Saturday, March 28, 2026

তুর্কী নেটোতে থাকা নিয়ে খারেজীদের আপত্তির দাঁতভাঙ্গা জবাব

তুর্কী নেটোতে থাকা নিয়ে খারেজীদের আপত্তির দাঁতভাঙ্গা জবাব

খারেজীরা তুর্কীবিরোধি যত অপপ্রচার চালায় তার মধ্যে অন্যতম অপপ্রচার হলো কোন মুসলমান কান্ট্রির ন্যাটোতে থাকা নাকি হারাম। তাই আজকে আমরা ক্বুরআন-ছুন্নাহ, মানতেক ও ইতিহাসের আলোকেই দেখবো যে এটা কি হারাম নাকি খারেজীদের ছুন্নীদের প্রতি বিদ্বেষ।

প্রথমে নেটো কি সেটা সম্পর্কে জেনে নেইঃ

নেটো কী, নেটোর ইতিহাসঃ নেটো হলো “North Atlantic Treaty Organization” - ১৯৪৯ সালে গঠিত একটি সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা জোটএর মূল ভিত্তি Washington Treaty, বিশেষ করে Article 5: এক সদস্যের উপর সশস্ত্র হামলাকে সবার উপর হামলা হিসেবে ধরা হতে পারেনেটোর নিজস্ব ভাষায়, এটি একটি political and military allianceদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সোভিয়েত চাপ ও নিরাপত্তা-সংকটের প্রেক্ষাপটে এটি গঠিত হয় (অর্থাৎ এর সাথে ধর্মিয় কোন কিছুই মূলে জড়িত না, কাফেররা যখন অন্য কাফেরদের থেকে নিজেদের বাঁচাতে ঝোট করছে তখন তাদের এক প্রতিবেশী ঐ কাফের দেশের থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে সামরিক চুক্তি করেছে অন্য কাফেরের সাথে।)

নেটোর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে নিরাপত্তা-ছাতা তৈরি করাপরে শীতল যুদ্ধ, ওয়ারশ চুক্তি, বলকান সংকট, আফগানিস্তান, সন্ত্রাসবিরোধী সামুদ্রিক টহল, মিসাইল প্রতিরক্ষা - এসবের মাধ্যমে এর ভূমিকা বিস্তৃত হয়গ্রিস ও তুর্কী ১৯৫২ সালে এতে যোগ দেয়

তুর্কী কেন নেটোতে যোগ দিয়েছিল, আর এখনো কেন আছেঃ

তুর্কীর নিজের সরকারি বয়ান অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তুর্কী “free world” ও Western Bloc-এর পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়, এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-তে নেটো সদস্য হয়তুর্কী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট বলছেঃ তখন থেকে নেটো তুর্কীর defence and security policy-এর cornerstoneতারা আরও বলছে, Article 5-এর collective defence guarantee তুর্কীর জন্য অত্যন্ত মূল্যবান নিরাপত্তা-গ্যারান্টি

ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এর পেছনে যে বড় কারণ ছিল, সেটা ছিলো সোভিয়েত হুমকিআমেরিকার State Department-এর ইতিহাসভিত্তিক নথি দেখায়, কোরিয়ান যুদ্ধের পর সদস্যরা দ্রুত প্রতিরক্ষা-সমন্বয়ের দিকে যায়, এবং ১৯৫২ সালে গ্রিস-তুর্কীকে অন্তর্ভুক্ত করেঅর্থাৎ Cold War security calculus এখানে কেন্দ্রীয় ছিল

সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা এটাই যে, তুর্কী নেটোতে ঢুকেছিল মূলত নিরাপত্তা-গ্যারান্টির জন্য; বিশেষত সোভিয়েতের চাপের মুখে একা না থাকার জন্যআর এখনো আছে কারণ নেটো এখনও তুর্কীর জন্য প্রতিরক্ষা-ছাতা, পশ্চিমা সামরিক interoperability, গোয়েন্দা-সহযোগিতা, মিসাইল-প্রতিরক্ষা, এবং আঞ্চলিক deterrence-এর বড় প্ল্যাটফর্মএই “কেন এখনো আছে” প্রশ্নের সরকারি উত্তরও প্রায় একইঃ নেটো এখনো তুর্কীর নিরাপত্তা নীতির মূল স্তম্ভ

বর্তমানে নেটোতে তুর্কীর অবস্থান কী?

বর্তমানে তুর্কী নেটোর ভিতরে peripheral actor না; central military actorনেটো মহাসচিব ২৫ নভেম্বর ২০২৪-এ প্রকাশ্যে বলেছেন, তুর্কীর নেটোতে second-largest army আছে, এবং দেশটি জোটের collective security-তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেএকই বক্তব্যে তিনি তুর্কীর KFOR-এ troop contribution এবং Kosovo mission command-এর জন্যও প্রশংসা করেছেন

প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকেও তুর্কীর অবস্থান শক্তNATO Allied Land Command (LANDCOM) ইজমিরে অবস্থিত; এটি নেটোর land forces-এর প্রধান স্থায়ী সদরগুলোর একটিএছাড়া NATO-র ওয়েবসাইট অনুযায়ী, Basat Öztürk মে ২০২৫ থেকে আবার তুর্কীর Permanent Representative to NATO হিসেবে দায়িত্বে আছেনঅর্থাৎ তুর্কী শুধু সদস্য নয়; HQ-hosting, high-level representation, troop contribution সব ক্ষেত্রেই ভেতরের সারির খেলোয়াড়

অপারেশনাল দিক থেকে তুর্কী এখনো সক্রিয়Kosovo-তে NATO-led KFOR এখনো চলছে; নেটো ২০২৬ সালের আপডেটে বলছে KFOR ১৯৯৯ থেকে শান্তি-সহায়ক অপারেশন হিসেবে কাজ করছেআর ২০২৪ সালে নেটো মহাসচিব তুর্কীর KFOR command role ও troops contribution বিশেষভাবে তুলে ধরেন

আরও তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, মার্চ ২০২৬-এ তুর্কী জানিয়েছে NATO ballistic missile defence সম্পূর্ণ defensive প্রকৃতির এবং deterrence/defence-এর অংশএকই সময় Reuters জানায়, ইরান যুদ্ধ-সংকটের মধ্যে নেটো তুর্কীতে অতিরিক্ত Patriot প্রতিরক্ষা মোতায়েন করেছেঅর্থাৎ তুর্কী নেটোর southeastern flank-এ বাস্তব frontline security state হিসেবেও কাজ করছে

নেটোর কোন যুলুমে তুর্কী শরীক ছিল?

এখানে খুব সাবধানে সিদ্ধান্ত দিতে হবেঃ “নেটোর সদস্য” হওয়া আর “নেটোর প্রতিটি বিতর্কিত বা জালিম অপারেশনে সমান শরীক” হওয়া এক কথা নয়

সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে যে ক্ষেত্রগুলোতে তুর্কীর অংশগ্রহণ প্রমাণিত, সেগুলো হলো বলকান, আফগানিস্তান, ভূমধ্যসাগরীয় maritime missions, এবং লিবিয়া ২০১১তুর্কী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেই বলছে, ১৯৯৫ থেকে বলকানে NATO-led সব অপারেশনে তুর্কী অংশ নিয়েছে - Bosnia-র IFOR/SFOR, Kosovo-র KFOR, Macedonia-র Essential Harvest, Amber Fox, Allied Harmony ইত্যাদিতে

Kosovo-র ক্ষেত্রে নেটো বলছে KFOR হলো peace-support operation, যার UN Security Council Resolution 1244 ভিত্তি আছেকিন্তু একই সঙ্গে নেটো এটাও বলে যে KFOR-এর আগে ৭৮ দিনের air campaign হয়েছিল Milosevic regime-এর বিরুদ্ধেতাই সমালোচকেরা ১৯৯৯-এর Kosovo air war-কে বিতর্কিত বলে, আর সমর্থকেরা humanitarian intervention বলেতুর্কী KFOR-এ অংশ নিয়েছে এটি নিশ্চিত; তবে এটিকে “নিরেট যুলুম” নাকি “জননিরাপত্তা/শান্তিরক্ষা” - এটি রাজনৈতিক-নৈতিক বিতর্কের বিষয়

আফগানিস্তানে তুর্কী কি শরীক ছিল?

নেটো বলছে Resolute Support Mission ছিল non-combat mission, Afghan government-এর আমন্ত্রণে এবং UNSC Resolution 2189-এর আলোকে পরিচালিত training/advisory missionআবার নেটোর ২০২১-এর এক ঘোষণায় দেখা যায়, তুর্কী command position-ও নিয়েছিল Kabul-এ training, advising, assisting-এর ক্ষেত্রেসুতরাং “আফগানিস্তানে তুর্কীর ভূমিকা ছিল, তবে সেটি নেটোর ভাষায় non-combat/train-advise-assist ভূমিকাসমালোচক চাইলে বলবে দখলদার কাঠামোকে sustain করেছে; সমর্থক বলবে security assistance দিয়েছে

লিবিয়াতে ২০১১ সালে তুর্কী সরাসরি অংশ নিয়েছিল যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর একটিReuters জানায়, তুর্কী চারটি frigate, একটি submarine, এবং একটি support ship নেটোর arms embargo enforcement-এ দেয়নেটোর Libya chronology-তেও দেখা যায় ৩১ মার্চ ২০১১ থেকে NATO sole command নেয়, এবং NATO air and sea assets military actions শুরু করেআরও গুরুত্বপূর্ণ, NATO-র নিজস্ব বিবরণে AC Izmir, Turkey air operations management-এ ছিলঅতএব লিবিয়ার নেটো অপারেশনে তুর্কীর institutional ও operational involvement ছিল, তা অস্বীকার করা যাবে না

তবে এখানেও সূক্ষ্মতা আছেতুর্কী শুরু থেকেই বলেছিল, অপারেশন UN mandate-এর বাইরে যাওয়া চলবে না২২ মার্চ ২০১১-র রিপোর্টে দেখা যায়, আঙ্কারা no-fly zone বা NATO role তখনই মানবে যখন তা UN framework-এর ভেতরে থাকবে; এর বাইরে গেলে legitimised হবে না, এ কথা আহমেত দাভুতোওঁয়লু বলেছিলেনসুতরাং তুর্কী লিবিয়ায় অংশ নিয়েছে, কিন্তু শুরু থেকেই সীমা-আপত্তিও তুলেছে

ভূমধ্যসাগরে Operation Active Endeavour-এও তুর্কী সরাসরি naval assets দিয়েছেনেটো নিজেই বলছে, Greece, Italy, Spain, Turkey মূল অবদানকারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ছিলএটি মূলত counter-terror maritime surveillance mission ছিল, তাই একে “যুলুম” বলা স্বয়ংক্রিয় নয়; কিন্তু এটি নেটো ঝোট হিসেবে সামরিক কাঠামোতে তুর্কীর সক্রিয় থাকার বিষয়

অন্যদিকে ২০০৩-এর Iraq invasion-কে নেটোর নামে তুর্কীর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা অনেকে করে যা মোটেও সঠিক নয়ঐ আক্রমণ ছিল U.S.-led coalition invasion, NATO operation নয়আরও গুরুত্বপূর্ণ, ১ মার্চ ২০০৩-এ তুর্কী পার্লামেন্ট U.S. troops-কে তুর্কী ভূখণ্ড ব্যবহার করে northern front খোলার অনুমতি দেয়নি, এটি Congressional/CRS ও U.S. State Department chronology-তে নথিভুক্তকাজেই “ইরাক আক্রমণে তুর্কী নেটোর মাধ্যমে সরাসরি শরীক” এ বক্তব্য অন্তত ২০০৩ invasion প্রসঙ্গে সঠিক নয়তবে পরে NATO Training Mission-Iraq বা advisory missions-এ আলাদা প্রশ্ন আছে; সেগুলো invasion নয়, post-war training/advisory কাঠামো

সুতরাং এতক্ষণের আলাপের নির্ভুল সারসংক্ষেপ এইঃ

তুর্কী নেটোর কিছু সামরিক ও নিরাপত্তা অভিযানে অবশ্যই শরীক ছিল, বিশেষত Balkans, Afghanistan, Libya, Mediterranean maritime missions-এ লিবিয়া ২০১১-তে তুর্কীর অংশগ্রহণ পরিষ্কার, যদিও আঙ্কারা UN সীমা অতিক্রমের বিরুদ্ধে আপত্তিও জানিয়েছিল Kosovo ও Afghanistan-এ তুর্কী অংশ নিয়েছে, কিন্তু সেগুলোকে “যুলুম” না “security/peace support” বলা হবে এটি নৈতিক-রাজনৈতিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন; তথ্যগতভাবে অংশগ্রহণ ছিল ২০০৩ Iraq invasion-এ তুর্কী নেটোর নামে invasion partner ছিল না; বরং তুর্কী পার্লামেন্ট U.S. ground deployment প্রত্যাখ্যান করেছিল

নেটোকে কি তুর্কী দ্বীনি কোন জোট বলে দাবী করে?

না মোটেও না, তবে তুর্কী নেটোতে কেন আছে এর উত্তর আবেগে নয়, রাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী দিতে হবে। নেটো ১৯৪৯ সালের collective defence alliance, আর তুর্কী ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-এ এতে যোগ দেয়তুর্কীর নিজের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজও বলে নেটো তাদের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতির cornerstone, কাজেই তুর্কী নেটোতে ঢুকেছিল নিরাপত্তার জন্য, কুফরকে মহব্বত করে নয়; আর এখনো আছে কারণ এখনও বিকল্প শক্তিশালী মুসলিম প্রতিরক্ষা-জোট দাঁড়ায়নি

তাই নেটোতে থাকা মানেই “কুফরের গোলামি” এটা একটা প্রপাগান্ডাময় স্লোগান, শরীয়তের কোন দলিল নাতুর্কী ১৯৫২ সালে নেটোতে গেছে নিরাপত্তার কারণে, আজও আছে একই কারণেসব অপারেশনে সমান শরীকও নয়, যেমনঃ ইরাক ২০০৩-এ পার্লামেন্টই U.S. northern front ঠেকিয়েছেআবার লিবিয়ায় সীমিত নৌ-ভূমিকা ছিল সেটা লুকানোর কিছুই নাই। তাই সত্য কথা হলোঃ তুর্কীর নেটো সদস্যতা রাজনৈতিক-সামরিক ইজতিহাদ; প্রতিটি case আলাদা বিচার হবে, স্লোগান দিয়ে না

এবার আসি শরীয়ত অনুসারে তুর্কীর নেটো ঝোটে থাকা কি হারাম?

প্রথমতো আমরা আজকে দেখতে পাচ্ছি অ্যামেরিকা ইছরাঈল কিভাবে ইরানের প্রতি যুলুম নির্যাতন চালাচ্ছে। আজকে তুর্কী যদি নেটোর ঝোট না হতো তাহলে সামরিক খাতে উদীয়মান মুছলিম রাষ্ট হিসেবে তুর্কীর আজকের হালে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে যেতো। আজকে অ্যামেরিকা-ইছরাঈল ইরানের আগে তুর্কীকেই আক্রমণ করতো। এমনিতেই তারা তুর্কী ইকোনমির উপর যে আগ্রাসন বিগত ১ যুগ থেকে চালাচ্ছে তার পরেও তুর্কী যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তার শুকরিয়া আদায় করে মুছলমানদের শেষ করা যাবেনা। তুর্কী না থাকলে সারা দুনিয়ায় মুছলমানদের আর কোন দেশ থাকতোনা একটা সাউন্ড বা টু শব্দ করার মতো।

তুর্কী কি চুক্তি করে ভুল করেছে? না ভেঙ্গে গাদ্দারি করছে?

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (إِلَّا ٱلَّذِينَ عَـٰهَدتُّم مِّنَ ٱلْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنقُصُوكُمْ شَيْــًٔا وَلَمْ يُظَـٰهِرُواْ عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُّوٓاْ إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَىٰ مُدَّتِهِمْ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُتَّقِينَ) তবে মুশরিকদের মধ্য থেকে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছ, অতঃপর তারা তোমাদের সাথে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করেনি, তোমরা তাদেরকে দেয়া চুক্তি তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত পূর্ণ করনিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাক্বীদের ভালবাসেন (ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:৪) চিন্তা করা যায়? মুশরিকদের সাথে যত দিনের চুক্তি ছিল সেই সময় পর্যন্ত তাদেরকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছেকেননা, তারা চুক্তি পালন করেছিল এবং তার পরিপন্থী কোন আচরণ প্রদর্শন করেনিএই জন্য মুছলিমদের পক্ষেও চুক্তি পালনকে জরুরী করা হয়েছিল কেবল জরুরী না, এই আচরণকে মহান আল্লাহ তায়ালা মুত্তাক্বীদের আচরণ বলে উল্লেখ করেছেন যাদের তিনি মুহব্বত করেন। আর জ্ঞানপাপীরা বলে হারাম। আউজুবিল্লাহ। এছাড়াও মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (لَّا يَنْهَـٰكُمُ ٱللَّهُ عَنِ ٱلَّذِينَ لَمْ يُقَـٰتِلُوكُمْ فِى ٱلدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَـٰرِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوٓاْ إِلَيْهِمْ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُقْسِطِينَ) দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদেরকে নিষেধ করছেন নানিশ্চয় মহান আল্লাহ তায়ালা ন্যায় পরায়ণদেরকে ভালবাসেন (ছুরাহ আল-মুমতাহীনা ৬০:৮) অর্থাৎ যেসব কাফের মুছলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কারেও অংশগ্রহণ করেনি, আলোচ্য আয়াত শরীফে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার ও ইনছাফ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছেন্যায় ও সুবিচার তো প্রত্যেক কাফেরের সাথেও জরুরীএতে যিম্মি কাফের, চুক্তিতে আবদ্ধ কাফের এবং শক্র কাফের সবাই সমান

তাছাড়া মহান আল্লাহ তায়ালা উনার স্পষ্ট হুকুম পাওয়া যায়ঃ (وَ اِنۡ جَنَحُوۡا لِلسَّلۡمِ فَاجۡنَحۡ لَهَا وَ تَوَكَّلۡ عَلَی اللّٰهِ ؕ اِنَّهٗ هُوَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ) আর যদি তারা (শত্রুরা) শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে আপনিও শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ুন এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ওপর ভরসা রাখুন। (ছুরাহ আল-আনফাল ৮:৬১) 

অন্যদিকে ইছলামী তারীখও এ কথা দেখায় যে, সব অমুছলিমের সঙ্গে সবধরনের সামরিক সহযোগিতাকে শুরু থেকেই এককথায় বাতিল করা হয়নি; বরং বাস্তব যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে শর্তসাপেক্ষ সহযোগিতা সংঘটিত হয়েছে। প্রাচীন ইছলামী ইতিহাসভিত্তিক আধুনিক গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে ইরাক বিজয়ের শুরুতেই, বিশেষত আল-বুয়াইব যুদ্ধের প্রসঙ্গে, খ্রিষ্টান আরবদের একাংশ মুছলিম বাহিনীর সঙ্গে সাসানীয় পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। ওয়াদাদ আল-ক্বাদী তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন যে ১৩ হিজরিতে আল-মুছান্না ইবনু হারিছাহর অভিযানে দুইজন খ্রিষ্টান আরব নেতা ও তাদের লোকজন মুছলিমদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেয়; এমনকি যুদ্ধ চলাকালে তাগলিব গোত্রের একদল খ্রিষ্টান তরুণ এসে বলে, “আমরা আরবদের সঙ্গে মিলে পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব,” এবং তাদের মধ্যকার এক খ্রিষ্টান তরুণ মিহরানকে হত্যা করে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ আছে। সুতরাং তারীখের আলোকে এটুকু স্পষ্ট যে, দারুল-ইছলামের স্বার্থে, বৃহত্তর শত্রুর বিরুদ্ধে, এবং মুছলিম নেতৃত্বের অধীনে অমুছলিমদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার নজির ইছলামী ইতিহাসে একেবারেই অজানা বা অভূতপূর্ব কিছু নয়। 

অতএব, বর্তমান যুগে কোন মুছলিম রাষ্ট্র যদি নিজের অস্তিত্ব, সীমান্ত, জনগণ, প্রতিরক্ষা-সামর্থ্য ও কৌশলগত নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অমুছলিম শক্তির সঙ্গে সামরিক চুক্তি বা প্রতিরক্ষামূলক জোটে প্রবেশ করে, তাহলে শুধু “অমুছলিমদের সঙ্গে জোট” এই একক কারণে তাকে সরাসরি হারাম, খিয়ানত, বা কুফরির সহযোগিতা বলা শরঈ ও তারীখি, উভয় দিক থেকেই দুর্বল অবস্থান। বরং সঠিক বিচার হবে এই ভিত্তিতে যে, ঐ জোটের উদ্দেশ্য কী, তা কি আত্মরক্ষা ও deterrence-এর জন্য, নাকি জুলুম ও আগ্রাসনের জন্য; মুছলিম রাষ্ট্রটি কি প্রতিটি অপারেশনে নির্বিচারে শরীক, নাকি নিজের সীমা, আপত্তি ও জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে শর্তসাপেক্ষে অবস্থান করছে। এই পার্থক্য না করে স্লোগানধর্মী ফতোয়া দেওয়া ঈলমি আমানতের পরিপন্থী।

সম্মানিত পবিত্র নামাযের আহকাম ও আরকানঃ ফরজ, ওয়াজিব, ছুন্নাহ

সম্মানিত পবিত্র নামাযের আহকাম ও আরকানঃ ফরজ, ওয়াজিব, ছুন্নাহ

জিকিরের পর সম্মানিত দ্বীন ইছলামের সবচেয়ে বড় দায়ীমি ফরজ হচ্ছেন নামায। যা দৈনিক ৫ ওয়াক্ত প্রত্যেক বালেগ নারী পুরুষের উপর ফরজ। ১৭ রক’য়াত ফরজ, ৩ রক’য়াত ওয়াজিব, ১২ রক’য়াত ছুন্নত বাধ্যতামূলক। এখন এই নামায যে ক্যাটাগরিরই হোক না কেন এর কিছু নিয়ম রয়েছে যা পরিপূর্নভাবে আদায় না করলে নামায বাতিল কিংবা ছাহু ছেযদা দেওয়া ওয়াজিব হয়।

আমি হানাফি ফিক্বহ, বিশেষকরে ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি য়ালাইহির মাযহাবী বিন্যাস অনুযায়ী বিষয়গুলো সাজিয়েছি। প্রথমে আমরা ফরজ সম্পর্কে জেনে নিই, তারপর ধাপে ধাপে নামাযের ওয়াজিব, ছুন্নাহ, মুস্তাহাব সম্পর্কে জানবো।

ফরজ হিসেবে নামাযের মধ্যে ১৩ টা বিষয় পাওয়া যায়। নামাযের ১৩ ফরজ বলতে সাধারণত ৭টি শর্ত + ৬টি রুকন বোঝানো হয়ে থাকে। তবে কিছু হানাফি কিতাবে সংখ্যা একটু এদিক-সেদিক দেখা যায়, কারণ কোথাও কিছু বিষয় একত্রে, কোথাও আলাদা করে গোনা হয়েছে।

প্রথমে মূল পার্থক্যটি বুঝে নিই। ফরজ বাদ গেলে নামায ছ্বহীহ হয় না। ওয়াজিব ভুলে বাদ গেলে সিযদায়ে ছাহু লাগে; ইচ্ছাকৃত বাদ দিলে গুনাহ হবে, আর সময়ের মধ্যে নামায পুনরায় পড়া জরুরি হয়, যদিও সেটাকে ফরজ ভাঙার মতো বলা হয় না। অন্যদিকে ছুন্নত বাদ দিলে নামায তো ভাঙে না, কিন্তু য়া’মল অপূর্ণ ও নিন্দনীয় হয়। মুস্তাহাব/আদব বাদ গেলে গুনাহ হয় না, তবে সৌন্দর্য ও কামাল কমে যায়।

নামাযের ১৩ ফরজ

ক. নামাযের বাইরের ৭ ফরজ (শর্ত)

১. হাদাছ থেকে পবিত্র হওয়া, অর্থাৎ অযু/গোছল থাকা। দলিলঃ মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِذَا قُمْتُمْ إِلَى ٱلصَّلَوٲةِ فَٱغْسِلُواْ) হে মু’মিনগণ যখন তোমরা নামাযে দন্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর, মাথা মাছেহ কর এবং টাখনু পর্যন্ত পা (ধৌত কর) (ছুরাহ আল-মাইদাহ ৫:৬)।

২. শরীর পাক হওয়া। হানাফি ফিকহে নামাযের শর্ত হিসেবে শরীরকে নাপাকি থেকে মুক্ত রাখা গণ্য হয়েছে।

৩. কাপড় পাক হওয়া।

৪. নামাযের জায়গা পাক হওয়া।

৫. সর্বনিম্ন ছতর আওরাত ঢেকে রাখা, তবে সামর্থ্যবানদের জন্যে উত্তম পোশাক পরাই ফরজ। দলিলঃ মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নির্দেশঃ (خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ) “প্রত্যেক ঈবাদাতের স্থানে তোমরা তোমরা সাজসজ্জা/সর্বোত্তম পোশাকটাই পরিধান কর”। (ছুরাহ আল-আ’য়রফ ৭:৩১)। হানাফিরা এ আয়াত শরীফ থেকে সর্বনিম্ন ছতর ঢাকার বাধ্যবাধকতা নিয়েছেন।

৬. ক্বিবলা (কা’য়বা শরিফ) মুখী হওয়া। দলিলঃ (فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ) সুতরাং (ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম!) আপনি আপনার চেহারা মুবারক মাছযিদুল হারাম শরীফ-এর দিকেই ফিরান; আর (হে মু’মিনগণ!) তোমরাও যেখানেই থাকো না কেনো, তোমাদের চেহারা সেদিকেই (মাছযিদুল হারাম শরীফ-এর দিকে) ফিরাও (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৪৪)।

৭. ওয়াক্ত প্রবেশ করা ও নিয়ত করা। ওয়াক্তের দলিলঃ (إِنَّ ٱلصَّلَوٲةَ كَانَتْ عَلَى ٱلْمُؤْمِنِينَ كِتَـٰبًا مَّوْقُوتًا) নামায মুমিনদের উপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে।” (ছুরাহ আন-নিছা ৪:১০৩)। আর নিয়তকে হানাফি ফিকহে নামায শুরুর আগের ফরজ শর্ত হিসেবে ধরা হয়েছে।

খ. নামাযের ভেতরের ৬ ফরজ (রুকন)।

১. তাকবীরে তাহরীমা। দলিলঃ রছূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ (مِفْتَاحُ الصَّلَاةِ الطُّهُورُ وَتَحْرِيمُهَا التَّكْبِيرُ وَتَحْلِيلُهَا التَّسْلِيمُ) নামাযের চাবিকাঠি হলো পবিত্রতা (অজু-গোছল), এর (দুনিয়াবি কাজকে) হারাম করার মাধ্যম হলো তাকবীর (তাকবীরে তাহরিমা) এবং একে (দুনিয়াবি কাজকে পুনরায়) হালাল করার মাধ্যম হলেন ছালাম (আবু দাউদ শরীফ ৬১, ৬১৮, তিরমিজি শরীফ ৩, ২৩৮, ইবনে মাজাহ শরীফ ২৭৫, ২৭৬ এবং মুছনাদে আহমাদ ১০০৬, ১০৭২)

২. ক্বিয়াম করা। সক্ষম হলে দাঁড়িয়ে পড়া, দলিলঃ (وَقُومُواْ لِلَّهِ قَـٰنِتِي) মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জন্য বিনীত হয়ে (নামাযে) দাঁড়াও। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:২৩৮)।

৩. ক্বিরাআত পাঠ। ক্বুরআন শরীফ থেকে কিছু আয়াত শরীফ তিলাওয়াত করা। দলিলঃ (فَاقۡرَءُوۡا مَا تَیَسَّرَ مِنَ الۡقُرۡاٰنِ) সুতরাং পবিত্র আল-ক্বুরআন থেকে যতটুকু (পাঠ করা) তোমাদের জন্য সহজ হয়, ততটুকুই তোমরা পাঠ করো (ছুরাহ আল-মুয্জাম্মিল ৭৩:২০)।

৪. রুকূ করা। দলিলঃ (يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱرْكَعُواْ وَٱسْجُدُواْ وَٱعْبُدُواْ رَبَّكُمْ) হে মু’মিনগণ, তোমরা রুকূ করো, ছেযদা করো, আর তোমাদের রব তা’য়ালা উনার ঈবাদাত করো। (ছুরাহ আল-হাজ্জ ২২:৭৭)।

৫. ছেযদা করা। দলিলঃ (يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱرْكَعُواْ وَٱسْجُدُواْ وَٱعْبُدُواْ رَبَّكُمْ) হে মু’মিনগণ, তোমরা রুকূ করো, ছেযদা করো, আর তোমাদের রব তা’য়ালা উনার ঈবাদাত করো। (ছুরাহ আল-হাজ্জ ২২:৭৭)।

৬. আখিরি কা’য়দাহ। শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পরিমাণ বসা। এর গুরুত্ব হযরত ইবনু মাসঊদ রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে প্রমাণিত; তিনি বলেনঃ (وَكَفِّي بَيْنَ كَفَّيْهِ التَّشَهُّدَ، كَمَا يُعَلِّمُنِي السُّورَةَ مِنَ الْقُرْآنِ) রছূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে তাশাহহুদ এমনভাবে শিক্ষা দিয়েছেন, যেমন আল-ক্বুরআনের ছুরাহ শিক্ষা দিতেন। (বুখারি শরীফ ৬২৬৫, মুছলিম শরীফ ৪০২ই-৪০৩বি, নাছাই শরীফ ১১৭১)

নামাযের ওয়াজিবসমূহ

হানাফি মাজহাবের কিতাব-সমূহে নামাযের ওয়াজিব বলা হয়েছে ১৮টি বিষয়কে; কিছু ফতওয়াগ্রন্থ এগুলোকে সংক্ষিপ্ত করে ১২ বা ১৪ দফায়ও পেশ করে। তাই গণনায় অল্প পার্থক্য থাকলেও মর্ম এক।

হানাফি কিতাব অনুযায়ী ১৮ ওয়াজিব সংক্ষেপে এভাবেঃ

১. ছুরাহ ফাতিহা শরীফ পড়া। (হানাফি মাজহাবে ওয়াজিব)

২. ফাতিহা শরিফ-এর সাথে অন্য ছোট ছুরাহ বা কমপক্ষে বড় ছুরার ৩ আয়াত শরীফ মিলানো “ফরজের প্রথম দুই রক’য়াতে, এবং বিতর ও নফলের সব রক’য়াতে।

৩. ক্বিরাআতকে প্রথম দুই রক’য়াতে নির্দিষ্ট করা।

৪. ফাতিহা শরীফ আগে, তারপর ছুরাহ পড়া।

৫. ছেযদায় কপালের সাথে নাকও মাটিতে লাগানো।

৬. প্রতি রক’য়াতে দ্বিতীয় ছেযদা সম্পন্ন করে তবেই পরের রুকনে যাওয়া।

৭. রুকনসমূহে ইতমিনান/স্থিরতা রাখা।

৮. প্রথম কা’য়দাহ করা।

৯. প্রথম কা’য়দাহতে তাশাহহুদ পড়া

১০. শেষ কা’য়দাহতেও তাশাহহুদ পড়া

১১. প্রথম কা’য়দাহর তাশাহহুদের পর বিলম্ব না করে তৃতীয় রক’য়াতে দাঁড়ানো

১২. নামায শেষ করতে ছালাম বলা অর্থাৎ (ٱلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ ٱللَّهِ)

১৩. বিতরে দ্বো’আয়ে কুনূত পড়া

১৪. ঈদের অতিরিক্ত তাকবীরসমূহ

১৫. নামাযের ইফতিতাহ (উন্মোচন করা, উন্মুক্ত করা বা শুরু করা) নির্দিষ্ট তাকবীর দ্বারা করা

১৬. ঈদের দ্বিতীয় রক’য়াতে রুকূর তাকবীর যথাস্থানে আদায় করা

১৭. যেসব নামায (جَهْرِي) সেগুলোয় ইমামের যাহর করাঃ ফাযর, মাগ্বরিব-ঈশার প্রথম দুই রাকাআত, জুমু’য়াহ শরীফ, দুই ঈদ, তারাউয়্যীহ, রমজানের বিতর (মানে ফাতিহা ও ছুরাহ-কেরাত উচ্চস্বরে পাঠ করা।)

১৮. যেসব নামাযে ছিরর রয়েছে সেখানে ছিরর করা, যেমনঃ জ্বুহর, য়া’ছর, মাগ্বরিব ও ঈশার পরের অংশ, দিনের নফল।

ওয়াজিবের কুল্লী দলিল হচ্ছেন নববী নামাযের পদ্ধতিঃ (وَصَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي) আর তোমরা ঠিক সেভাবেই নামায আদায় করো, যেভাবে আমাকে নামায আদায় করতে দেখেছো। (বুখারি শরীফ ৬৩১, ৬০০৮, ৭২৪৬)

নামাযের ছুন্নত

হানাফি মাজহাবে নামাযের ছুন্নত প্রায় ৫০-৫৫টি পাওয়া যায়। সবকটি লিখলে উত্তর অতি দীর্ঘ হবে, তাই প্রধান সুন্নতগুলো ধাপে ধাপে দিচ্ছি

শুরুর ছুন্নতসমূহঃ

১. তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত উঠানো।

২. পুরুষের ক্ষেত্রে কান পর্যন্ত, নারীর ক্ষেত্রে কাঁধ/বুকের নিকট পর্যন্ত।

৩. আঙুল স্বাভাবিকভাবে খোলা রাখা।

৪. পুরুষের ডান হাত বাম হাতের উপর নাভির নিচে বাঁধা।

৫. সোজা হয়ে দাঁড়ানো, মাথা না নত করা

ক্বিয়াম ও ক্বিরআতের ছুন্নতসমূহঃ

১. ক্বিয়ামের সময় পুরুষের জন্য দুই পায়ের মাঝে কিছুটা ফাঁক রাখার কথা এসেছে; “চার আঙুল পরিমাণ” (আমার মতে গোড়ালি ৪ ও মাথায় ৮ আঙ্গুল রাখাই উত্তম) এসেছে, আর নারীদের পায়ের মধ্যে ফাঁক থাকবেনা।

২. ছানা পড়া।

৩. তা’য়আউজ শরীফ পড়া।

৪. প্রতি রক’য়াতে ফাতিহা শরিফ ও প্রত্যেক ছুরার পূর্বে বিছমিল্লাহ শরীফ পড়া।

৫. ফাতিহা শরীফ-এর পর আস্তে “আমীন” বলা।

৬. ফাযর-জ্বুহরে তুলনামূলক দীর্ঘ, য়া’ছর-ঈশায় মধ্যম, আর মাগ্বরিবে ছোট ছুরাহ পড়া।

৭. ফাযরের প্রথম রক’য়াত কিছুটা দীর্ঘ করা

রুকূর ছুন্নতসমূহঃ

১. “سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ” অন্তত তিনবার বলা।

২. হাঁটু শক্তভাবে ধরা।

৩. পা সোজা রাখা।

৪. পুরুষের পিঠ সমান রাখা।

৫. রুকূ থেকে উঠতে “سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ” বলা, তারপর “اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ” অথবা “ رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ

ছেযদার ছুন্নতসমূহঃ

১. ছেযদায় যাওয়ার সময় আগে হাঁটু, তারপর হাত, তারপর মুখ রাখা।

২. উঠার সময় উল্টো ক্রমে ওঠা।

৩. ছেযদায় “سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى” তিনবার বলা।

৪. মাথা দুই হাতের মাঝখানে রাখা।

৫. পুরুষের জন্য পেট উরু থেকে আলাদা, কনুই পার্শ্ব থেকে আলাদা রাখা। পুরুষরা দুই হাত বিছিয়ে দিবেনা, নারীরা দেবে।

৬. ছেযদায় দুই পায়ের গোড়ালি মিলিয়ে রাখা নারী পুরুষ উভয়ের।

কা’য়দাহ ও ছালামের ছুন্নতসমূহঃ

১. তাশাহহুদের সময় শাহাদাত আঙুল উঠানো।

২. শেষ বৈঠকে দুরুদে ইবরাহীম য়ালাইহিছ ছালাম পড়া।

৩. তারপর ক্বুরআন-হাদীছ-ছাবিত দ্বো’আ পড়া।

৪. ডানে আগে, পরে বামে ছালাম ফেরানো।

নামাযের মুস্তাহাব/আদবঃ

হানাফি কিতাবে এগুলোকে অনেক সময় আদাবুছ ছ্বলাহ বলা হয়। এগুলো করলে নামাযে খুশু-খুজু, সৌন্দর্য ও কামাল বাড়ে। কিতাবে যেমন এসেছেঃ

১. তাকবীরের সময় পুরুষের হাত আস্তিনের বাইরে বের করা।

২. দাঁড়িয়ে ছেযদার জায়গায় দৃষ্টি রাখা।

৩. রুকূতে দুই পায়ের মধ্যিখানের দিকে তাকানো।

৪. ছেযদায় নাকের ডগার দিকে তাকানো।

৫. বৈঠকে কোলে অর্থাৎ দুই হাটুর মধ্যে তাকানো।

৬. ছালাম ফেরানোর সময় কাঁধের শেষ প্রান্তের দিকে দৃষ্টি দেওয়া।

৭. কাশি আসলে যথাসম্ভব দমন করা।

৮. হাই এলে ডান হাতে মুখ চেপে রাখা।

৯. ইক্বামাতে মুয়াজ্জিনে “حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ” বলা হলে ক্বিয়ামে দাঁড়ানো।

১০. ইমাম দ্বিতীয় “قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ” বলার সময় নামায শুরু করা

Wednesday, March 25, 2026

ক্বুরআন-ছুন্নার আলোকে জিহাদ ও জিহাদ বিরোধী অপপ্রচারের খণ্ডন

ক্বুরআন-ছুন্নার আলোকে জিহাদ ও জিহাদ বিরোধী অপপ্রচারের খণ্ডন

ক্বুরআন-ছুন্নাহ শরীফ উনার আলোকে জিহাদের প্রকার, অনিবার্যতা, ও কারা জিহাদ করবে ও জিহাদ বিরোধী অপপ্রচারের খণ্ডনঃ ইছলামের সবচেয়ে সম্মানিত ও উচ্চস্তরের একটি ফরয ঈবাদাতের নাম হচ্ছেনজিহাদ ক্বুরআন শরীফে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, জিহাদের মুহব্বত ব্যতীত প্রকৃত মুমিন হওয়া মোটেও সম্ভব নয় বরং যে ব্যক্তি জিহাদের চেয়ে তার পরিবার, সম্পদ, ব্যবসা ও বসতবাড়িকে বেশি ভালোবাসে, মুহব্বত করে, তার সম্পর্কে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে যেঃ মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে কখনো হেদায়াত দান করবেন না পবিত্র আল ক্বুরআনে ইরশাদ হয়েছেঃ (قُلۡ اِنۡ كَانَ اٰبَآؤُكُمۡ وَ اَبۡنَآؤُكُمۡ وَ اِخۡوَانُكُمۡ وَ اَزۡوَاجُكُمۡ وَ عَشِیۡرَتُكُمۡ وَ اَمۡوَالُۨ اقۡتَرَفۡتُمُوۡهَا وَ تِجَارَۃٌ تَخۡشَوۡنَ كَسَادَهَا وَ مَسٰكِنُ تَرۡضَوۡنَهَاۤ اَحَبَّ اِلَیۡكُمۡ مِّنَ اللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ جِهَادٍ فِیۡ سَبِیۡلِهٖ فَتَرَبَّصُوۡا حَتّٰی یَاۡتِیَ اللّٰهُ بِاَمۡرِهٖ ؕ وَ اللّٰهُ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الۡفٰسِقِیۡنَ(পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি তাদের বলে দিন, (হে মুছলিম সম্প্রদায়) তোমাদের পিতা (মাতা), তোমাদের সন্তানাদি, তোমাদের ভাই (বোন), তোমাদের স্ত্রীগণ (মহিলাদের বেলায় স্বামী), তোমাদের (রক্ত সম্পর্কীয় সকল) আত্মীয়-স্বজন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছো এবং সকল ব্যবসা-বাণিজ্য, যা লোকসান হয়ে যাবে বলে তোমরা ভয় করো, এমনকি তোমাদের প্রিয় আবাসস্থল যদি (এগুলা) তোমাদের কাছে মহান আল্লাহ তায়ালা, উনার রছূল ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ও জিহাদ ফি ছাবিলিল্লাহর চাইতে অধিক মুহব্বতের বস্তু হয়, তাহলে তোমরা মহান আল্লাহ তা'য়লা উনার (পক্ষ থেকে উনার আযাবের) ঘোষণা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো, আর (জেনে রাখো) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা'য়ালা কখনো ফাছিক সম্প্রদায়কে হেদায়াত প্রদান করেন না (ছুরাহ আত-তাওবা ৯:২৪)

নছফের তাজকিয়া ব্যতীত উক্ত আয়াত শরীফের কায়িম মাক্বাম হওয়া অসম্ভব, আর কোন আম ব্যক্তির পক্ষে নিজে নিজে তাজকিয়া করাও অসম্ভব, কিন্তু এইখানে আমি তাজকিয়ার আলাপ করবনা, ইশারা দিয়ে রাখলাম খারেজীদের জন্যে, যারা নিজেদের ঠিকাদার ভাবে, যাদের সাথে তাছাউফের কোন সম্পর্কই নাই

যদিও উক্ত আয়াত শরীফে ৩ টা জিনিসের উপর ফোকাস করা হয়েছে, কিন্তু আমরা কেবল ১ টা নিয়ে আলোচনা করবো যেটা আজকে আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়, আর সেটা হচ্ছেন জিহাদ ফি ছাবিলিল্লাহ

প্রথমতোঃ দুনিয়াবি সবকিছুকে মুহব্বত করাকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, কিন্তু সীমানার বাইরে গেলেই মাক্বামেফাছিকে খাছহয়ে যেতে হবে, যার পরিণতি দুনিয়া আখিরাতের জন্যে ভয়ানক যেমন, “মহান আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত শরীফে পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, মাল-সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আবাসস্থলের মুহব্বতের কথা বলেছেনযা প্রাকৃতিকভাবেই মানুষ করে থাকে, যা হারাম নয়, বরং বৈধ ও মানবিকও বটে, কিন্তু সতর্ক করে বলা হয়েছে, যদি এই মুহব্বত মহান আল্লাহ তায়ালা, রছূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এবং জিহাদ ফি ছাবিলিল্লাহর চাইতে বেশি প্রাধান্য পায়, তাহলে তা ঈমানদারিত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এখানে কোনো বস্তু হারাম করা হয়নি; বরং মাপকাঠি স্থির করা হয়েছে কার মুহব্বত সর্বোচ্চ রাখতে হবে?

দ্বিতীয়তঃ মহান আল্লাহ তায়ালা ও রছূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার পরে জিহাদকে আলাদা করে বলা হয়েছে কেন? আয়াতে পাকে বলা হয়েছেঃ (مِّنَ اللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ جِهَادٍ فِیۡ سَبِیۡلِهٖ) তিনটি বিষয়ের মাঝে আলাদাوব্যবহৃত হয়েছে, যার দ্বারা প্রমাণিত হয় জিহাদ স্বতন্ত্র ও মৌলিক এক বাস্তব পরীক্ষা হুব্বে ইলাহী ও হুব্বে রছূল ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মূলত অন্তরের বিষয়; কিন্তু জিহাদ হলো সেই মুহব্বতের প্রমাণ স্বরূপ, নফছকে তালাক দিয়ে, শারীরিক ও বাহ্যিক ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ করা, যদিও ইছলামের মূল পাঁচ স্তম্ভে জিহাদের উল্লেখ নেই ঈমানের ৫ স্তম্ভের হাদিছ শরীফে, কিন্তু এই আয়াতে পাকে মহান আল্লাহ তায়ালা জিহাদকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন এটা মুহব্বত যাচাইয়ের অন্যতম মাপকাঠি তাই যারা জিহাদের চেয়ে ঘর-বাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবারকে বেশি মুহব্বত করে, তারা প্রকৃত ঈমানদারতো নয়ই, বরং পরীক্ষায় ফেল করে খাছ ফাছিকদের মাক্বামের অধিকারী হয়ে যায় এমন ফাছিক, যার হেদায়েতের দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়

তৃতীয়তঃ জিহাদ বিমুখতার ভয়ংকর পরিণতি সম্পর্কে আয়াতে পাকে বলা হয়েছেঃ (فَتَرَبَّصُوۡا) - অর্থাৎ, “তাহলে অপেক্ষা করো”; এটি ক্বুরআন শরীফের অন্যতম কঠিন হুমকিসূচক শব্দ, যা আযাব আসার নিশ্চিততা বোঝায় শুধু আযাবের কথা নয়, বরং (وَ اللّٰهُ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الۡفٰسِقِیۡنَ)আর (যেনো রাখো) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা'য়ালা কখনো ফাছিক সম্প্রদায়কে হেদায়াত প্রদান করেন না”, বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ যারা দুনিয়াবি মুহব্বতকে প্রাধান্য দেয়, জিহাদ ফি ছাবিলিল্লাহর উপরে, তারা ফাছিক হয়ে যায় আর একবার কেউফাছিকে খাছবলে ঘোষিত হলে, ক্বুরআন শরীফের বিধান অনুযায়ী তার উপর হিদায়াতের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় অর্থাৎ, জিহাদ বিমুখতা মানুষকে শুধু মহান আল্লাহ তায়ালা উনার গজবের মুখে ফেলে না, বরং তা এমন জাতির অন্তর্ভুক্ত করে দেয়, যাদের আর কখনো হিদায়াত নছীব হয় না তাই এই আয়াত শরীফ সরাসরি প্রমাণ করেন যে, জিহাদ থেকে বিমুখ হওয়া মানেই, হুব্বে দুনিয়া, হুব্বে মাল, হুব্বে আহলুন্ নাফছকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার উপর প্রাধান্য দেওয়া, এবং এর শাস্তি হলো খোদায়ী আযাব-গজব ও চিরতরে হিদায়াত থেকে বঞ্চিত হওয়া

এই আয়াত শরীফ প্রমাণ করেন যে, জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বা সেটাকে গৌণ মনে করাও ইমানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নামান্তর জিহাদ কোনো ঐচ্ছিক কাজ নয়, বরং ঈমানের অংশ কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় বিপদ হল - খারেজি ছালাফি গোষ্ঠী কর্তৃকজিহাদনামক পবিত্র ফরয ঈবাদাতকে বিকৃত করে পরিচালনা করা আইএস, আল-কায়েদা, বোকো হারাম, আল শাবাব, শিয়া হিজবুল্লাহ ইত্যাদি ছালাফি ও ওহাবি, শিয়া সংগঠনসমূহ মূলত ইহুদি-নাছারাদের দালাল হিসেবে মুছলিম জাহানের ভিতরে বিভ্রান্তি ও হানাহানি সৃষ্টি করছে তারা জিহাদের নাম দিয়ে মুমিনদের হত্যা করেছে, শিশু ও মহিলাদের ধর্ষণ করছে, আহলে ক্বিবলার মসজিদে হামলা করেছে - যা ইছলামে জিহাদের নামে ফাছাদ ফিল আরদ্ব

মহান আল্লাহ পাক কালামুল্লাহ শরীফে খুব সুন্দর একটি আয়াত শরীফ নাযিল করেছেন এই বিষয়ে মহান আল্লাহ পাক বলেনঃ (وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا۟ فِى ٱلْأَرْضِ قَالُوٓا۟ إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ أَلَآ إِنَّهُمْ هُمُ ٱلْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ) আর যখন তাদের বলা হয়, ‘তোমরা জমিনে (ফিত্না)-ফাছাদ সৃষ্টি করো না,’ তখন তারা বলে, ‘আমরাই তো (বরং) ইছলাহকারি’ (অতএব) সাবধান (থেকো এদের ব্যাপারে)! মূলত তারাই হচ্ছে আসল ফাছাদকারী, কিন্তু তারা তা অনুধাবন করতে পারে না (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১১-১২) বুঝতে পারছেন? জিহাদের নামে মুছলমানদের বিরুদ্ধেই তাদের সকল কার্যক্রম, সেটা খারেজি ছালাফি, ওহাবী, শিয়া যারাই হোক না কেন এরা কাফিরদের কোন ক্ষয়ক্ষতি না করলেও কথিত শিরক নির্মুলের নামে মুছলমানদের সবকিছুই ধ্বংস করে যাচ্ছে

যাইহোক, সম্মানিত আহলুছ ছুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আক্বীদা + তাজকিয়া সহ জিহাদ-ই হচ্ছেন হাক্বিকি জিহাদ যে জিহাদে তাযকিয়াতুন নফছ নেই, বরং দুনিয়া ও রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকে, সেই জিহাদ, জিহাদ নয়, বরং তা একধরনের ফিতনা প্রকৃত জিহাদ শুরু হয় নিজের নফছের বিরুদ্ধে, তারপর সঠিক নেতৃত্ব ও শরঈ নিয়ম অনুসারে দুশমনের বিরুদ্ধে

এই প্রবন্ধে আমরা ইনশাআল্লাহ আলোচনা করবোঃ

জিহাদ কীঃ- এর সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য

জিহাদের প্রকারভেদঃ- নফছ, ইলম, দাওয়াহ, ক্বিতাল

কখন কোন জিহাদ ফরয হয়ঃ- ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়

কার বিরুদ্ধে হাক্বিকি জিহাদ হয়ঃ- কাফির, যালিম, মুনাফিক নাকি মুছলিম?

এবং সর্বশেষঃ- জিহাদ পরিচালনার অধিকার কার? ব্যক্তির না রাষ্ট্রের?

এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করবো যেঃ জিহাদ এক পবিত্র ঈবাদাত, কিন্তু ভুল নেতৃত্ব ও আক্বিদার অধীনে তা ভয়াবহ ফিতনায় রূপ নিতে পারে

জিহাদঃ সংজ্ঞা ও পরিভাষাগত ব্যাখ্যা

শব্দমূল বিশ্লেষণ (Root Meaning): جِهَادٌ শব্দটি এসেছেন جَهَدَ - يَجْهَدُ - جُهْدًا وَجِهَادًا মূল ধাতু থেকে, যার অর্থঃ

جَهَدَ - সে পরিশ্রম করলোঃ অর্থাৎ পরিশ্রম করা

يَجْهَدُ - সে পরিশ্রম করেঃ অর্থাৎ কঠিন চেষ্টা করা

جُهْدًا - পরিশ্রম, সাধনা

جِهَادًا - সংগ্রাম: বাতিলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা

এছাড়াও, “জুহদ (جُهْد) শব্দটিও একই মূল ধাতু থেকে এসেছে, যার মানে হলো - কষ্টসহিষ্ণু সাধনা আবারزُهْدশব্দটি এসেছেزَهِدَ – يَزْهَدُ – زُهْدًاধাতু থেকে (যার মানেঃ দুনিয়া পরিত্যাগ)

زَهِدَ - সে দুনিয়াবিমুখ হলো।

 يَزْهَدُ - সে দুনিয়াবিমুখ হয়।

زُهْدًا - দুনিয়াবিমুখতাঃ দুনিয়া পরিত্যাগ।

ক্বুরআন শরীফেজিহাদশব্দের ব্যবহারঃ

জিহাদশব্দটি ক্বুরআন শরীফে প্রায় ৩০+ বার এসেছেন দেখেছি আমি সর্বদাই এটি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সন্তুষ্টির জন্যে জান-মাল-নফছ দ্বারা আত্মোৎসর্গমূলক চেষ্টা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছেন যেমনঃ

১) (وَ جَاهِدُوۡا فِی اللّٰهِ حَقَّ جِهَادِهٖ) তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথে জিহাদের হক্ব আদায় করেই জিহাদ করো (ছুরাহ আল-হাজ্জঃ ২২:৭৮)

২) (فَلَا تُطِعِ الۡكٰفِرِیۡنَ وَ جَاهِدۡهُمۡ بِهٖ جِهَادًا كَبِیۡرًا) (হে নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) অতএব, আপনি কাফিরদের আনুগত্য করবেন না, বরং ফুরক্বন দ্বারা তাদের বিরুদ্ধে এক আজ্বিমুশ্‌শান জিহাদ পরিচালনা করুন (ছুরাহ আল-ফুরক্বনঃ ২৫:৫২) এখানে মহান আল্লাহ তায়ালা ফুরক্বনি শানে জিহাদ করার হুকুম দিচ্ছেন, যা প্রমাণ করে যে জিহাদ মানেই শুধু অস্ত্র নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ময়দানের যুদ্ধ নয়

এইখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, অনেক অনুবাদক ফুরক্বন শব্দের অর্থ করেছেন পবিত্র ক্বুরআন শরীফ, আমি তাদের সাথে মোটেও একমত নই, আমার মতে ফুরক্বন কোন কিতাব নয়, বরং এটি একটি ছ্বিফাত, ছ্বিফাত আর কিতাবের মধ্যে দ্বীন রাতের তফাৎ রয়েছেন, তাছাড়া ক্বুরআন কেবল রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকেই আতা করা হয়েছে, অথচ ফুরক্বন-এর ব্যাপারে মহান আল্লাহ পাক স্পষ্ট বলছেনঃ (وَ اِذۡ اٰتَیۡنَا مُوۡسَی الۡكِتٰبَ وَ الۡفُرۡقَانَ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُوۡنَ) আর (স্মরণ করো), যখন আমি মূছা য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে কিতাব ও ফুরক্বন দিয়েছিলাম, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:৫৩) এইখানে কিতাব ও ফুরক্বন আলাধা করেই বলেছেন মহান আল্লাহ তায়ালা, যদি ফুরক্বন কিতাবই হতেন ক্বুরআন শরীফের মতো তাহলে কিতাব ও ফুরক্বন দিয়েছিলাম বলতেন না, বরং ফুরক্বন নামের এক কিতাব দিয়েছিলাম বলতেন শুধু তাই নয় আরো স্পষ্ট করেই বলেছেনঃ (یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ تَتَّقُوا اللّٰهَ یَجۡعَلۡ لَّكُمۡ فُرۡقَانًا وَّ یُكَفِّرۡ عَنۡكُمۡ سَیِّاٰتِكُمۡ وَ یَغۡفِرۡ لَكُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ ذُو الۡفَضۡلِ الۡعَظِیۡمِ) হে মুমিনগণ! তোমরা যদি মুত্তাক্বী হও, তাহলে তিনি তোমাদেরকে ফুরক্বনী নূর আতা করবেন, তোমাদের গুনাহসমূহ মোচন করে দেবেন, এবং তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন আর আল্লাহ তায়ালা উনিই তো মহা অনুগ্রহশীল। (ছুরাহ আল-আনফাল ৮:২৯)

তাফছীরের প্রায় সকল কিতাব অনুসারেঃ (الفُرْقَانَ) হচ্ছেন সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী, হালাল ও হারামের বিধান বর্ণনাকারী, ক্বুরআন শরীফের আরেক নাম হলো ফুরক্বন কিন্তু আমার নিকট ফুরক্বন হলেন সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী, হালাল ও হারামের বিধান বর্ণনাকারী একটি নূর, আধ্ম্যাত্বীক শক্তি ও হুকুম, যা ক্বুরআন শরীফের মধ্যেও নাযিল করা হয়েছে, তাই অনেকে ক্বুরআন শরীফ নামেই অনুবাদ করে থাকেন তবে মূলে এটা কিতাব নয় বরং আমর ও ছ্বিফাত বলেই আমি মনে করি

আবূ ছাঈদ আল-খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ (اتَّقُوا فِرَاسَةَ الْمُؤْمِنِ، فَإِنَّهُ يَنْظُرُ بِنُورِ اللَّهِ)তোমরা মুমিনের অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় করো, নিশ্চয়ই সে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নূর দ্বারা দেখে থাকে এরপর তিনি এই আয়াত শরীফ তিলাওয়াত করেনঃ (اِنَّ فِیۡ ذٰلِكَ لَاٰیٰتٍ لِّلۡمُتَوَسِّمِیۡنَ)নিশ্চয় এসব ঘটনার মধ্যে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য নিদর্শন রয়েছে (ছুরাহ আল-হিজরঃ ১৫:৭৫, ছুনান আত-তিরমিযি শরীফ ৩১২৭) হাদীছের মানঃ হাছান, বলেছেন ইমাম আল-হাইছামী রহমতুল্লাহ

ছালাফিদের ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেনঃএটি এমন এক নূর, যা মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি উনার বান্দার অন্তরে দান করেন, যার দ্বারা সে হক্ব ও বাতিল, উপকারী ও অপকারী, সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীর মাঝে পার্থক্য করতে সক্ষম হয়” (সূত্রঃ মাদারিজুছ ছালিকীন, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৫৩)

অতএব ফুরক্বন একটি নূরে ইলাহী, উহার দ্বারা সকল ধরণের জিহাদ করা সহজ সেটা দাওয়াতি হোক কিংবা ফিজিক্যালি আর এটাই ঐ আয়াত শরীফে বলেছেন যে, “হে মুমিনগণ! তোমরা যদি মুত্তাক্বী হও, তাহলে তিনি তোমাদেরকে ফুরক্বনী নূর আতা করবেন তাহলে দেখা গেলো ক্বুরআন শরীফ শুধু শত্রুর সাথে ময়দানে জিহাদ করতে বলেননি, বরং আজ্বিমুশ্‌শান জিহাদ ফুরক্বন দ্বারা করতে বলেছেন

হাদীছ শরীফে জিহাদের সংজ্ঞাঃ

১) হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (وَالْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي طَاعَةِ اللَّهِ) রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, “প্রকৃত মুজাহিদ হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের নফছের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার আনুগত্যে জিহাদ করেন (তিরমিযি শরীফ ১৬২১, শুআবুল ঈমান, মিশকাত শরীফ)

২) হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ إِذَا أَنَا عَمِلْتُهُ أَحَبَّنِي اللَّهُ وَأَحَبَّنِي النَّاسُ. قَالَ: «ازْهَدْ فِي الدُّنْيَا يُحِبُّكَ اللَّهُ وَازْهَدْ فِيمَا عِنْدَ النَّاسِ يُحِبَّكَ النَّاسُ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْن مَاجَه) ছাহল ইবনু ছায়দ রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার কাছে এসে বললেন, “ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম! আমাকে এমন একটি কাজের আদেশ দিন যা করলে মহান আল্লাহ তায়ালা আমাকে ভালোবাসবেন এবং মানুষেরাও আমাকে ভালোবাসবে তিনি বললেনঃ দুনিয়া বিমুখ হও (মানে দুনিয়ার প্রতি নফছের আসক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করো), তাহলে মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাকে ভালোবাসবেন এবং মানুষের নিকট যা আছে তার প্রতি লোভ করো না তাহলে লোকেরা তোমাকে ভালোবাসবে (ছুনান ইবনে মাজাহ শরীফ ৪১০২, রিয়াদ্বুছ ছ্বলিহিন শরীফ, বুলুগুল মারাম শরীফ, মিশকাতুল মাছাবীহ শরীফ) এই দুনিয়া বিমুখী জিহাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকেও রয়েছে অসম্ভব সুন্দর নছিহত, মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (قَدۡ اَفۡلَحَ مَنۡ تَزَكّٰی وَ ذَكَرَ اسۡمَ رَبِّهٖ فَصَلّٰی بَلۡ تُؤۡثِرُوۡنَ الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃُ خَیۡرٌ وَّ اَبۡقٰی) নিশ্চয়ই সে ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে তার নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করেছে, অতঃপর তার রব তায়ালা উনার নামের যিকির করেছে, এরপর সে নামায আদায় করেছে কিন্তু তোমরা তো দুনিয়ার জীবনকেই আখেরাতের জীবনের ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকো, অথচ আখেরাতের জীবনই হচ্ছেন সর্বোত্তম ও চিরস্থায়ী (ছুরাহ আল-আলা ৮৭:১৪১৭)

৩) হাদিছ শরীফে আরো এসেছেনঃ (قَالَ سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنِ الرَّجُلِ يُقَاتِلُ شَجَاعَةً وَيُقَاتِلُ حَمِيَّةً وَيُقَاتِلُ رِيَاءً فَأَىُّ ذَلِكَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ ‏ "‏ مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ) এক ব্যক্তি নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেনঃ এক ব্যক্তি যুদ্ধ করে বীরত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে, আরেকজন যুদ্ধ করে জাতিগত গোঁড়ামির কারণে, এবং কেউ যুদ্ধ করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে, “এদের মধ্যে কে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাস্তায় যুদ্ধ করছে?” তখন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেনঃযে ব্যক্তি এই উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে, যেন মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বাণীই সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই-ই (হাক্বিকতে) মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাস্তায় যুদ্ধ করছে কিংবা সেই মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাস্তার (প্রকৃত) মুজাহিদ (বুখারি শরীফ ১২৩, মুছলিম শরীফ ১৯০৪, ২৮১০, ৩১২৬, তিরমিযি ১৬৪৬, নাছাঈ শরীফ ৩১৩৬, ইবনে মাজাহ শরীফ ২৭৮৩, মিশকাত শরীফ ৩৮১৪)

ইছলামি পরিভাষায় জিহাদের সংজ্ঞাঃ (بَذْلُ الجُهْدِ والطَّاقَةِ في نُصْرَةِ دِينِ اللهِ وتَعْلِيَةِ كَلِمَتِهِ، وَقِتَالِ أَعْدَائِهِ عِندَ الْحَاجَةِ تَحْتَ وِلَايَةٍ شَرْعِيَّةٍ)মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও উনার বাণীকে শ্রেষ্ঠ করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করাকে জিহাদ বলা হয় যখন প্রয়োজন হয়, তখন শরয়ী অনুমোদিত নেতৃত্বের অধীনে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাও এর অন্তর্ভুক্ত

সারসংক্ষেপে জিহাদের সংজ্ঞাঃ জিহাদ হল এমন এক ঈবাদাত, যার মাধ্যমে একজন মুমিন ব্যক্তি নিজের জান, মাল, সময় ও কল্পনাশক্তি ব্যয় করে, শুধুমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সন্তুষ্টির জন্য, হক্ব প্রতিষ্ঠা ও বাতিল ধ্বংসের লক্ষ্যে সংগ্রাম করে

জিহাদ নয় যে বিষয়গুলোঃ

 ভুল ব্যাখ্যাঃ দুনিয়াবি স্বার্থে যুদ্ধ, রাজনৈতিক সহিংসতা, মুছলমানদের হত্যা করা, ইহুদি-নাছারাদের দালালি করেজিহাদদাবী করাআবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেনঃ যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে গেল এবং জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সে জাহেলিয়াতের (অবস্থায়) মৃত্যুবরণ করলআর যে ব্যক্তি লক্ষ্যহীন নের্তৃত্বের পতাকাতলে যুদ্ধ করে গোত্রপ্রীতির জন্য ক্রুদ্ধ হয় অথবা গোত্রের দিকে আহবান করে অথবা গোত্রের সাহায্যার্থে যুদ্ধ করে (মহান আল্লাহ তা’য়লার সন্তুষ্টির কোন ব্যাপার সেখানে থাকেনা) আর তাতে নিহত হয়, সেও জাহেলিয়াতের উপর মৃত্যুবরণ করে। (মুলিম শরীফ ১৮৪৮এ, নাছাঈ শরীফ ৪১১৪, মিশকাত শরীফ ৩৬৬৯) 

প্রকৃত অর্থঃ মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সন্তুষ্টিতে সংগ্রাম, শরয়ী অনুমোদিত ক্বিতাল, কুফরের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক সংগ্রাম, শুধুমাত্র আহলুছ ছুন্নাহর নেতৃত্বে অনুমোদিত জিহাদ

জিহাদের প্রকারভেদঃ ক্বুরআন ছুন্নাহ শরীফ উনার ‌আলোকে বিশ্লেষণ

ভূমিকাঃ ইছলামে জিহাদ বলতে কেবলমাত্র তরবারির যুদ্ধকে বোঝানো হয় না বরং ক্বুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাইঃ- জিহাদ একটি পূর্ণ জীবনব্যাপী সংগ্রাম, যার বিভিন্ন স্তর ও রূপ রয়েছে এসব রূপ একে অপরকে পরিপূর্ন করে কেউ যদি বাহ্যিক জিহাদ করে কিন্তু অন্তরে নফছের জিহাদ না থাকে, তবে সে খারেজি বা ফিতনা সৃষ্টিকারীর অন্তর্ভুক্ত হয় আর কেউ যদি কেবল আত্মিক সাধনায় লিপ্ত থাকে কিন্তু বাতিলের বিরুদ্ধে হক্ব প্রকাশ না করে, সে চরম দুর্বল ইমানের অধিকারী হয়

ক্বুরআন-হাদিছ শরীফ রিসার্চ করে যেটা পাওয়া যায় সেটা হলো, জিহাদ মূলত ২ প্রকারঃ

১) নফছের জিহাদঃ- যা মানুষ নিজের সাথে করে থাকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পূর্ন আনুগত্যের প্রমাণ দিতে

২) শারীরিক জিহাদঃ যা সরাসরি অস্ত্রের মাধ্যমে শত্রুর বিরুদ্ধে ময়দানে সম্মানিত দ্বীন ইছলামের পক্ষে করা হয়

জিহাদ মূলত অন্তর-ভিত্তিক, আত্মিক ও বাহ্যিক উভয় সংগ্রামের সমষ্টি, যেটাকে আজকাল ভন্ড বাতিল ফেরকা ছালাফিরা কেবল শারীরিক ময়দানের জ্বিহাদে সিমাবদ্ধ করে ফেলেছে তবে উক্ত দুই প্রকারকে প্রায় ৫ ভাগে ভাগ করা যায়

জিহাদুন নফছঃ নিজের প্রবৃত্তি ও নফছের খারাপ স্বভাবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা

জিহাদ বিল লিছানঃ সত্য কথা, নছিহত, খুতবা ও দাওয়াহর মাধ্যমে কুফর-মুনাফিকদের মোকাবিলা করা

জিহাদ বিল ক্বলমঃ কলম ও বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ, বাতিল মতবাদ খণ্ডন, নাস্তিক-মুর্তাদদের জবাব দেওয়া

জিহাদ বিল মালঃ অর্থ-সম্পদ দিয়ে দ্বীনের পথে সাহায্য করা

জিহাদ ফী ছাবিলিল্লাহ বা ক্বিতালঃ অস্ত্রধারী জিহাদ, শুধুমাত্র শরয়ী নেতৃত্বে এবং সুনির্দিষ্ট শর্তে বৈধ

১. জিহাদুন নফছ (নফছের বিরুদ্ধে জিহাদ):

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَ الَّذِیۡنَ جَاهَدُوۡا فِیۡنَا لَنَهۡدِیَنَّهُمۡ سُبُلَنَا ؕ وَ اِنَّ اللّٰهَ لَمَعَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ) যারা আমাকে পাওয়ার জন্যে নিজের নফছের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যায়, তারা যদি পথ নাও পায়, আমি মহান আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং তাদের পথ দেখিয়ে দেই আর নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ তায়ালা মুহছিনদের সাথেই আছেন (ছূরাহ আল-আনকাবুতঃ ২৯:৬৯)

এই আয়াত শরীফে যুদ্ধের কোনো প্রসঙ্গ নেই; বরং নফছের বিরুদ্ধে আত্মিক সংগ্রাম বোঝানো হয়েছে

তাজকিয়া ছাড়া বাহ্যিক জিহাদ হলো ধোঁকা, কারণ যার অন্তর শুদ্ধ নয়, সে নেতৃত্ব নিয়ে ফাছাদ করে (যেমন খারেজিরা করেছে)

২. জিহাদ বিল লিছান (জিহাদ দ্বারা দাওয়াহ ও সত্য উচ্চারণ):

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (فَلَا تُطِعِ الۡكٰفِرِیۡنَ وَ جَاهِدۡهُمۡ بِهٖ جِهَادًا كَبِیۡرًا) (হে নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) অতএব, আপনি কাফিরদের আনুগত্য করবেন না, বরং ফুরক্বন দ্বারা তাদের বিরুদ্ধে এক আজ্বিমুশ্‌শান জিহাদ পরিচালনা করুন। (ছুরাহ আল-ফুরক্বনঃ ২৫:৫২)

এখানেও অস্ত্র নয়, বরং ক্বুরআন শরীফের মধ্যে নাজিলকৃত ফুরক্বনী নূর তথা অখন্ডিত যুক্তি, হিকমত ও অখন্ডিত বাণীর মাধ্যমে কাফিরদের মোকাবিলা করাই বড় জিহাদ বলা হয়েছে

৩. জিহাদ বিল ক্বলম (বুদ্ধিবৃত্তিক ও লেখনী জিহাদ):

জিহাদ বিল ক্বলমতথা বুদ্ধিবৃত্তিক ও লেখনী জিহাদ-এর ব্যাপারে বিগত ১৪০০ বছরে বাঘা বাঘা ঈমামদের স্থান সবার উপরে, যারা বাতিল ফেরকা তথাঃ খারেজি, রাফেজি, মুতাজিলা, নাছেবি, ওহাবি, দেওবন্দি, কাদিয়ানী, নাস্তিক ও ধর্মদ্রোহী (যারা ইছলামের অস্তিত্ব ও সত্যতাকে অস্বীকার করে) এছাড়াও ইহুদি ও নাছারা (ক্রুসেডার, যাযাবর বুদ্ধিজীবী, অরিয়েন্টালিস্ট, ইত্যাদির বিরুদ্ধে ছুন্নী ক্বলম দ্বারা সজাগ ও প্রতিরোধমূলক কাজ করেছেন

১৪০০ বছরের শ্রেষ্ঠজিহাদ বিল ক্বলমপরিচালনাকারী ছুন্নী য়ালিমগণ (ধারাবাহিকভাবে):

খোলাফায়ে রাশেদীনদের যুগের পরবর্তী প্রজন্ম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন থেকে মধ্যযুগীয় য়ালিমগণঃ

ইমাম আবু হানীফা রহমতুল্লাহঃ জাহমিয়্যাহ, ক্বদরিয়্যাহ, রাফেজিদের বিরুদ্ধে

ইমাম মালিক ইবনে আনাছ রহমতুল্লাহঃ বিদআতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি ফতোয়া

ইমাম আশ-শাফিঈ রহমতুল্লাহঃ ক্বদরিয়্যাহ, রাফেজিদের বিরুদ্ধে বিশুদ্ধ আক্বীদা প্রতিষ্ঠা

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহঃ খালিছ ক্বলমি ও মৌখিক জিহাদ করেছেন মুতাজিলাদের বিরুদ্ধে

ইমাম তাহাবি রহমতুল্লাহঃ আক্বীদাহ তাহাবিয়্যাহ গ্রন্থে বাতিল আক্বীদার মোকাবেলা করেছেন

ইমাম আবুল হাছান আল আশআরি রহমতুল্লাহঃ মুতাজিলাদের থেকে ফিরে এসে কালাম লিখে ছুন্নী আক্বিদার রক্ষক হোন

ইমাম আবু মনছুর আল মাতুরিদী রহমতুল্লাহঃ বিশেষত মাওরাউন-নাহরের তৎকালীন রাফেজি ও জিন্দিকদের বিরুদ্ধে

ইমাম যাহাবি রহমতুল্লাহঃ শাজ আক্বিদার মুখোশ উন্মোচন করেন

ইমাম কুরতুবী রহমতুল্লাহঃ রাফেজি ও দেহরিয়্যাহদের বিরুদ্ধে ক্বলম ধরেছেন

ইমাম গাযালী রহমতুল্লাহঃ তাফাক্কুরী জিহাদের রাহবারতাহাফুতুল ফালাছিফা”-এর মাধ্যমে ফিলোছফিক্যাল নাস্তিকদের ভণ্ডামি উন্মোচন করেছেন

ইমাম ছুয়ূতী রহমতুল্লাহঃ বহু মুনাযারা, বাতিল ফেরকার খণ্ডন লিখেছেন

আহমদ রেযা খান বেরেলভীঃ ওহাবি/দেওবন্দি/নাজদিদের বিরুদ্ধে লিখেছেন

বদিউজ্জামান ছাঈদ নূরছি রহমতুল্লাহঃ তুরস্কে রিয়ালিস্ট নাস্তিকতাবাদ ও সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধে রিছালা-ই-নূর রচনা করেন

আজকের যুগে বিজ্ঞান, কলম ও মিডিয়াই প্রধান যুদ্ধের ময়দান যারা সত্যের পক্ষে লিখেন, তারাই সবচেয়ে বড় মুজাহিদ কারো বাপের ক্ষমতা নাই কোন অস্ত্র ব্যবহার করে আমেরিকা, ইউরোপ, ইংল্যান্ড, ইছরাঈল কিংবা রাশিয়া চিনের একটা চুল ছিঁড়তে, কিন্তু লিখা, বিজ্ঞান, হ্যাকিং দিয়ে পেন্টাগন কিংবা ক্রামলিনের ঘুম হারাম করে দেওয়া সম্ভব

৪. জিহাদ বিল মাল (অর্থ দ্বারা জিহাদ):

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (اِنۡفِرُوۡا خِفَافًا وَّ ثِقَالًا وَّ جَاهِدُوۡا بِاَمۡوَالِكُمۡ وَ اَنۡفُسِكُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ؕ ذٰلِكُمۡ خَیۡرٌ لَّكُمۡ اِنۡ كُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ) তোমরা জিহাদে বেরিয়ে পড়ো, কম কিংবা বেশি (রনসম্ভারেই) হোক, জিহাদ করো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথে জান ও মাল দিয়ে এটিই তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা তা বুঝতে পারো (ছুরাহ আত-তাওবাঃ ৯:৪১)

উক্ত আয়াতে ফিজিক্যাল জিহাদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন মহান আল্লাহ তায়ালাকম কিংবা বেশি (রণসম্ভারেই) হোকএর মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালা তাগিদ দিচ্ছেন যে, দূরের রাস্তা, রোদ, কিংবা বেশি সরঞ্জাম বহনের কষ্টের অজুহাত দেখানো যাবে না তাবুকের অভিযান ছিল প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরের যাত্রা, গ্রীষ্মের তীব্র তাপে, এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে অনেক ছ্বহাবি প্রাথমিকভাবে অংশ নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন, কারণঃ দীর্ঘ যাত্রার কষ্ট, রোদ ও গরমের তীব্রতা, সরঞ্জাম বা সম্পদের অভাব ছিলো কিন্তু এই আয়াত শরীফেরاِنْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا তাদেরকে তাগিদ দেন যে, যেকোনো অবস্থায় বা যেকোনো পরিমাণ সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবেوَّ جَاهِدُوۡا بِاَمۡوَالِكُمۡ وَ اَنۡفُسِكُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ আর জিহাদ থেকে জানের মায়ায়, মালের মায়ায়, পালানোর কোন সুযোগ নাই, বরং নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, জিহাদ করতে হবে জান-মাল দুইটা দিয়েই আজ ফিজিক্যাল জিহাদ নাই কিন্তু মালের জিহাদ তো মওজুদ তাই যারা অর্থ-সম্পদ দিয়ে আহলুছ ছুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আক্বিদার দাওয়াহ চালায়, তারাই সত্যিকারের জিহাদ বিল মালের মুজাহিদ

৫. জিহাদ ফী ছাবিলিল্লাহ (সশস্ত্র যুদ্ধ):

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (كُتِبَ عَلَیۡكُمُ الۡقِتَالُ وَ هُوَ كُرۡهٌ لَّكُمۡ ۚ وَ عَسٰۤی اَنۡ تَكۡرَهُوۡا شَیۡئًا وَّ هُوَ خَیۡرٌ لَّكُمۡ ۚ وَ عَسٰۤی اَنۡ تُحِبُّوۡا شَیۡئًا وَّ هُوَ شَرٌّ لَّكُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ یَعۡلَمُ وَ اَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ) তোমাদের উপর সশস্ত্র জিহাদ ফরজ করা হয়েছে, যদিও তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয় বিষয়, তবে হতে পারে কোন বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর আবার এমনও হতে পারে যে কোন বিষয় তোমরা পছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর আর মহান আল্লাহ তায়ালা (এইসব ভালো করেই) জানেন যদিও তোমরা তা না জানো (ছুরাহ আল-বাক্বারাহঃ ২:২১৬)

মহান আল্লাহ পাক সশস্ত্র যুদ্ধ ফরজ করার পর, কাদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ করতে হবে তাও বলে দিচ্ছেনঃ (وَ قَاتِلُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ الَّذِیۡنَ یُقَاتِلُوۡنَكُمۡ وَ لَا تَعۡتَدُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یُحِبُّ الۡمُعۡتَدِیۡنَ) তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথে সশস্ত্র জিহাদ করো তাদের বিরুদ্ধে, যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে; তবে সীমালঙ্ঘন করো না নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৯০)

এই যুদ্ধ আক্রমণ, আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক, কেবল শরীয়ত অনুমোদিত নেতৃত্ব থাকলেই তা বৈধ

এই হলো জিহাদের সকল প্রকার, যা অধিকাংশ ব্রেইন ওয়াশ করা পোলাপান জানেওনা বুঝেও না, মানেও না, ফলে নিজেরাও ফেত্নায় জড়ায়, পরিবার পরিজনকেও ফেলায়

খারেজি ও ছালাফিদের জিহাদের ভ্রান্ত ব্যাখ্যার খণ্ডনঃ

খারেজিরা শুধু বাহ্যিক জিহাদকেই জিহাদ মনে করে, আর তাজকিয়াহ, ইখলাছ, নেতৃত্বের অনুমোদন, এই সবকিছুকে বাতিল বলে অথচ পবিত্র ক্বুরআন-হাদীছ শরীফে সেই জিহাদকে ফিতনা বলা হয়েছে, যা আহলে ক্বিবলার রক্ত ঝরায় রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السِّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا)যে ব্যক্তি আমাদের (মুছলমানদের) বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়” (বুখারী শরীফ ৭০৭০)

কখন কোন জিহাদ ফরয হয়? – আহকাম ও প্রেক্ষাপটভিত্তিক বিশ্লেষণ

ভূমিকাঃ জিহাদ একটি সর্বজনীন শব্দ, তবে সমস্ত প্রকার জিহাদ সবসময় সবার ওপর ফরয নয়, বরং ইছলামিক শরীয়ত পরিস্থিতি, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রভেদে জিহাদকে ফরয, নফল, মুস্তাহাব বা হারাম আকারেও শ্রেণিবদ্ধ করেছেন তেমনি, কোনো একটি জিহাদ এক শ্রেণির জন্য ফরযে আইন, আবার আরেক শ্রেণির জন্য এমনও হতে পারে যে তা ফরযে কিফায়া আর যেখানে নেতৃত্বহীন জিহাদ, আক্বিদাহ-বিচ্যুত সংগঠন, আত্মশুদ্ধি ছাড়া যুদ্ধ, সেগুলো শতভাগ হারাম ও ফিতনার অন্তর্ভুক্ত

১. জিহাদুন নফছ (নফছের বিরুদ্ধে জিহাদ) সর্বদা ফরযে আইনঃ প্রত্যেক বালেগ মুছলমানের উপর নিজ নফছের বিরুদ্ধে জিহাদ করা সরাসরি ফরযে আইন কারণ, ঈমানের হিফাজত, য়ামল, তাক্বওয়া এবং দ্বীনি জীবন গঠনের প্রথম শর্তই হলো নফছকে নিয়ন্ত্রণ করা মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَ اَمَّا مَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّهٖ وَ نَهَی النَّفۡسَ عَنِ الۡهَوٰی فَاِنَّ الۡجَنَّۃَ هِیَ الۡمَاۡوٰی) আর যে ব্যক্তি তার রব তায়ালা উনার সম্মুখে দাঁড়ানোর (দিনটির) বিষয়ে ভয় করেছে এবং (এ ভয়ে) তার নফছকে (সমস্ত) নাপাকি থেকে বিরত রাখে, নিশ্চয়ই জান্নাতুল মাওয়াই হবে তার চিরস্থায়ী ঠিকানা (ছুরাহ আন-নাযিয়াত ৭৯:৪০-৪১)

২. জিহাদ বিল লিছানঃ জবান কিংবা ক্বলম দ্বারা সময়, সামর্থ্য ও পজিশন অনুযায়ী ব্যক্তি অনুসারে ফরয বা মুস্তাহাবঃ

যারা হাক্বিকি য়ালিম, দায়ী, বক্তা, লেখক, তাদের উপর সত্য প্রচার ও বাতিল খণ্ডন করা ফরযে আইন আর সাধারণ মুছলমানদের জন্যেঃ কেউ ভুল করলে, তাওফীক অনুসারে সতর্ক করা ওয়াজিব হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَٰلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ) আবূ ছাঈদ খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ আমি রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে বলতে শুনেছি, “‘তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় (মুনকার) দেখতে পায়, তবে সে যেনো তা নিজের হাতে পরিবর্তন করে যদি সামর্থ্য না থাকে, তবে নিজের মুখ দ্বারা (প্রতিবাদ করে) আর যদি তাও না পারে, তবে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করুক, আর এটাই হচ্ছে ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর হাদিছ শরীফ সুত্রঃ (বুখারী শরীফ ৯৫৬, মুছলিম শরীফ ৪৯, তিরমিযী শরীফ ২১৭২, নাছাঈ শরীফ ৫০০৮, ৫০০৯, আবূ দাউদ শরীফ ১১৪০, ৪৩৪০, ইবনু মাজাহ শরীফ ১২৭৫, ৪০১৩, মুছনাদে আহমাদ শরীফ ১০৬৮৯, ১০৭৬৬, ১১০৬৮, ১১১০০, ১১১২২, ১১১৪৫, ১১৪৬৬, দারেমী শরীফ ২৭৪০১)

৩. জিহাদ বিল মাল, অর্থের জিহাদঃ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফরযে আইন/কিফায়া

যখন উম্মাহ বিপদে, দাওয়াহ রোধ করা হচ্ছে, গরীবদের ইছলাম শেখার সামর্থ্য নেই, তখন অর্থ দিয়ে সাহায্য করা ফরযে আইন (اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ هَاجَرُوۡا وَ جٰهَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ بِاَمۡوَالِهِمۡ وَ اَنۡفُسِهِمۡ ۙ اَعۡظَمُ دَرَجَۃً عِنۡدَ اللّٰهِ ؕ وَ اُولٰٓئِكَ هُمُ الۡفَآئِزُوۡنَ) যারা মুমিন হয়েছে, হিজরত করেছে, আর মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথে নিজদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে, মহান আল্লাহ তায়ালা উনার কাছে তারা বড়ই মর্যাদাবান, আর তারাই মূলত ফজিলতপ্রাপ্ত-সফলকাম (ছুরাহ আত-তাওবাঃ ৯:২০)

সাধারণ পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাস্তায় অর্থ ব্যয় করা নফল বা মুস্তাহাব

৪. জিহাদ ফী ছাবিলিল্লাহঃ সশস্ত্র যুদ্ধ যে পরিস্থিতিতে ফরয হয়!

ফরযে আইন (ব্যক্তিগতভাবে): যখন শত্রু মুছলিম অঞ্চল আক্রমণ করে এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী কম থাকে, তখন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুছলমানের উপর জান-মাল দিয়ে যুদ্ধ করা ফরযে আইন হয় মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَ مَا لَكُمۡ لَا تُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ الۡمُسۡتَضۡعَفِیۡنَ مِنَ الرِّجَالِ وَ النِّسَآءِ وَ الۡوِلۡدَانِ) তোমরা কেন সশস্ত্র জিহাদ করবে না সেই সমস্ত দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে যারা অত্যাচারিত? (ছুরাহ আন-নিছা ৪:৭৫)

ফরযে কিফায়া (সমষ্টিগত দায়িত্ব): যদি মুছলিম রাষ্ট্রে শান্তি বিরাজ করে, তবে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দ্বীন ছড়িয়ে দিতে ও সীমান্ত রক্ষা করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সামরিক প্রস্তুতি, বাহিনী ও দাওয়ার জিহাদ চালানো ফরযে কিফায়া মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَلۡتَكُنۡ مِّنۡكُمۡ اُمَّۃٌ یَّدۡعُوۡنَ اِلَی الۡخَیۡرِ وَ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡكَرِ ؕ وَ اُولٰٓئِكَ هُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ) তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহবান করে এবং সৎ কাজে আদেশ করে ও অসৎ কাজে নিষেধ করে, আর তারাই মূলত সফলকাম (ছুরাহ আলে ইমরান য়ালাইহিছ ছালামঃ ৩:১০৪)

হারাম ও নিষিদ্ধঃ

যে জিহাদঃ

শরয়ী অনুমোদন ছাড়া হয়

ব্যক্তিগত ফতোয়ায় হয়

রাজনৈতিক দালালি মিশ্রিত

কাফেরের নয়, মুছলমানের বিরুদ্ধে হয়

তাজকিয়া ও ইখলাছ ছাড়া হয়

সেসবজিহাদনয় - বরংফাছাদ ফিল আরদ্ব মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا۟ فِى ٱلْأَرْضِ قَالُوٓا۟ إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ أَلَآ إِنَّهُمْ هُمُ ٱلْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ) আর যখন তাদের বলা হয়, ‘তোমরা জমিনে (ফিত্না)-ফাছাদ সৃষ্টি করো না,’ তখন তারা বলে, ‘আমরাই তো (বরং) ইছলাহকারি’ (অতএব) সাবধান (থেকো এদের ব্যাপারে)! মূলত তারাই হচ্ছে আসল ফাছাদকারী, কিন্তু তারা তা অনুধাবন করতে পারে না (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১১-১২)

সারসংক্ষেপ (একনজরে):

জিহাদের ধরন

কখন ফরয হয়

হুকুম

নফস

সর্বদা

ফরযে আইন

লিছান

হক প্রচার যখন প্রয়োজন

ফরয/মুস্তাহাব

মাল

উম্মাহর আর্থিক সংকটে

ফরযে আইন/কিফায়া

ক্বলম

বাতিল মতবাদ ছড়ালে

ফরযে কিফায়া

সশস্ত্র

শত্রুর হামলা হলে

ফরযে আইন

রাষ্ট্রীয় অভিযান

সীমান্তে, দাওয়াহ প্রচারে

ফরযে কিফায়া

খারেজি মডেল

আত্মশুদ্ধিহীন, গোমরাহি

হারাম

কাদের বিরুদ্ধে হাক্বিকি জিহাদ করা হয়? – ক্বুরআন ও ছুন্নাহ শরীফ উনার নির্দেশিত টার্গেট

ভূমিকাঃজিহাদশব্দটি পবিত্র হলেও, তার অপপ্রয়োগ ভয়ংকর ফিতনায় রূপ নিতে পারে - যদি এটি ভুল মানুষের বিরুদ্ধে, ভুল পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় বর্তমান যুগে খারেজি ছালাফি গোষ্ঠীজিহাদনাম দিয়ে মুছলমানদের, অলি-আউলিয়াদের মাজারে হামলা করে; অথচ প্রকৃত কুফরি শক্তি, যালিম শাসক ও ইহুদি-নাছারাদের বিরুদ্ধে তারা নিরব থাকে ক্বুরআন শরীফ ও ছ্বহীহ হাদীছ শরীফ অনুসারে জিহাদের প্রকৃত টার্গেট নির্ধারণ করতে হবে, নয়তো হক্ব জিহাদও ফিতনায় রূপ নেবে

কারা জিহাদের টার্গেট নয়?

কারা

কেন নয়

আহলে কিবলা মুছলমান

কারণ তারালা ইলাহা ইল্লাল্লাহবলে

নিরস্ত্র কাফের

ইছলাম শান্তিপূর্ণ দাওয়াত আগে দেয়

নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অক্ষম

রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিষেধ করেছেন

মওতা বা লাশ

সাধারণ মৃত কাফেরের মর্যাদা নষ্ট করা হারাম

মুনাফিক, কিন্তু প্রকাশ্যে ঈমানদার

কারণ তারা ফাছিক হলেও মুছলমান

(عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ، حَتَّى يَقُولُوا: لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَإِذَا قَالُوهَا، عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ، إِلَّا بِحَقِّهَا، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ») আবূ হুরায়রা রদ্বিল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃআমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন আমি মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি, যতক্ষণ না তারালা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই) বলে যখন তারা এটি বলবে, তখন তারা আমার পক্ষ থেকে নিজেদের রক্ত ও সম্পদকে নিরাপদ করবে, তবে শরীয়তের হক্ব অনুযায়ী ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের হিসাব মহান আল্লাহ তাআলার উপর (বুখারী শরীফ ১৪০০, ২৯৪৬, ৬৯২৪, ৭২৮৫; মুছলিম শরীফ ২০, ২১:১-৩; তিরমিযী শরীফ ২৬০৬-৭, নাছায়ী শরীফ ২৪৪৩, ৩০৯০-৯৩, ৩০৯৫, ৩৯৭০-৭৮; আবূ দাঊদ শরীফ ২৬৪০, আহমাদ শরীফ ৬৮, ১১৮, ৩৩৭, ২৭৩৮০, ৮৩৩৯, ৮৬৮৭, ৯১৯০, ২৭২১৪, ৯৮০২, ২৭২৮৪, ১০১৪০, ১০৪৪১, ১০৪৫৯, ছ্বহীহাহ শরীফ ৪০৭, ছ্বহীহ আবু দাউদ শরীফ ১৩৯১-১৩৯৩, ২৩৭৩)

কার বিরুদ্ধে হাক্বিকি জিহাদ করা হয়?

১) আল কাফিরুল মুয়ানিদ (الكَافِرُ المُعَانِدُ): যারা প্রকাশ্যে কুফরী করে, ইছলাম ধ্বংসের চেষ্টা করে এবং মুছলিমদের জান-মালের ক্ষতি করে তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ ফরজ

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (قَاتِلُوا الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ وَ لَا بِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَ لَا یُحَرِّمُوۡنَ مَا حَرَّمَ اللّٰهُ وَ رَسُوۡلُهٗ وَ لَا یَدِیۡنُوۡنَ دِیۡنَ الۡحَقِّ مِنَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡكِتٰبَ حَتّٰی یُعۡطُوا الۡجِزۡیَۃَ عَنۡ ‌یَّدٍ وَّ هُمۡ صٰغِرُوۡنَ) যাদের ইতোপূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা মহান আল্লাহ তায়ালা ও আখিরাতের উপর ঈমান আনে না, মহান আল্লাহ তায়ালা ও রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম যা কিছু হারাম করেছেন তাকে হারাম (বলে স্বীকার) করে না, (সর্বোপরি) যারা সত্য দ্বীনকে (নিজেদের) জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই চালিয়ে যাও, যে পর্যন্ত না তারা পদানত হয়ে রক্ষার (আনুগত্যের কর হিসেবে) জিজিয়া দিতে শুরু করে। (ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:২৯)

এই আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে, আহলে কিতাবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুকুম এসেছে, যখন তারা ইছলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়

২) দখলদার যালিম কাফের রাষ্ট্র (الدَّوْلَةُ الْكَافِرَةُ الظَّالِمَةُ الْمُحْتَلَّةُ): যারা মুছলিমদের ভূমি দখল করে, মুছলমানদের হত্যা করে, মসজিদ ধ্বংস করে, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ফরযে আইন যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَ مَا لَكُمۡ لَا تُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ الۡمُسۡتَضۡعَفِیۡنَ مِنَ الرِّجَالِ وَ النِّسَآءِ وَ الۡوِلۡدَانِ الَّذِیۡنَ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَاۤ اَخۡرِجۡنَا مِنۡ هٰذِهِ الۡقَرۡیَۃِ الظَّالِمِ اَهۡلُهَا ۚ وَ اجۡعَلۡ لَّنَا مِنۡ لَّدُنۡكَ وَلِیًّا ۚۙ وَّ اجۡعَلۡ لَّنَا مِنۡ لَّدُنۡكَ نَصِیۡرًا) তোমাদের কী হয়েছে, তোমরা কেন যুদ্ধ করো না মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথে এবং সেইসব অসহায় পুরুষ, নারী ও (দুস্থ) শিশুদের মুক্তির জন্য, “যারা (এই বলে) ফরিয়াদ করেঃ হে আমাদের রব! যালিমদের এই জনপদ থেকে আমাদেরকে বের করে আনুন, এবং আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক ও সাহায্যকারী প্রেরণ করুন (ছুরাহ আন-নিছা ৪:৭৫)

এখানে দাওয়াতি কাজ কর্মের কোন আলাপ হচ্ছেনা, প্রতিরোধমূলক ক্বিতালের নির্দেশ করা হয়েছে

৩) যালিম মুছলিম শাসক, যদি প্রকাশ্য কুফরি করেঃ সাধারণ যুলুম, ঘুষ, ফিস্ক, ইত্যাদির কারণে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা নিষিদ্ধ তবে যদি তারা স্পষ্ট কুফর করে, যেমন ক্বুরআন শরীফ অস্বীকার, রছূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার অবমাননা, শরীয়ত বিরোধী আইন চাপিয়ে দেয়, তাহলে শরঈ শর্তে বিদ্রোহ অনুমোদিত হয় রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (إِلَّا أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا عِندَكُمْ مِنَ اللَّهِ فِيهِ بُرْهَانٌ) যতক্ষণ না তোমরা স্পষ্ট কুফরি দেখো, যার উপর মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে প্রমাণ রয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করো না” (বুখারী শরীফ ৭০৫৬)

৪ ইহুদি-নাছারার দালাল, মুনাফিক শক্তিঃ যারা মুছলমান সেজে ইছলামের ভিতর ফেতনা সৃষ্টি করে, কাফেরদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে, তারাআসল শত্রু মহান আল্লাহ পাক বলেনঃ (هُمُ ٱلْعَدُوُّ فَٱحْذَرْهُمْ ۚ قَٰتَلَهُمُ ٱللَّهُ ۖ أَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ) তারা-ই আসল শত্রু, তাদের থেকে সাবধান হও মহান আল্লাহ পাক তাদের ধ্বংস করুন (ছুরাহ আল-মুনাফিকূনঃ ৬৩:৪)

খারেজি, ছালাফি, আধুনিক উদারপন্থী, প্রগতিশীল ইজম - এরা আজকের মুনাফিক গোষ্ঠী, যারা ইছলামের ভিতর থেকেই কুফর প্রতিষ্ঠা করে

৫ বাতিল ফেরকা যারা ইছলামের নামে কুফরি চালায় যেমনঃ

আহলে ক্বুরআন,

বেনবাজি ছালাফি,

ইছলামের ভিত্তি অস্বীকারকারী শিয়া রাফেজি

এদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও প্রয়োজনে ক্বিতাল প্রকারের জিহাদ বৈধ, যদি রাষ্ট্রীয় অনুমোদন থাকে

সারসংক্ষেপঃ কাদের বিরুদ্ধে, কোন জিহাদ?

টার্গেটঃ স্পষ্ট কাফের

জিহাদের ধরনঃ ক্বিতাল/দাওয়াহ

শর্তঃ দাওয়াহ দিলে না মানলে ক্বিতাল

টার্গেটঃ দখলদার শত্রু

জিহাদের ধরনঃ প্রতিরক্ষামূলক ক্বিতাল

শর্তঃ ফরযে আইন

টার্গেটঃ যালিম মুছলিম শাসক

জিহাদের ধরনঃ ফতোয়া, হিজর, কখনো ক্বিতাল

শর্তঃ কুফর স্পষ্ট হলে

টার্গেটঃ মুনাফিক দালাল

জিহাদের ধরনঃ বুদ্ধিবৃত্তিক ও মিডিয়া যুদ্ধ

শর্তঃ দলিল, যুক্তি, ক্বলম

টার্গেটঃ বাতিল ফেরকা

জিহাদের ধরনঃ ক্বলম ও উম্মাহকে হেফাজতের যুদ্ধ

শর্তঃ রাষ্ট্রীয় অনুমোদন জরুরি

জিহাদ পরিচালনার অধিকার কাদের?

ব্যক্তির?

গোষ্ঠীর?

রাষ্ট্রের?

আহলুল হাল ওয়াল য়াক্বদ এর?

জিহাদ পরিচালনার অধিকার কাদের?” – শরয়ী অনুমোদনের ব্যাখ্যা

ভূমিকাঃ জিহাদ যেমন একটি ঈবাদাত, তেমনি এটি একটি শরয়ী রাষ্ট্রীয় ও সামষ্টিক দায়িত্ব কেউ যদি নিজের খেয়ালে, ব্যক্তিগত উগ্রতা বা আবেগ থেকে জিহাদ পরিচালনা করতে চায় - তবে তা জিহাদ নয় বরং ফাছাদ তাই ক্বুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ অনুযায়ী নির্ধারিত করতে হবে - কে জিহাদ পরিচালনার অধিকার রাখে

ভুল ধারণাঃ যে কেউ জিহাদ শুরু করতে পারে

আজকের যুগে যেভাবেআইএস, আল-কায়েদা, খারেজি ছালাফি দলগুলো” - নিজেরা নেতা বানিয়ে নেয়, নিজেদের গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে জিহাদ ঘোষণা করে - এটা শরয়ী বিদ্রোহ, যা রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিষিদ্ধ করেছেন

ক্বুরআন শরীফে নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার গুরুত্বঃ (يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَأُو۟لِى ٱلْأَمْرِ مِنكُمْ) হে মুমিনগণ! তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার আনুগত্য করো, আনুগত্য করো রছূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলুল আমর তাদেরও আনুগত্য করো (ছুরাহ আন-নিছাঃ ৪:৫৯)

এই আয়াত শরীফের তাফছীরে ইমাম কুরতুবী রহমতুল্লাহ বলেনঃযে শাসক শরিয়তের পরিপন্থী নয়, তার নেতৃত্ব মানা ফরয - জিহাদ হোক বা শান্তি

হাদীছ শরীফে স্পষ্ট বর্ণনাঃ (إِنَّمَا الْإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ)ইমাম (খলীফা/রাষ্ট্রনেতা) হলেন ঢাল, যার পেছনে থেকে যুদ্ধ করা হয়, আর যার মাধ্যমে শত্রুদের থেকে রক্ষা পাওয়া যায়” (বুখারী শরীফ ২৯৫৭, মুছলিম শরীফ ১৮৪১)

অর্থাৎ: জিহাদের নেতৃত্ব একজন ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া কারও হাতে বৈধ নয়

আহলুল হাল ওয়াল য়াক্বদ (أهل الحل والعقد): উলামা, ফকীহ, অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ যারা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে শরীয়তের প্রতিনিধি - তাদের সমর্থন ছাড়া কেউইজতিহাদ করে জিহাদ ঘোষণাকরতে পারে না ইমাম নববী রহমতুল্লাহ বলেন (শরহে মুছলিম):জিহাদ ঘোষণার অধিকার কেবলমাত্র সেই নেতৃত্বের, যার মাধ্যমে উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ থাকে

কারা জিহাদ পরিচালনার অধিকার রাখে?

ইছলামী রাষ্ট্রের ইমামঃ খলীফা > ছ্বহীহ বুখারী ২৯৫৭

আহলুল হাল ওয়াল য়াক্বদ (উলামা পরিষদ) > সূরা নিছা: ৫৯

যুদ্ধক্ষেত্রে নিযুক্ত কমান্ডার > ইমামের আদেশক্রমে

আত্মরক্ষার প্রয়োজনে ব্যক্তি > শত্রু আক্রমণ হলে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ

কারা অধিকার রাখে নাঃ

ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যারা নিজে নিজেআমীরহয় > কারণ শরিয়ত বহির্ভূত

উগ্রবাদী ছালাফি-খারেজি দল > কারণ আক্বিদা বিকৃত, নেতৃত্ব বৈধ নয়

বিদেশি এজেন্টঃ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত গোষ্ঠী > ইছলামী নয়, ফিতনা

বর্তমান যুগে করণীয়ঃ যেহেতু এখন খিলাফাহ নেই, এবং অধিকাংশ মুছলিম রাষ্ট্র পশ্চিমাদের এজেন্ট, তাইঃ

জিহাদ বলতে এখন নফছ, ঈলম, ক্বলম ও দাওয়াহর জিহাদই সর্বাধিক জরুরি

রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে দখলদার শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বৈধ

ব্যক্তিগতভাবে জিহাদ ঘোষণার অধিকার কারো নেই

উপসংহারঃ জিহাদ পরিচালনার অধিকার ব্যক্তির নয়, বরং শরয়ী নেতৃত্ব ও স্বীকৃত উলামা/ইছলামিক রাষ্ট্রেরনেতৃত্বহীনজিহাদআসলে জিহাদ নয়, বরং তাইহুদি-নাছারার পরিকল্পিত ফিতনা