর্দা ব্যবহার করা সরাসরি আত্মহত্যা করার সমার্থক নয়। আমরা এ ধরনের কোনো সরলীকৃত দাবিও করতে যাচ্ছি না। তবে নিজের জীবনকে সংরক্ষণ করা এবং জীবননাশক ক্ষতির কারণ থেকে বিরত থাকা যে শরীয়তের উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত, এই আয়াত শরীফ সেই বিষয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
আমাদের শরীর আমাদের নিজস্ব ইচ্ছাধীন এমন কোনো সম্পদ নয়, যার ওপর মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বিধান উপেক্ষা করে যা ইচ্ছা তাই করার অনুমতি রয়েছে। সুতরাং শরীরের জন্য গুরুতর ক্ষতিকর কোনো বস্তুকে নিছক অভ্যাস, স্বাদ কিংবা সাময়িক প্রশান্তির উদ্দেশ্যে নিয়মিত গ্রহণ করার বৈধতা শরঈ দলিলের আলোকে বিচার করতে হবে।
চতুর্থ দলিলঃ ক্ষতি নিষিদ্ধকরণের সুস্পষ্ট হাদীছ শরীফ
রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেনঃ (لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ) নিজের কিংবা অপরের ওপর অন্যায়ভাবে ক্ষতি আরোপ করা বৈধ নয়। নিজে ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিক্রিয়ায় অন্যের ক্ষতি করাও যাবে না। (ছুনান ইবনে মাজাহ, হাদীছ শরীফ ২৩৪০ ও ২৩৪১।)
এই হাদীছ শরীফটি একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। পৃথক ছনদসমূহের মান নিয়ে মুহাদ্দিছগণের আলোচনা থাকলেও সম্মিলিত সূত্রের ভিত্তিতে হাদীছ শরীফটি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে এবং ফিক্বহের ক্ষতি প্রতিরোধমূলক মূলনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই হাদীছ শরীফ থেকে ফুক্বাহায়ে কিরাম একটি প্রসিদ্ধ ক্বায়িদাহ গ্রহণ করেছেনঃ (الضَّرَرُ يُزَالُ) ক্ষতি দূর করতে হবে। (মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, ধারা ২০।)
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, শরীয়তের দৃষ্টিতে ক্ষতি প্রতিরোধের নীতি কেবল অন্যের ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের নিজের ওপর সংঘটিত ক্ষতির ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক শরঈ বিধান কার্যকর হয়।
তবে সব ধরনের সামান্য অসুবিধা বা কাল্পনিক ঝুঁকিকে হারামের ইল্লত বানানো যায় না। এজন্য ক্ষতির প্রকৃতি, মাত্রা, বাস্তবতা ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বিবেচনা করা আবশ্যক। জর্দার ক্ষেত্রে এই আলোচনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে ক্ষতির দাবি কেবল অনুমান কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল নয়।
পঞ্চম দলিলঃ চিকিৎসাবিজ্ঞানে জর্দার ক্ষতিকর প্রকৃতি
বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান তামাকজাত ধোঁয়াবিহীন পণ্য সম্পর্কে যে তথ্য প্রতিষ্ঠা করেছে, তা এই মাছআলার তাহক্বীক্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা IARC ধোঁয়াবিহীন তামাককে মানুষের জন্য প্রমাণিত ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের National Cancer Institute এবং Centers for Disease Control and Prevention জানিয়েছে, ধোঁয়াবিহীন তামাক মুখগহ্বর, খাদ্যনালি ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার সৃষ্টি করে। এই জাতীয় তামাকে নিকোটিন রয়েছে, যা আসক্তি সৃষ্টি করে। এছাড়া তামাকের বিশেষ নাইট্রোসামিনসহ বিভিন্ন ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক উপাদানও এতে পাওয়া যায়। জর্দা পানের সঙ্গে গ্রহণ করা হয় বলে তার তামাকজাত বৈশিষ্ট্য বিলুপ্ত হয়ে যায় না।
পানের মধ্যে সুগন্ধি, মসলা কিংবা অন্যান্য উপাদান যুক্ত করলেও তামাকের ক্ষতিকর উপাদানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। তবে এখানে আমরা স্পষ্ট করছি, নিকোটিনের আসক্তি এবং মদের মতো নেশা বা ইছকারকে এক বিষয় সাব্যস্ত করছি না।
আমার ফতোয়ার মূল ইল্লত নেশাগ্রস্ততা নয়। বরং তামাকজাত জর্দার গুরুতর ও প্রতিষ্ঠিত শারীরিক ক্ষতি। অতএব, কেউ যদি আপত্তি করেন যে জর্দা খেলে মানুষের আক্বল বিলুপ্ত হয়ে যায় না, তাহলে তার জবাব হলো, আক্বল বিলুপ্ত হওয়া এই তাহরীমের একমাত্র কিংবা অপরিহার্য শর্ত নয়। কোনো বস্তুর নেশাদ্রব্য না হওয়া দ্বারা তার অন্যান্য শরঈ নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হওয়া প্রমাণিত হয় না।
ষষ্ঠ আলোচনাঃ হানাফি ফিক্বহে জর্দার বিধান
আমরা অবগত যে, তামাক সম্পর্কে পূর্ববর্তী অনেক ফক্বীহ এবং সম্মানিত উলামায়ে কিরামের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। কেউ একে মুবাহ বলেছেন, কেউ মাকরূহ বলেছেন, আবার ক্ষতিকর তামাক ব্যবহারকে নাজায়েযও বলেছেন। এই মতভিন্নতাকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। বরং আমার বক্তব্য হলো, শরঈ হুকুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বাস্তব বিষয় সম্পর্কে নতুন ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রতিষ্ঠিত হলে সেই তথ্যের আলোকে পূর্ববর্তী শর্তসাপেক্ষ সিদ্ধান্তের প্রয়োগ পুনর্বিবেচনা করা যায়।
এখানে হারাম জর্দাখোরদের জন্য তাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দের একটি ফতোয়া উল্লেখ করছিঃ (ফতোয়া নম্বর ৩৫৫/১৪৩/L=১৪৩৩, প্রশ্ন নম্বর ৩৬৩৬৭) এই ফতোয়ায় পানের সঙ্গে তামাক ও জর্দা ব্যবহারের বিষয়ে বলা হয়েছে, যে তামাক বা জর্দা নেশা সৃষ্টি করে অথবা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তা খাওয়া নাজায়েয। আর যে তামাক ক্ষতিকর নয়, নেশাও সৃষ্টি করে না এবং দুর্গন্ধও নেই, তার ক্ষেত্রে অনুমতির কথা বলা হয়েছে।
এখানে তাদের মুফতীগণের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই হলো, তারা ক্ষতিকর তামাকের জন্য অনুমতি প্রদান করেনি। অতএব, যারা এই ফতোয়ার অনুমতিসংক্রান্ত অংশ গ্রহণ করবে, তাদের ক্ষতির শর্তটিও বিবেচনা মেনে নিতে হবে।
এখন যদি চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য প্রমাণে দেখা যায়, প্রচলিত তামাকজাত জর্দা মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী, তাহলে তাকে ক্ষতিহীন তামাকের অন্তর্ভুক্ত করার যৌক্তিক ভিত্তি কোথায়?
এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী ফক্বীহগণের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং তাঁদের নির্ধারিত ক্ষতির শর্ত এবং বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য একত্রে বিবেচনা করাই যথাযথ পন্থা।
আমার সিদ্ধান্ত একটি দলিলভিত্তিক ইজতিহাদী তাহরীম। এর ভিত্তি হলো ক্ষতি নিষিদ্ধকরণের শরঈ নীতিমালা এবং তামাকজাত জর্দার ক্ষতিকর প্রকৃতি সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তথ্য।
সপ্তম আলোচনাঃ উছ্বূলে ফিক্বহের আলোকে তাহরীমের ভিত্তি
এখানে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে। প্রথমত, আল-আছ্বলঃ শরীয়তে অন্যায় ক্ষতি, আত্মবিনাশ এবং গুরুতর শারীরিক ক্ষতির কারণ গ্রহণের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আল-ইল্লাহঃ এই মাছআলায় বিবেচ্য ইল্লত হলো প্রমাণিত গুরুতর শারীরিক ক্ষতি এবং জীবননাশক রোগ সৃষ্টির ঝুঁকি।
তৃতীয়ত, তাহক্বীক্বুল মানাতঃ বাস্তব কোনো বস্তুর মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইল্লত বিদ্যমান কি না, তা নির্ণয় করা। জর্দার ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য তথ্য এই কাজটি সম্পন্ন করতে সহায়তা করে।
চতুর্থত, আল-হুক্মঃ সংশ্লিষ্ট ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠিত হলে ক্ষতি নিষিদ্ধকরণের সাধারণ শরঈ দলিল ও ক্বাওয়ায়িদের ভিত্তিতে তার ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
অতএব, এখানে আমরা জর্দাকে মদের সঙ্গে তুলনা করে তার হারাম হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি না। বরং শরীয়তের স্বতন্ত্র ক্ষতি প্রতিরোধমূলক নীতিসমূহের ভিত্তিতে তাহরীমের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি।
অষ্টম আলোচনাঃ কয়েকটি প্রচলিত আপত্তির জবাব
আপত্তি একঃ ক্বুরআন শরীফে জর্দার নাম উল্লেখ করে হারাম বলা হয়নি।
জবাবঃ শরীয়তের প্রত্যেক নিষিদ্ধ বস্তুর নাম পৃথকভাবে ক্বুরআন শরীফে উল্লেখিত হওয়া আবশ্যক নয়।
ক্বুরআন শরীফ ও ছুন্নাহ শরীফে সাধারণ বিধান, নিষেধাজ্ঞা এবং মূলনীতি রয়েছে। ফক্বীহগণ সেই দলিলসমূহের ভিত্তিতে নতুন পরিস্থিতির হুকুম নির্ণয় করেন।
অতএব, জর্দার নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকাই তাকে হালাল প্রমাণ করে না।
আপত্তি দুইঃ অনেক পূর্ববর্তী য়ালিম/উলামা হিসেবে পরিচিতজন জর্দা খেয়েছেন।
জবাবঃ কোন বা কিছু নির্দিষ্ট য়ালিমগণের ব্যক্তিগত য়া’মল এর দায় তাদের নিজের, কারো ব্যক্তিগত য়া’মলের উপর কোন দীনি হুকুম আহকাম হালাল/হারামের সুযোগ নাই, তাদের ঈলম, তাক্বওয়া কিংবা মর্যাদার খিয়ানতের দায় কেবল তাদের। কেনোনা কোনো য়ালিমের ব্যবহার মাত্রই সেই বস্তুর শরঈ বৈধতার অকাট্য দলিল নয়।
বিশেষত যখন সংশ্লিষ্ট বস্তুর ক্ষতি সম্পর্কে বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে পূর্বের তুলনায় অধিক নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের কর্তব্য যদি কোন সম্মানিত য়ালীম যিনি য়া’মলে-আক্বিদায় বাস্তবেই উত্তম, তাহলে উনার আদব সংরক্ষণ করা এবং একই সঙ্গে শরঈ দলিলের যথাযথ অনুসরণ করা।
আপত্তি তিনঃ বহু মানুষ সারা জীবন জর্দা খেয়েও সুস্থ থেকেছেন।
জবাবঃ কোনো ক্ষতিকর বস্তুর কারণে প্রত্যেক ব্যবহারকারী একই রোগে আক্রান্ত হবেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান এমন দাবি করে না। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন তামাক ব্যবহার করেও ক্যানসারে আক্রান্ত না হতে পারেন। কিন্তু তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দ্বারা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল বাতিল হয়ে যায় না। আমাদের বিচার করতে হবে বস্তুর প্রতিষ্ঠিত ক্ষতিকর প্রকৃতি দ্বারা, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দ্বারা নয়।
আপত্তি চারঃ সবকিছুর মধ্যেই কিছু না কিছু ক্ষতি রয়েছে। তাহলে সবকিছু হারাম হবে না কেন?
জবাবঃ শরীয়ত সামান্য অসুবিধা, স্বাভাবিক ঝুঁকি এবং প্রমাণিত গুরুতর ক্ষতিকে একই পর্যায়ে বিবেচনা করে না। কোনো খাদ্যদ্রব্যের অতিরিক্ত গ্রহণে ক্ষতি হতে পারে, আবার কোনো বস্তুর স্বাভাবিক ব্যবহারই গুরুতর রোগের প্রতিষ্ঠিত কারণ হতে পারে। দুটি বিষয় এক নয়। তামাকজাত জর্দার ক্ষেত্রে আলোচ্য বিষয় কোনো বিচ্ছিন্ন অতিরিক্ত ব্যবহার নয়। বরং এটি এমন এক শ্রেণির ভোগ্য বস্তু, যার ক্যানসার সৃষ্টিকারী প্রকৃতি প্রমাণিত এবং যার ব্যবহারের কোনো অপরিহার্য পুষ্টিগত প্রয়োজন নেই।
আপত্তি পাঁচঃ অনেক ইছলামি দলের মুফতিদের ফতোয়ায় জর্দাকে মুবাহ বলা হয়েছে। আপনি হারাম বলছেন কেন?
জবাবঃ যখন কোনো মুফতির মতের সঙ্গে দলিলভিত্তিক ইজতিহাদী মতভিন্নতা পোষণ করা হয় এটা তার প্রতি অসম্মান নয়। যেসব ফতোয়ায় ক্ষতিহীন তামাককে মুবাহ বলা হয়েছে, সেসব ফতোয়ার অনুমতির শর্ত এবং আজকের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক তথ্য একত্রে বিবেচনা করতে হবে। আর যেসব ফতোয়ায় শর্ত ছাড়াই মুবাহ বলা হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে আমার মতভিন্নতা রয়েছে। সেই মতভিন্নতার ভিত্তিও আমরা স্পষ্ট করছি।
আমরা কোনো ইজমার দাবি করছি না। বরং প্রতিষ্ঠিত ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্যকে শরীয়তের সাধারণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় বিবেচনা করছি।
আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
উপরোক্ত দলিল, উছ্বূল ও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে আমার সিদ্ধান্ত হলো, পানের সঙ্গে ব্যবহৃত প্রচলিত তামাকজাত জর্দা হারাম। এই তাহরীমের ভিত্তি জর্দার নাম ক্বুরআন শরীফে পৃথকভাবে উল্লেখিত হওয়া নয়, কিংবা একে মদের অনুরূপ নেশাদ্রব্য সাব্যস্ত করাও নয়। বরং এর ভিত্তি হলো শরীয়তের ক্ষতি নিষিদ্ধকরণের বিধান এবং তামাকজাত জর্দার গুরুতর ক্ষতিকর প্রকৃতি সম্পর্কে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ।
আমরা এটাও পরিষ্কার করছি যে, এই সিদ্ধান্ত দ্বারা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে নিয়ন্ত্রিত নিকোটিন ব্যবহার কিংবা তামাকবিহীন অন্যান্য দ্রব্যের বিধান নির্ধারণ করছি না। সেগুলো পৃথক বিবেচনার বিষয়। কেউ আমার এই ইস্তিদলালের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে চাইলে যথাযথ দলিলের ভিত্তিতে করতে হবে। জর্দা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত, বহু মানুষ ব্যবহার করেন অথবা পূর্ববর্তী কোনো অজ্ঞ য়ালিম একে মুবাহ বলেছেন, কেবল এই যুক্তিগুলো দ্বারা এর প্রতিষ্ঠিত ক্ষতিকর প্রকৃতি অস্বীকার করা যায় না।
সবশেষে বলব, আমাদের কাছে মুখ্য বিষয় হওয়া উচিত মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সন্তুষ্টি অর্জন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছুন্নাহ শরীফের যথাযথ অনুসরণ এবং শরীয়তের বিধানকে যথাসম্ভব বিশুদ্ধভাবে অনুধাবন করা।
কোনো অভ্যাসকে রক্ষা করার জন্য শরীয়তের দলিলকে দুর্বল করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি কোনো শরঈ হুকুম প্রতিষ্ঠার জন্য দলিলের সীমা অতিক্রম করাও সমীচীন নয়। এই উভয় নীতি অক্ষুণ্ণ রেখেই আমরা তামাকজাত জর্দার তাহরীমের সিদ্ধান্ত প্রদান করছি।
وَاللّٰهُ تَعَالَىٰ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ
মূল তথ্যসূত্র
১. আল-ক্বুরআনুল কারীম, ছুরাহ আল-আ‘য়রাফ, ৭:১৫৭।
২. আল-ক্বুরআনুল কারীম, ছুরাহ আল-বাক্বারাহ, ২:১৯৫।
৩. আল-ক্বুরআনুল কারীম, ছুরাহ আন-নিছা, ৪:২৯।
৪. ছুনান ইবনে মাজাহ, হাদীছ শরীফ ২৩৪০ ও ২৩৪১।
৫. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, ধারা ২০।
৬. দারুল উলূম দেওবন্দ, ফতোয়া ৩৫৫/১৪৩/L=১৪৩৩, প্রশ্ন ৩৬৩৬৭।
৭. National Cancer Institute, Smokeless Tobacco and Cancer।
৮. Centers for Disease Control and Prevention, Health Effects of Smokeless Tobacco, ১৫ মে ২০২৪।
৯. International Agency for Research on Cancer, ধোঁয়াবিহীন তামাকের ক্যানসার সৃষ্টিকারী প্রকৃতি সম্পর্কিত মূল্যায়ন।
