Saturday, August 15, 2026

ঈদে মীলাদুন নবী ﷺ পালন ব্যতীত হাক্বীক্বী শাকির হওয়া অসম্ভবঃ প্রথম অধ্যায়

ঈদে মীলাদুন নবী ﷺ পালন ব্যতীত হাক্বীক্বী শাকির হওয়া অসম্ভবঃ প্রথম অধ্যায়

ঈদে মীলাদুন নবীঃ হাক্বিকত, পরিভাষা, বিদয়াত এবং শরঈ ফয়ছালার উছূল

আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রযীম। বিছমিল্লাহির রহমানির রহীম। নাহমাদুহূ ওয়া নুছ্বল্লী ওয়া নাছাল্লিমু য়ালা রছুলিহিল কারীম, ওয়া য়ালা আলিহী ওয়া আছ্বহাবিহী আযমাঈন।

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পবিত্র জাত মুবারকের জন্য। অসংখ্য দুরুদ, ছ্বলাত ও ছালাম নবীয়ে আকরাম, শাফীয়ে উমাম, নবীয়ে মুহতারাম, ছাইয়্যিদুল মুরছালীন, ইমামুল মুরছালীন, খতামান নাবীইয়্যিন, নূরে মুজাছছাম, হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার পবিত্র ক্বদম মুবারকে নিবেদিত হোক।

এখন কথা হলোঃ “ঈদে মীলাদুন নবী” বলতে আসলে কী বোঝায়? এই একটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর না জেনে কেউ যদি সরাসরি বলে “বিদয়াত”, “হারাম”, “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম করেননি”, “ছ্বহাবায়ে কেরাম করেননি”, তাহলে সে প্রথমেই একটি উছূলী ভুল করে বসে। কারণ কোনো বিষয়ের হালাল হারাম, ছুন্নাহ, বিদয়াত, মুস্তাহাব নাজায়িযের ফয়ছালা দেওয়ার পূর্বে সেই বিষয়ের প্রকৃত হাক্বিক্বত নির্ধারণ করা ফরজে ঈলমীর অন্তর্ভুক্ত। যে জিনিসের সংজ্ঞাই বদলে দেওয়া হলো, তার বিরুদ্ধে যত দলীলই পেশ করা হোক, সেই দলীল আসল বিষয়ের বিরুদ্ধে নয়, একটি কল্পিত বিষয়ের বিরুদ্ধে যাবে।

ঈদে মীলাদুন নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিয়ে বিরোধের বড় অংশ এখানেই। কেউ মনে করে ঈদে মীলাদুন নবী মানেই ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আদ্বহার সমান্তরালে তৃতীয় একটি নতুন ফিক্বহী ঈদ। কেউ মনে করে মীলাদ মানেই মাইক, ব্যানার, জুলুছ, আলো, খাবার বা একটি নির্দিষ্ট সামাজিক অনুষ্ঠান। কেউ আবার এমনভাবে প্রশ্ন করে যেন আমরা দাবি করছি, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম প্রতি রবীউল আউয়াল শরীফে নতুন করে জন্মগ্রহণ করেন। এই সব সংজ্ঞাই ভুল। তাই প্রথম অধ্যায়ে আমি কোনো আবেগী স্লোগান নয়, প্রথমে শব্দ, তারপর পরিভাষা, তারপর উছূল, তারপর “করেননি” যুক্তির সীমা, তারপর বিদয়াতের মাপকাঠি এবং শেষে আজকের সাংগঠনিক ছুরতের শরঈ অবস্থান নির্ধারণ করব।

“ঈদ” শব্দের হাক্বিক্বত

“ঈদ” আ’রবি عِيدٌ। ইমাম ইবনে মানযূর রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (وَالْعِيدُ كُلُّ يَوْمٍ فِيهِ جَمْعٌ، وَاشْتِقَاقُهُ مِنْ عَادَ يَعُودُ كَأَنَّهُمْ عَادُوا إِلَيْهِ)

অর্থঃ “ঈদ এমন প্রত্যেক দিন, যেদিন মানুষের সমাবেশ ঘটে। এর উৎপত্তি ‘আদা, ইয়াউদু’ থেকে, যেন মানুষ পুনরায় সেই দিনের দিকে ফিরে আসে।” (ইবনে মানযূর, লিছানুল য়া’রব, (عَوْد) :مَادَّةُ)

ইমাম আযহারী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (وَالْعِيدُ عِنْدَ الْعَرَبِ الْوَقْتُ الَّذِي يَعُودُ فِيهِ الْفَرَحُ وَالْحُزْنُ)

অর্থঃ “আ’রবদের নিকট ঈদ হলো সেই সময়, যে সময়ে আনন্দ অথবা দুঃখের স্মৃতি পুনরায় ফিরে আসে।” (আযহারী, তাহযীবুল লুগ্বাহ, (عَوْد) :مَادَّةُ; ইবনে মানযূর, লিছানুল য়া’রব, (عَوْد) :مَادَّةُ)

ইবনুল আ’রাবী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (سُمِّيَ الْعِيدُ عِيدًا لِأَنَّهُ يَعُودُ كُلَّ سَنَةٍ بِفَرَحٍ مُجَدَّدٍ)

অর্থঃ “ঈদকে ঈদ বলা হয়েছে, কারণ তা প্রতি বছর নবায়িত আনন্দ নিয়ে ফিরে আসে।” (ইবনে মানযূর, লিছানুল য়া’রব, (عَوْد) :مَادَّةُ)

ইমাম নববী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (قَالُوا وَسُمِّيَ عِيدًا لِعَوْدِهِ وَتَكَرُّرِهِ، وَقِيلَ لِعَوْدِ السُّرُورِ فِيهِ)

অর্থঃ “উলামায়ে কিরাম বলেছেন, একে ঈদ বলা হয়েছে তার ফিরে আসা ও পুনরাবৃত্তির কারণে, আবার বলা হয়েছে, এতে আনন্দ ফিরে আসে বলেই একে ঈদ বলা হয়।” (ইমাম নববী, আল মিনহাজ শরহু ছ্বহীহ মুছলিম, কিতাবু ছ্বলাতিল ঈদাইন)

অতএব “ঈদ” শব্দের ভেতর তিনটি বিষয় স্পষ্টঃ একটি স্মরণীয় সময়ের পুনরাগমন, মানুষের সেই উপলক্ষের দিকে পুনরায় প্রত্যাবর্তন এবং সেই উপলক্ষের সঙ্গে আনন্দ/কষ্টের স্মরণ বা সমাবেশের সম্পর্ক। ঘটনা একবার ঘটতে পারে, কিন্তু তার স্মৃতি ও তার নিয়ামতের জন্য আনন্দ প্রতি বছর নতুন হয়ে ফিরে আসতে পারে। “ঘটনা তো একবার ঘটেছে, আবার আনন্দ কেন?” এই প্রশ্ন যারা করে, তারা আ’রবি “ঈদ” শব্দের মূল অর্থই বুঝে না তাদের জাহেলিয়াতের কারনে।

ক্বুরআন শরীফেও “ঈদ” শব্দ শুধু ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার জন্য ব্যবহার হয়নি। হযরত ঈছা ইবনে মারইয়াম য়ালাইহিছ ছালাম দু’য়া করেছেনঃ (قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِّأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِّنكَ وَارْزُقْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ)

অর্থঃ হযরত ঈছা ইবনে মারইয়াম য়ালাইহিছ ছালাম বললেন, হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা! হে আমাদের রব! আপনি আমাদের জন্য আসমান থেকে একটি মায়িদাহ নাযিল করুন, যা আমাদের প্রথম ও শেষ সকলের জন্য ঈদ হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আর আমাদেরকে রিয্ক দান করুন, আপনিই-তো শ্রেষ্ঠ রিয্কদাতা। (ছুরাহ আল মায়িদাহ ৫:১১৪)

এই আয়াত শরীফেই-তো একটি মৌলিক বিভ্রান্তি শেষ করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ তা’য়ালা। “ঈদ” শব্দের ক্বুরআনিক ব্যবহার ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার ফিক্বহী কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ক্বুরআন অনুসারে আসমানী খাবার নামক নিয়ামতের আগমনই “ঈদ” হওয়ার বিষয় বানানো হয়েছে। সুতরাং কোনো খোদায়ী নিয়ামতের স্মরণীয় দিনকে আভিধানিক ও ক্বুরআনিক অর্থে “ঈদ” বলা ক্বুরআনি ভাষা, খোদায়ী নিয়ামত লাভের বিপরীতে ঈদের দিন ঘোষণা করা মানেই ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার পাশে নতুন তৃতীয় ঈদের নামাজ, নতুন তাকবীর, নতুন ওয়াযিব বা নতুন ফিক্বহী বিধান বানিয়ে ফেলা নয়। এই পার্থক্য না বুঝে শুধু “মুছলমানের ঈদ দুইটা” বলে শব্দগত আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া শুদ্ধ উছূল নয় বরং ঈলমী খিয়ানত ও নবী বিদ্বষী জাহিল হওয়া।

“মীলাদ” এবং “মাওলিদ” শব্দের হাক্বিক্বত

“মীলাদ” এবং “মাওলিদ” উভয় শব্দের মূলধাতু و ل د। এখান থেকেই وِلَادَةٌ, مَوْلِدٌ, مِيلَادٌ ইত্যাদি শব্দ এসেছেন। মূল-কেন্দ্রীয় অর্থ হলেন জন্ম, জন্মের সময় এবং জন্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিছবত।

ইমাম ইবনে মানযূর রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (وَمَوْلِدُ الرَّجُلِ وَقْتُ وِلَادِهِ، وَمَوْلِدُهُ الْمَوْضِعُ الَّذِي وُلِدَ فِيهِ، وَمِيلَادُ الرَّجُلِ اسْمُ الْوَقْتِ الَّذِي وُلِدَ فِيهِ)

অর্থঃ “কোনো ব্যক্তির মাওলিদ হলো তার জন্মের সময়, তার মাওলিদ সেই স্থানও যেখানে সে জন্মগ্রহণ করেছে, আর কোনো ব্যক্তির মীলাদ হলো সেই সময়ের নাম যে সময়ে সে জন্মগ্রহণ করেছে।” (ইবনে মানযূর, লিছানুল য়া’রব, (وَلَدٍ) :مَادَّةُ)

ইমাম ফাইয়ূমী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (الْمَوْلِدُ الْمَوْضِعُ وَالْوَقْتُ أَيْضًا، وَالْمِيلَادُ الْوَقْتُ لَا غَيْرُ)

অর্থঃ “মাওলিদ জন্মের স্থান এবং সময় উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়, আর মীলাদ বিশেষভাবে জন্মের সময়কে বোঝায়।” (ফাইয়ূমী, আল মিছবাহুল মুনীর, (وَلَدٍ) :مَادَّةُ)

অতএব “মীলাদ” কোনো বিকৃত বাংলা, ফারসি বা উর্দু শব্দ নয়। এটি বিশুদ্ধ আ’রবি শব্দ। “মীলাদুন নবী” বলতে আভিধানিকভাবে নবীজি উনার জন্ম, জন্মকাল বা জন্মদিবস বোঝানো সম্পূর্ণ শুদ্ধ। “শুভাগমন” শব্দটি “মীলাদ” এর অভিধানগত প্রতিশব্দ নয়, কিন্তু রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিলাদতের মর্যাদা প্রকাশকারী আদবী ব্যাখ্যা। অর্থাৎ মীলাদ শরীফ হলেন বিলাদতের ঘটনা ও সময়, আর শুভাগমন হলো সেই বিলাদত শরীফকে উনার নববী মর্যাদা ও বিশ্বজনীন ফলের আলোকে বর্ণনা করা।

আ’রবি কিতাবি ঐতিহ্যেও “মাওলিদ” শব্দ শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যবহৃত হয়েছে। ইমাম আবুল খাত্তাব ইবনে দিহইয়াহ রহমতুল্লাহি য়ালাইহি রচনা করেছেন (التَّنْوِيرُ فِي مَوْلِدِ السِّرَاجِ الْمُنِيرِ وَالْبَشِيرِ النَّذِيرِ) আত-তানউয়ীরু ফী মাওলিদিছ-ছিরাজিম মুনীরি ওয়াল-বাশীরিন নাজির। ইমাম জালালুদ্দীন ছুয়ূত্বী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি রচনা করেছেন (حُسْنُ الْمَقْصِدِ فِي عَمَلِ الْمَوْلِدِ) হুসনুল-মাক্বছ্বিদি ফী য়ামালিল-মাওলিদ। মুল্লা য়ালী ক্বারী হানাফী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি রচনা করেছেন (الْمَوْرِدُ الرَّوِيُّ فِي الْمَوْلِدِ النَّبَوِيِّ) আল-মাওরিদুর-রাওয়িয়্যু ফিল-মাওলিদিন-নাবাওউয়্যি। ইমাম ইবনে নাছিরুদ্দীন দিমাশক্বী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি রচনা করেছেন (جَامِعُ الْآثَارِ فِي السِّيَرِ وَمَوْلِدِ الْمُخْتَارِ) যামি‘য়উল-আছারি ফিছ-ছিয়ারি ওয়া মাওলিদিল-মুখতার)। কেবল কিতাবের নাম দিয়ে শরঈ হুকুম প্রমাণ হয় না, কিন্তু “মাওলিদ” শব্দ কোনো অশিক্ষিত লোকসমাজের বানানো শব্দ নয় এটা প্রমানের জন্যেই দিলাম, এইসব দেখার পর আর বিতর্কই থাকে না জাহিল না হলে।

এখানে আরেকটি পার্থক্য অবশ্যই স্থির রাখতে হবেঃ বিলাদত এবং বেয়ছত একই ঘটনা নয়। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম প্রথমে পবিত্র মক্কা শরীফে বিলাদত লাভ করেছেন, পরবর্তীতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে প্রকাশ্য নবুওয়্যাতীর দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন। অতএব “মীলাদ” কে “বেয়ছত” এর আভিধানিক অর্থ বানানো হবে না। কিন্তু যিনি পরবর্তীতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রছুল, হাদী, রহমত, মু’য়াল্লিম ও মুযাক্কী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, উনার দুনিয়াবি হায়াত মুবারকের সূচনা তো উনার বিলাদত শরীফ দিয়েই, সেটা অস্বীকার করে উনাকে স্বীকার করার দাবিই মুর্খতা।

তাহলে “ঈদে মীলাদুন নবী” বলতে আমি কী বুঝাচ্ছি?

আমি একেবারে পরিষ্কার ভাষায় বলছিঃ ঈদে মীলাদুন নবী বলতে ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার সমান্তরালে তৃতীয় নতুন কোন ফিক্বহী ঈদ বুঝাচ্ছি না। আমি নতুন কোনো ফরজ ছ্বলাত বানাচ্ছি না। নতুন কোনো ওয়াযিব রোযা বানাচ্ছি না। নতুন কোনো আক্বিদাহ-ও বানাচ্ছি না। আমি এটাও বলছি না যে রবীউল আউওয়াল শরীফে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আবার নতুন করে বিলাদত লাভ করেন।

ঈদে মীলাদুন নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের হাক্বিক্বত হলোঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদত ও দুনিয়াবি শুভাগমনের নিয়ামতকে পুনরাবর্তিতভাবে স্মরণ করা, উনার আগমনে আনন্দিত হওয়া, উনার তা’য়জ্বীম ও মুহব্বত নবায়ন করা, উনার জিকির করা এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার এই বিরাট নিয়ামতের শুকুর শরীয়তসম্মত য়া’মলের মাধ্যমে প্রকাশ করা।

এই সংজ্ঞা লক করে রাখুন। পরবর্তী আট পর্বের প্রতিটি দলীল এই হাক্বিক্বতের ওপর বসবে। কেউ যদি মীলাদের নামে অমুক জায়গায় অমুক হারাম কাজ হয় বলে, আমি বলব সেই হারাম কাজ হারামই। মীলাদ তার লাইসেন্স নয়। আবার কোনো ব্যক্তির ভুল য়া’মলকে কেন্দ্র করে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিলাদতের স্মরণ, দুরুদ, ছালাম, ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত, ছীরাত আলোচনা, ছ্বদক্বাহ, ইকরাম/তাবারুক ও শুকুরের মূল হাক্বিক্বতকে হারাম বলাও শরীয়তের উছূল বিরোধি। শরীয়ত প্রতিটি কাজকে তার নিজস্ব দলীলের আলোকে বিচার করেন।

হারাম বলার অধিকার কার?

এখানে একটি কথা খুব শক্তভাবে বুঝতে হবে। “আমি করিনি”, “আমার ভালো লাগে না”, “আমাদের এলাকায় ছিল না”, “আমার শাইখ করেন না” এসব কোনো কিছুর নাম শরঈ তাহরীম নয়। কোনো কাজকে “হারাম” ঘোষণা করা মানে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার শরীয়তের নামে একটি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। তাই হারাম বলতে হলে ক্বুরআন শরীফ, ছুন্নাহ মুবারক অথবা তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শরঈ মূলনীতির অধীনে দলীল লাগবে।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (قُلْ أَرَأَيْتُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ لَكُم مِّن رِّزْقٍ فَجَعَلْتُم مِّنْهُ حَرَامًا وَحَلَالًا قُلْ آللَّهُ أَذِنَ لَكُمْ أَمْ عَلَى اللَّهِ تَفْتَرُونَ)

অর্থঃ “(হে নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি বলুন, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের জন্য যে রিজিক নাযিল করেছেন, তোমরা তার মধ্য থেকে নিজেরাই কিছু হারাম এবং কিছু হালাল বানিয়ে নিয়েছ? (ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি বলুন, মহান আল্লাহ তা’য়ালা কি তোমাদেরকে এর অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রতি মিথ্যা আরোপ করছ?” (ছুরাহ ইউনুছ য়ালাইহিছ ছালাম ১০:৫৯)

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেনঃ (وَلَا تَقُولُواْ لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ ٱلْكَذِبَ هَـٰذَا حَلَـٰلٌ وَهَـٰذَا حَرَامٌ لِّتَفْتَرُواْ عَلَى ٱللَّهِ ٱلْكَذِبَ‌ۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ)

অর্থঃ “আর তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার উপর মিথ্যা রটানোর জন্য তোমাদের জিহবা দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং ওটা হারাম, নিশ্চয় যারা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফলকাম হবে না।” (ছুরাহ আন নাহল ১৬:১১৬)

সুতরাং মূলনীতি দ্বিমুখী। স্বতন্ত্র ঈবাদত বানাতে দলীল লাগে, আবার কোনো বৈধ বিষয়কে হারাম বলতেও দলীল লাগে। এখানেই ঈবাদত এবং ওয়াছ্বিলার পার্থক্য বুঝতে হবে। আমি নিজের পক্ষ থেকে নতুন একটি নির্দিষ্ট ঈবাদত বানালাম, এর এত রক’আত, এতবার, এত ছাওয়াব, মহান আল্লাহ তা’য়ালা এটাকে আবশ্যিক করেছেন, এই দাবি দলীল ছাড়া চলবে না। পক্ষান্তরে মাইক, ছাপাখানা, সভাস্থল, সময়সূচি, অনলাইন দাওয়াত, গাড়ি, আলোকব্যবস্থা, বইয়ের অধ্যায় নম্বর, হাদিছ শরীফ নম্বর, মাদরাসার শ্রেণিকক্ষ ইত্যাদি স্বতন্ত্র ঈবাদত নয়, এগুলো ওয়াছ্বিলাহ ও তানযীম। এগুলোর নিজস্ব নিষেধ না থাকলে শুধু “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যুগে এই ছুরত ছিল না” বলে হারাম বানানো যাবে না।

বিদয়াতের মূল হাদিছ শরীফ আসলে কী বলছেন?

উম্মুল মুওমিনীন হযরত আয়িশাহ ছ্বিদ্দীক্বাহ রদ্বিআল্লাহু য়ানহা থেকে বর্ণিত, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ মুবারক করেছেনঃ (مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ)

অর্থঃ “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুনভাবে প্রবেশ করাবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।” (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ২৬৯৭; ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ ১৭১৮)

অন্য বর্ণনায়ঃ (مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ)

অর্থঃ “যে এমন কোনো কাজ করবে, যার ওপর আমাদের দ্বীনের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।” (ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ ১৭১৮)

এই দুই হাদিছ শরীফের নির্ণায়ক অংশ হলোঃ “مَا لَيْسَ مِنْهُ” এবং “لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا”। অর্থাৎ যা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, যার ওপর দ্বীনের কোনো ভিত্তি নেই। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেননি, “আমার পরে যে সাংগঠনিক ছুরত তৈরি হবে সব প্রত্যাখ্যাত।” বলেননি, “আমি নিজে যে ওয়াছ্বিলাটি ব্যবহার করিনি তা সব হারাম।” তিনি বলেছেন, দ্বীনের মধ্যে এমন জিনিস ঢুকানো যা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, সেটি প্রত্যাখ্যাত।

তাই এখানে প্রশ্ন হবে, মীলাদের মজলিছে যে কাজগুলো করা হয় সেগুলোর আছল শরীয়তে আছে কি না? ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত শরীয়তে আছে কি না? হামদ আছে কি না? দুরুদ ও ছালাম আছে কি না? রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছীরাত বর্ণনা আছে কি না? ছ্বদক্বাহ আছে কি না? মানুষকে খাবার খাওয়ানো আছে কি না? মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নিয়ামতের শুকুর আছে কি না? যদি প্রতিটি আছল নিজ নিজ দলীলে প্রমাণিত হয়, তাহলে সেগুলোকে একটি প্রমাণিত নিয়ামতের স্মরণে একত্র করার সাংগঠনিক ছুরতকে “মা লাইছা মিনহু” বলার আগে দলীল দিতে হবে।

“যে ইছলামে উত্তম পন্থা জারি করবে”

হযরত জারীর ইবনে য়াব্দুল্লাহ রদ্বিআল্লাহু য়ানহু থেকে বর্ণিত, একদল দরিদ্র মানুষ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার কাছে এলে উনি ছ্বদক্বাহর প্রতি উৎসাহ দিলেন। একজন আনছারী ছ্বহাবী রদ্বিআল্লাহু য়ানহু প্রথমে একটি ভারী থলি নিয়ে এলেন, এরপর মানুষ একের পর এক দান করতে শুরু করল। তখন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ মুবারক করলেনঃ (مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ)

অর্থঃ “যে ব্যক্তি ইছলামে কোনো উত্তম পন্থা জারি করবে, সে তার প্রতিদান পাবে এবং তার পরে যারা তাতে য়া’মল করবে তাদের প্রতিদানও পাবে, তাদের প্রতিদান থেকে কিছুই কমানো হবে না।” (ছ্বহীহ মুছলিম ১০১৭)

এখানে ছ্বদক্বাহ নতুন ঈবাদত ছিল না। নতুন ছিল একজন ছ্বহাবীর অগ্রণী উদ্যোগ এবং তার ফলে অন্যদের সেই প্রমাণিত নেক য়া’মলে সক্রিয় হয়ে ওঠা। অতএব কোনো শরীয়তপ্রমাণিত য়া’মলকে নতুন উপায়ে জাগ্রত, সংগঠিত বা বিস্তৃত করা এবং শরীয়তের বাইরে নতুন ঈবাদত বানানো এক জিনিস নয়।

হযরত উমর ফারূক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার “নি’য়মাতিল বিদ’য়াতু হাজিহী”

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রমাদ্বান শরীফে ক্বিয়াম করেছেন এবং কয়েক রাত জামায়াতেও আদায় করেছেন। পরে উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নিয়মিত বের হননি। হযরত উমর ফারূক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার যামানায় মানুষকে এক ক্বারীর পেছনে সুবিন্যস্তভাবে একত্র করা হলে তিনি বললেনঃ (نِعْمَ الْبِدْعَةُ هَذِهِ)

অর্থঃ “এটি কতই না উত্তম নতুন ব্যবস্থা।” (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ২০১০)

এখানে ক্বিয়াম নতুন ছিল না, ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত নতুন ছিল না, জামায়াতের আছলও নতুন ছিল না। নতুন ছিল স্থায়ীভাবে এক ইমামের পেছনে সুবিন্যস্ত সাংগঠনিক ছুরত। অতএব “নতুন” শব্দ দেখলেই “শরঈ বিদয়াতে দ্বলালাহ” হবে, এই সমীকরণ ছ্বহাবী য়া’মলেই টেকে না। নতুনত্বের বিচার করতে হবে তার আছল ও শরঈ সামঞ্জস্য দিয়ে।

হযরত বিলাল রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার নিজস্ব নিয়মিত নফল য়া’মল

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হযরত বিলাল রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার যান্নাতী পদধ্বনি শুনে এমন কোন য়া’মলের ওপর তিনি সবচেয়ে বেশি আশা রাখেন তা জিজ্ঞাসা করেন। হযরত বিলাল রদ্বিআল্লাহু য়ানহু জানান, যখনই পবিত্রতা অর্জন করতেন, সেই ওযুর পর যতটুকু সম্ভব নফল ছ্বলাত আদায় করতেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার এই নিয়মিত (বিদ’য়াতী) পন্থাকে বাতিল করেননি। (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ১১৪৯; ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ ২৪৫৮)

এই হাদিছ শরীফ দিয়ে কেউ ইচ্ছামতো নতুন নতুন ঈবাদত বানানোর লাইসেন্স পাবে না। কিন্তু এটুকু অবশ্যই প্রমাণিত হয়, শরীয়তস্বীকৃত নফল য়া’মলের মধ্যে একটি বৈধ নিয়মিত পন্থা গ্রহণ করলেই তা শুধু “এই একই বিন্যাস আগে আলাদাভাবে নির্দেশিত ছিল না” এই কারণে হারাম/নাযায়েজ হয়ে যায় না।

“রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনি করেননি” মানেই কি “হারাম”?

এখানে উছূলের একটি ভয়াবহ অপব্যবহার হয়। কোনো কাজ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম করেছেন, এটি অবশ্যই দলীল। কিন্তু উনি কোনো কাজ করেননি, সেখান থেকে সরাসরি “হারাম” বের করতে হলে আলাদা প্রমাণ লাগবে। কারণ “ত্যাগ” নিজে সবসময় “নিষেধ” নয়। উনি কোনো কাজ না করার কারণ হতে পারে, তখন প্রয়োজন হয়নি, কোনো আশঙ্কা ছিল, কোনো বিকল্প করেছেন, উম্মতের ওপর কষ্টের ভয় ছিল, কোনো সাংগঠনিক প্রয়োজন তখন তৈরি হয়নি, অথবা কাজটির আছল অন্য বৈধ য়া’মলের মধ্যে ছিল।

ইমাম আবূ য়াব্দুল্লাহ তিলিমছানী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উছূলের আলোচনায় “তারক” এর দালালত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মূলত এই পার্থক্যই স্থির করেছেন, রছুলে পাক রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ত্যাগ থেকে সর্বোচ্চ সেই কাজের আবশ্যিকতা না থাকা বোঝা যায়, নিছক ত্যাগ থেকেই তাহরীম প্রতিষ্ঠিত হয় না। (তিলিমছানী, মিফতাহুল উছূল ইলা বিনাইল ফুরূ’ য়ালাল উছূল, দালালাতুত তারক আলোচনা)

এখানে আল-ক্বুরআনের উছূলও স্মরণে রাখুনঃ কোনো জিনিসকে “হারাম” বলার জন্য মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার অনুমতি কোথায়, এই প্রশ্ন আল-ক্বুরআন নিজেই তুলেছেন। (ছুরাহ ইউনুছ য়ালাইহিছ ছালাম ১০:৫৯) অতএব “উনি করেননি, তাই হারাম” কোনো পূর্ণ শরঈ ক্বায়িদাহ নয়। সঠিক প্রশ্ন হলোঃ উনি কি নিষেধ করেছেন? কোনো সাধারণ নিষেধের অন্তর্ভুক্ত কি না? কাজটি কি শরীয়তের আছ্বলের বিরোধী? নাকি কাজটির আছ্বল প্রমাণিত, শুধু সাংগঠনিক ছুরত পরবর্তী?

এখানে একটি খুব শক্ত উদাহরণ ক্বুরআন শরীফ সংকলনের ইতিহাস। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যামানায় ক্বুরআন শরীফ লিখিত ও মুখস্থ উভয়ভাবে সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু উনার বিছাল শরীফের পরে ইয়ামামাহর ঘটনায় হাফিজ্বদের শাহাদতের প্রেক্ষাপটে হযরত উমর ফারূক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনাকে একত্রে ক্বুরআন শরীফ সংগ্রহের প্রস্তাব দিলে প্রথম প্রশ্নই উঠেছিলঃ “আপনি এমন কাজ কীভাবে করবেন যা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম করেননি?” হযরত উমর ফারূক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু বললেনঃ هُوَ وَاللَّهِ خَيْرٌ, “মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ক্বছম, এটি কল্যাণ।” পরে হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব রদ্বিআল্লাহু য়ানহু এবং হযরত যায়দ ইবনে ছাবিত রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনাদের ক্বলবও এই কাজে প্রশস্ত হলো এবং ক্বুরআন শরীফ একত্রে সংকলিত হলো। (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ৪৯৮৬)

এই দৃষ্টান্তের অপব্যবহার করা যাবে না। আল-ক্বুরআনের একটি আয়াত শরীফও নতুন বানানো হয়নি, কোনো শব্দ পরিবর্তন করা হয়নি। নতুন ছিল সংরক্ষণ ও তানযীমের একটি প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা। কিন্তু এই ঘটনাই দেখায়, “রছুলে পাক ছল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনি এই সাংগঠনিক ছুরতে করেননি” বাক্যটি একা কোনো কল্যাণকর ও শরীয়তসম্মত ব্যবস্থাকে হারাম বানায় না।

“আজকের মতো ঘটা করে কোথায়?” প্রশ্নের উত্তর

এখন আসি সেই বহুল ব্যবহৃত প্রশ্নে। বলা হয়ঃ “আজকের মতো ঘটা করে সম্মিলিতভাবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যামানায় ঈদে মীলাদুন নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম কোথায়?”

আমি বলিঃ প্রশ্নের “আজকের মতো” অংশটিই প্রমাণ করছে আপনি সাংগঠনিক ছুরত খুঁজছেন, আছ্বল নয়। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যামানায় আজকের মতো মাইক্রোফোন ছিল না, অফসেট ছাপা ক্বুরআন শরীফ ছিল না, অধ্যায় ও আন্তর্জাতিক নম্বরসহ ছ্বহীহ বুখারী, মুছলিম ছিল না, মাদরাছার আজকের ক্লাসরুম ব্যবস্থা ছিল না, ডিজিটাল ঘড়ি ছিল না, অনলাইন দাওয়াত ছিল না, গাড়িতে করে ওয়াজ মাহফিলে যাওয়া ছিল না, বিমানে করে আকাশে উড়ে হজ্জে যাওয়া ছিলো না। এসবের কোনোটিই কিন্তু স্বতন্ত্র ঈবাদত নয়, বরং ওয়াছ্বিলাহ। তাই কোনো শরীয়তসম্মত উদ্দেশ্য সাধনের ওয়াছ্বিলাহ যুগে যুগে বদলাতে পারে, যতক্ষণ তা নিজে হারাম না হয়।

তাছাড়া “প্রথম যুগে দ্বীন প্রতিষ্ঠাই প্রধান ছিল, ইমান, ফরজ য়া’মল, তাজকিয়া, হালাল হারাম, হিযরত, যুদ্ধ, নিপীড়ন ও রাষ্ট্রগঠন ছিল বড় বাস্তবতা”, আর এই কথার ঐতিহাসিক সত্যতাও আছে। মক্কী যুগে নির্যাতন, হিযরত, মদীনায় নতুন সমাজগঠন, ধারাবাহিক গাযওয়াহ, নতুন মুছলমানদের আক্বিদাহ ও য়া’মল শিক্ষা, আল-ক্বুরআনের অবতরণ, শরীয়তের বিধান প্রতিষ্ঠা, সব মিলিয়ে নববী যুগের সামাজিক অগ্রাধিকার আজকের স্থিতিশীল সমাজের অগ্রাধিকারের মতো ছিল না। কিন্তু এই ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাকে কচলিয়ে আমরা শরঈ দলীলের বিকল্প কোন কিছু বানাব না। আমাদের মূল যুক্তি আমরা এটা বলবনা যে, “তারা ব্যস্ত ছিলেন তাই আজকের মতো মীলাদ শরীফ পালন করেননি।” বরং আমাদের শক্ত যুক্তি হচ্ছেঃ কোনো পরবর্তী সাংগঠনিক ছুরতের হুবহু অনুপস্থিতি তার আছ্বলকে হারাম প্রমাণ করে না।

“বুখারী মুছলিম শরীফে পাইনি” মানেই কি “দ্বীনে নেই”?

ইদানীং আরেকটি অদ্ভুত যুক্তি উত্থাপন হতে দেখা যায়, কিছু মানুষ কোনো প্রশ্ন শুনলেই বলে, “বুখারী শরীফ, মুছলিম শরীফে তো এমন কিছু পাইনি।” ভাবখানা এমন যে, যেনো আল-ক্বুরআন ও বাকি হাদিছ শরীফের কিতাব, মুছান্নাফ, মুছনাদ, ছুনান, মুয়াত্তা, আছার, তাফছীর, ছীরাত এবং ফিক্বহের সমস্ত দলীল বাতিল, কেবল দুটো কিতাবের সূচিপত্রই পুরো দ্বীন।

ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ও ছ্বহীহ মুছলিম শরীফের মর্যাদা বিশাল। কিন্তু কোনো মুহাদ্দিছই দাবি করেননি, উনার কিতাবে উম্মতের কাছে সংরক্ষিত প্রতিটি ছ্বহীহ হাদিছ শরীফ ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি উনার জামি’ ছ্বহীহকে প্রায় ছয় লক্ষ হাদিছ শরীফের বৃহৎ সংরক্ষিত উপাদান থেকে নির্বাচন করেছেন এবং ষোলো বছরে সংকলন করেছেন। (ত্বাবাক্বাতুশ শাফিঈয়্যাহ, ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহ য়ালাইহি উনার জীবনী)

তাই কোনো একটি নির্বাচিত সংকলনের মোট হাদিছ শরীফ সংখ্যা দিয়ে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সমগ্র ছুন্নাহকে সীমাবদ্ধ করা যাবে না। বুখারী শরীফ একটি নির্বাচিত জামি’ ছ্বহীহ, মুছলিম শরীফও একটি নির্বাচিত ছ্বহীহ সংকলন। ইমামগণ নিজেরাই নির্বাচন করেছেন। তাই “এই নির্দিষ্ট কিতাবে নেই” তাই “শরীয়তে এর কোনো ভিত্তি নেই” বলা জাহেলিয়াত।

২৩ বছরে কি কয়েকটি হাদিছের কিতাবের মধ্যে থাকা কয়েক হাজার হাদিছই শুধু বলেছিলেন?

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার প্রকাশ্য নবুওয়াতী জীবনের ২৩ বছরকে দিন, ঘণ্টা ও মিনিটে হিসাব করলে ৮৩৯৫ দিন, ২০১৪৮০ ঘণ্টা এবং ১২০৮৮৮০০ মিনিট হয়। এই সংখ্যাকে “হাদিছ শরীফের সংখ্যা” বলা যাবে না, কারণ প্রতিটি মিনিট একটি স্বতন্ত্র হাদিছ শরীফ নয়। কিন্তু এই হিসাব একটি যৌক্তিক বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়ঃ ২৩ বছরের জীবন্ত নববী সমাজ, হাজারো কথা, কাজ, অনুমোদন, ছফর, যুদ্ধ, ঈবাদত, পারিবারিক জীবন, বিচার, শিক্ষা, মজলিছ, ব্যক্তিগত উপদেশ এবং দৈনন্দিন ঘটনার সমগ্রতা কোনো একটি মুদ্রিত কিতাবের মোট নম্বরের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।

হাদিছ শরীফের উছূলী পরিচয় কেবল “একটি বাক্য নম্বর” নয়। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ক্বওল, ফে’য়ল এবং তাক্বরীর, অর্থাৎ কথা, কাজ ও কোনো কাজের প্রতি অনুমোদন, ছুন্নাহর দলীলগত পরিসরের অংশ। অতএব “আমার মোবাইল অ্যাপে সার্চ করে পেলাম না” দিয়ে দ্বীনের ফয়ছালা হয় না। দলীল খুঁজতে হয় সমগ্র ক্বুরআন শরীফ, হাদিছ শরীফ, আছার, উছূল ও প্রাসঙ্গিক উৎসে।

আল-ক্বুরআনের দলীল থাকলে “একই কথা বুখারী শরীফে নাই কেন?”

এই ধরণের প্রশ্ন করাই ভুল। ক্বুরআন শরীফ নিজেই শরীয়তের মূল উৎস। কোনো হুকুম ক্বুরআন শরীফে স্পষ্ট থাকলে সেটি গ্রহণ করার জন্য “একই বাক্য বুখারী শরীফে কোথায়?” এমন শর্ত শরীয়ত দেন-নাই। অবশ্য আল-ক্বুরআনের ব্যাখ্যা, সীমা ও বাস্তব প্রয়োগ বুঝতে ছুন্নাহ অপরিহার্য। আল-ক্বুরআন ও ছুন্নাহ মুবারক পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। কিন্তু আল-ক্বুরআনের একটি প্রতিষ্ঠিত নির্দেশকে শুধু এই কারণে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ নাই যে, কেউ অনুরূপ কোন কিছুই হাদিছ শরীফ খুঁজে পাননি।

পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা দেখব, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বিরাট নিয়ামত ও রহমত কি না, উনার প্রাপ্তিতে আনন্দের ক্বুরআনিক নির্দেশ আছে কি না, নিয়ামতের কথা প্রকাশ ও শুকরের নির্দেশ আছে কি না, মহান নিয়ামতের দিন স্মরণ করার নীতি আছে কি না, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনি নিজের বিলাদতের দিনকে ঈবাদতের সঙ্গে যুক্ত করেছেন কি না, ছ্বহাবায়ে কিরাম উনাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার মিন্নত হিসেবে চিনে সম্মিলিত হামদ করেছেন কি না, এবং মীলাদের বর্তমান শরীয়তসম্মত য়া’মলগুলোর প্রতিটির নিজস্ব দলীল আছে কি না। যদি এগুলো একে একে প্রমাণিত হয়, তখন “আজকের মতো একটি অনুষ্ঠান বুখারী শরীফে কোথায়?” প্রশ্নটি প্রশ্নকর্তাকে জাহিল প্রমাণ করবে।

প্রথম যুগে বর্তমানের সাংগঠনিক ছুরত না থাকার বাস্তবতাঃ

ইছলামের প্রথম যুগ ছিল দ্বীন প্রতিষ্ঠা, ঈমান দৃঢ় করা, তাজকিয়া, ছ্বলাত, জাকাত, রোযা, হজ্জ, হালাল হারাম, সামাজিক ন্যায়, হিযরত, জিহাদ, রাষ্ট্র ও উম্মাহ গঠনের যুগ। নওমুছলিম সমাজকে শত শত জাহিলী রীতি থেকে বের করে আনা হচ্ছিল। জীবনযাত্রা ছিল কঠিন। মক্কায় নির্যাতন, শি’য়বের অবরোধ, হিযরত, মদীনার নতুন রাষ্ট্র, একের পর এক গাযওয়াহ, মুনাফিক্বদের ষড়যন্ত্র, বাইরের আক্রমণ, সবকিছু একসঙ্গে চলেছে। তাই পরবর্তী স্থিতিশীল মুছলিম সভ্যতায় যে ধরনের বৃহৎ আয়োজন, মাদরাসা, গ্রন্থাগার, স্মরণসভা, ধর্মীয় ক্যালেন্ডার, সম্মেলন ও সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, নববী যুগে সেগুলোর হুবহু রূপ খোঁজা ঐতিহাসিকভাবেই অযৌক্তিক।

কিন্তু আবারো বলছি, এটাকে আমরা মূল শরঈ দলীল বানাচ্ছি না। কারণ আমাদের রিছালা “হয়তো তারা করতেন কিন্তু লিখিত হয়নি” এই অনুমানের ওপর দাঁড়াবে না। আমরা বিদ্যমান ক্বুরআন শরীফ, ছ্বহীহ হাদিছ শরীফ, প্রাচীন তাফছীর, উছূল এবং ইতিহাসের ওপর দাঁড়াব। যে রেওয়ায়েত দুর্বল, তাকে দুর্বল বলেই ব্যবহার করব। যে ঐতিহাসিক, তাকে ইতিহাসের স্তরে রাখব। যে তাফছীরী ক্বওল, তাকে তাফছীরী ক্বওল বলব। কিন্তু “ছ্বহীহ নয়, তাই অস্তিত্বই নেই” অথবা “বুখারী শরীফে নেই, তাই বাতিল” এই অজ্ঞতার পথেও কাউকে হাটার সুযোগ দেবো না।

ওয়াছ্বিলাহ বদলালে ঈবাদতের হাক্বিক্বত বদলায় না

আজ আমরা ক্বুরআন শরীফ ছাপাখানায় ছাপি, মোবালে এপ্স বানাই। হাদিছ শরীফকে কিতাব, বাব, নম্বর দিয়ে ডিজিটাল ডাটাবেসে সাজাই। মসজিদে মাইক্রোফোন ব্যবহার করি। রমাদ্বান শরীফের সময়সূচি ছাপি। হজ্জে বিমান ব্যবহার করি। দূরের মানুষকে অনলাইনে দ্বীনের দাওয়াত দিই। এসবের কোনোটি নববী যুগের হুবহু প্রযুক্তিগত ছুরত নয়। কিন্তু এগুলোর উদ্দেশ্য ও আছ্বল বৈধ হলে ওয়াছ্বিলাহও বৈধ, যতক্ষণ কোনো স্বতন্ত্র হারাম উপাদান নেই।

একইভাবে ঈদে মীলাদুন নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার কোনো মজলিছে যদি ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত হয়, দুরুদ ও ছালাম হয়, ছীরাত বর্ণিত হয়, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হামদ হয়, ছ্বদক্বাহ হয়, মানুষকে খাবার দেওয়া হয়, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিলাদতের নিয়ামত স্মরণ করা হয়, তাহলে প্রতিটি কাজের নিজস্ব দলীল বিচার করতে হবে। মাইক, ইকো নতুন বলে ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত বিদয়াত হয় না, হামদ-নাতের মাহফিল হারাম হয়ে যায় না। নির্দিষ্ট দিনে মানুষ একত্র হয়েছে বলে দুরুদ শরীফ নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। তবে কোনো হারাম কাজ ঢুকলে সেই হারাম অংশ অবশ্যই বাদ দিতে হবে।

মীলাদের নামে হারাম হলে আমার অবস্থান কী?

এই রিছালা অন্ধ সমর্থনের রিছালা নয়। মীলাদের নামে যদি বেপর্দা হয়, অশ্লীলতা হয়, ফরজ ছ্বলাত নষ্ট হয়, অপচয় হয়, মানুষের হাক্ব নষ্ট হয়, মিথ্যা রেওয়ায়েতকে ছ্বহীহ বলে চালানো হয়, হারাম বাদ্য বা অন্য কোনো শরীয়তবিরোধী কাজ হয়, সেই নির্দিষ্ট কাজ যত নামেই করা হোক হারামই থাকবে। “মীলাদ” শব্দ কোনো হারামকে হালাল করেন না।

কিন্তু এখানেই ন্যায়বিচার চাই। কোনো বিয়েতে হারাম কাজ হলে “নিকাহ হারাম” বলা হয় না। কোনো ওয়াজ মাহফিলে মিথ্যা বলা হলে “ওয়াজ হারাম” বলা হয় না। কোনো মসজিদের কমিটি দুর্নীতি করলে “মসজিদ হারাম” বলা হয় না। তাহলে কোনো মীলাদী আয়োজনে কারও ভুল হলে পুরো নববী বিলাদতস্মরণ, দুরুদ শরীফ, ছীরাত, হামদ, ছ্বদক্বাহ ও শুকুরকে কেন হারাম বলা হবে? ভুল অংশকে ভুল বলো, হারাম অংশকে হারাম বলো, কিন্তু হালালকে হারাম বানিও না।

প্রথম অধ্যায়ের ফায়ছালা

এখন প্রথম পর্বের সমস্ত আলোচনা এক জায়গায় রাখুন। “ঈদ” বিশুদ্ধ আ’রবি শব্দ, যার মধ্যে পুনরাগমন, পুনরাবৃত্তি, সমাবেশ ও নবায়িত আনন্দের অর্থ রয়েছে। “মীলাদ” এবং “মাওলিদ” বিশুদ্ধ আ’রবি শব্দ, যার মূল অর্থ বিলাদত, বিলাদতের সময় ও স্থান। “ঈদে মীলাদুন নবী” বলতে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদত ও শুভাগমনের নিয়ামতকে পুনরাবর্তিতভাবে স্মরণ, উনার প্রতি তা’য়জ্বীম ও মহব্বত নবায়ন, উনার প্রাপ্তিতে আনন্দ এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার শুকুর শরীয়তসম্মত য়া’মলের মাধ্যমে প্রকাশ করা বোঝানো হচ্ছে।

এটি ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার সমান্তরালে নতুন তৃতীয় ফিক্বহী ঈদ সৃষ্টি নয়। এটি নতুন কোনো ফরজ, নতুন ওয়াযিব, নতুন আক্বিদাহ বা নতুন স্বতন্ত্র ঈবাদতও নয়। বিদয়াতের হাদিছ শরীফ যে জিনিসকে প্রত্যাখ্যান করেছে তা হলো “দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়” এমন বিষয়কে দ্বীনের অংশ বানানো। শরীয়তপ্রমাণিত নেক য়া’মলকে নতুন সাংগঠনিক পন্থায় জাগ্রত ও একত্র করার দৃষ্টান্ত ছ্বহীহ হাদিছ শরীফ এবং ছ্বহাবী য়া’মলে আছে। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নিছক ত্যাগ নিজে তাহরীম নয়। “আজকের মতো” প্রযুক্তিগত বা সাংগঠনিক ছুরত প্রথম যুগে না থাকাও তাহরীম নয়।

আর “বুখারী শরীফ, মুছলিম শরীফে পাইনি” দ্বীনের ফয়ছালার চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়। হাদিছ শরীফ সংরক্ষণ নববী যুগ থেকেই মৌখিক ও লিখিত উভয়ভাবে ছিল, পরে বৃহৎ কিতাবি সংকলন হয়েছে। প্রাচীন মুহাদ্দিছদের লক্ষ লক্ষ “হাদিছ” গণনা মানে লক্ষ লক্ষ সম্পূর্ণ ভিন্ন নববী বাক্য নয়, তাই ভুল শতাংশ দিয়ে যুক্তি সাজানো প্রয়োজন নেই। কিন্তু কোনো একটি নির্বাচিত সংকলনকে সমগ্র ছুন্নাহর সমার্থক ভাবাও ভুল। ক্বুরআন শরীফ নিজে মূল দলীল এবং ক্বুরআন শরীফ ও ছুন্নাহ মুবারক একসঙ্গে শরীয়তের হেদায়েতী ভিত্তি।

সুতরাং এখন আর প্রশ্ন “আজকের মতো মীলাদ বুখারী শরীফে কোন নম্বরে?” নয়। এখন সঠিক প্রশ্ন হবেঃ যাঁর মীলাদ আমরা স্মরণ করছি, তিনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কাছে কে? উনি কি সাধারণ কোনো নিয়ামত, নাকি মুওমিনদের প্রতি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বিরাট মিন্নত? উনি কি শুধু একটি জাতির শিক্ষক, নাকি বিশ্বজগতের রহমত? উনার মহব্বত কি ঐচ্ছিক আবেগ, নাকি ঈমানের পূর্ণতার শর্ত? উনার দুনিয়ায় তাশরীফ আনা যদি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বিরাট নিয়ামত হয়, তাহলে সেই নিয়ামতের বিপরীতে একজন হাক্বিক্বী শাকিরের অবস্থান কী হওয়া উচিত? এই ফয়ছালা দ্বিতীয় অধ্যায়ে।

Monday, July 27, 2026

ছুরাহ কাহাফের শেষ আয়াতেঃ নবী কি আমাদের মতো বাশার বলা হয়েছে?

ছুরাহ কাহাফের শেষ আয়াতেঃ নবী কি আমাদের মতো বাশার বলা হয়েছে?

ছুরাহ কাহাফের শেষ আয়াতেঃ নবী কি আমাদের মতো বাশার বলা হয়েছে?

এই প্রশ্নটি সাধারণ প্রশ্ন নয়এটি আক্বীদার প্রশ্ন, আদবের প্রশ্ন, ঈমানের প্রশ্ন“নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম কি আমাদের মতো বাশার?” এই বাক্যটি বাহ্যিকভাবে ছোট, কিন্তু এর ভিতরে দুইটি পথ আছেএক পথ আহলুছ ছুন্নাহ-এর, আরেক পথ গোস্তাখীরআহলুছ ছুন্নাহ বলেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বাশার, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ বাশার ননতিনি বাশারিয়াতের পোশাকে নূরে মুজাছছাম, ছাইয়্যিদুল বাশার, আফদ্বলুল খলক্ব, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সবচেয়ে প্রিয় হাবীব

এখন যদি কেউ বলে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বাশার নন, তাহলে সে ক্বুরআন শরীফের প্রকাশ্য ভাষার বিরুদ্ধে গেলোআবার যদি কেউ বলে, তিনি আমাদের মতোই সাধারণ বাশার, তাহলে সে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার শান, মান, মর্যাদা কমিয়ে দিলোসঠিক আক্বীদাহ হলো, তিনি বাশার, কিন্তু “আমাদের মতো” নন কেননা পবিত্র ক্বুরআন শরীফে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ) অর্থাৎ, (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি বলুন, আমি তো তোমাদের মতো একজন বাশার, তবে আমার ওপর ওহী নাজিল করা হয়।

ছুরাহ আল কাহফ - ১৮:১১০

এই আয়াত শরীফ দিয়ে যারা বলে, “দেখুন, নবী তো আমাদের মতোই মানুষ,” তারা আয়াত শরীফের অর্ধেক দেখে, বাকিটা গোপন করেআয়াত শরীফে বলা হয়েছেন, بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ, অর্থাৎ বাশারিয়াতের দিক থেকে আমি তোমাদের মতো; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলা হয়েছেন, يُوحَىٰ إِلَيَّ, কিন্তু আমার ওপর ওহী নাজিল করা হয়এখানেই পার্থক্যআমরা বাশার, কিন্তু আমাদের উপর ওহী আসে নাআমরা বাশার, কিন্তু আমরা ছাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরছালিন নইআমরা বাশার, কিন্তু আমাদের নাম আরশে য়াজ্বীমে লেখা নয়আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের উপর ক্বুরআন শরীফ নাযিল করা হয়নিআমরা বাশার, কিন্তু আমরা রহমাতাল্লিল য়ালামীন নই

আর আয়াত শরীফে এই কথা বলা হয়নি যে, “তোমরাও আমার মতো” বলা হয়েছে, “আমি তোমাদের মতো বাশার” এই দুই বাক্যের মধ্যে আসমান জমিনের পার্থক্য রয়েছে“আমি তোমাদের মতো বাশার” মানে, আমি খোদা নই, আমি মালাক নই, আমি তোমাদের কাছে বুঝার মতো, অনুসরণের মতো, জীবনযাপনের আদর্শ হিসেবে পাঠানো একজন রছুলকিন্তু “তোমরাও আমার মতো” এই কথা কোথাও বলা হয়নিসাধারণ মানুষকে নবীর মাক্বামের সমান করে দেওয়া এই আয়াতের উদ্দেশ্য নয়

বাশার কেন বলা হয়েছে তা বুঝতে হলে এই আয়াতের শানে নুযূল ও প্রেক্ষাপট বুঝতে হবেমহান আল্লাহ তায়ালা কেন উনার হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে দিয়ে বলালেন, “আমি তোমাদের মতো বাশার”? এই ঘোষণা কি উনার মাক্বাম কমানোর জন্য? (وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ) “অতঃপর আমিই (আমার ইবাদত ও মু’মিনদের মাধ্যমে) আপনার জিকরকে আরও বুলন্দ করেছি” কি মাক্বাম কমানোর জন্যেই নাযিল করেছিলেন? নাকি উনার নবুওয়তকে রক্ষা করার জন্য (بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ) বলা হয়েছে?

এই জায়গায় আয়াতের প্রেক্ষাপট বুঝা জরুরিকারণ কোনো আয়াত শরীফকে উনার শানে নুযূল, পরিবেশ, মুখাতিব বা যাদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে, তাদের আক্বীদা না বুঝে অর্থ ধরলে মানুষ ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়

তৎকালীন আরব, মক্কা, মুশরিক, ইহুদি, নাছারা, এদের আক্বীদাগত অবস্থা দেখুনমানুষ পাথরের মূর্তি বানিয়ে পূজা করতকাঠের মূর্তি বানিয়ে পূজা করতনিজের হাতে বানানো বস্তুকে ইলাহ মনে করত এমন নজির ও আছে যে, আটা ময়দা দিয়ে বানানো মুর্তি আবার ক্ষুদা লাগলে খেয়েও ফেলতো। লাত, মানাত, উযযা, এসব মূর্তিকেতো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার মেয়েও বলতো, উনার নৈকট্যের মাধ্যম হিসেবেও পূজা করত যেমন মহান আল্লাহ তায়ালাই বলেনঃ (أَفَرَأَيْتُمُ اللَّاتَ وَالْعُزَّىٰ ۝ وَمَنَاةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَىٰ ۝ أَلَكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنثَىٰ ۝ تِلْكَ إِذًا قِسْمَةٌ ضِيزَىٰ) তোমরা কি লাত ও উযযা এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে চিন্তা করেছ? তোমাদের জন্য পুত্র আর উনার জন্য কন্যা? তাহলে তো এটি অত্যন্ত অন্যায় বণ্টন (ছুরাহ আন-নাজম ১৯:২২) কেউ চাঁদ, সূর্য, তারকা, গাছ, পশু, জড়বস্তু পর্যন্ত পূজা করতঅর্থাৎ তাদের সমস্যা ছিল, তারা মাখলূককে খলিকের মাক্বামে তুলত

এমনকি আহলে কিতাবের মধ্যেই ইহুদিদের একটি দল তো হযরত উযাইর য়ালাইহিছ ছালাম উনার সম্পর্কে বলেছিল, তিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পুত্র, নাউযুবিল্লাহনাছারারা হযরত ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম উনার সম্পর্কে বলেছিল, তিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পুত্রক্বুরআন শরীফে মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের এই বাতিল দাবিকে উল্লেখ করে ইরশাদ করেনঃ (وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللهِ، وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللهِ، ذَٰلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ، يُضَاهِئُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ، قَاتَلَهُمُ اللهُ، أَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ) অর্থাৎ, ইহুদিরা বলল, উযাইর য়ালাইহিছ ছালাম মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পুত্র; আর নাছারারা বলল, ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পুত্রএটি তাদের মুখের কথা, (বরং) তারাতো তাদের মতই কথা বলছে যারা তাদের পূর্বে কাফির হয়েছেমহান আল্লাহ তায়ালা তাদের ধ্বংস করুন, (তাকিয়ে দেখো) কিভাবে এদের (আজ দ্বারে দ্বারে) ঠোকর খাওয়ানো হচ্ছে।

ছুরাহ আত তাওবাহ - ৯:৩০

এখন চিন্তা করুন, যেসব জাতি কোনো কোনো নবীর কিছু মুজিযা দেখে নবীকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পুত্র বলে ফেলেছে, তাদের সামনে যখন ছাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরছালিন, ইমামুল মুরছালি, নুরে মুজাছছাম, হাবিবুল্লাহ, হুজুর পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তাশরীফ আনলেন, যাঁর মুজিযা পূর্ববর্তী নবীগণের সকলের সম্মিলিত মুজিযার চেয়েও বেশী, যাঁর হাতে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হলেন, যাঁর ইশারায় গাছ এগিয়ে এলেন, পাথর ছালাম দিলেন, অল্প খাদ্যে বহু মানুষ তৃপ্ত হলেন, আঙুল মুবারক থেকে পানি প্রবাহিত হলেন, যাঁর উপর ক্বুরআন শরীফ নাযিল হলেন, যিনি মিরাজ শরীফে যাওয়ার শরফ হাছিল করলেন, তখন বাতিল আক্বীদার লোকদের জন্য ঘুলু করার আশঙ্কা আরও বেশি ছিল এইটা জাহিল গ্বইরে ছুন্নী খারেজীরা না বুঝলেও মহান আল্লাহ তায়ালা তো ভালো করে জানতেনই।

অতএব قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْআয়াত শরীফটি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মাক্বাম কমানোর জন্য আসেনি; বরং তাওহীদ রক্ষা করার জন্য এসেছেন। অর্থাৎ, (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম), আপনি তাদের বলে দিন, আমি ইলাহ নই, আমি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পুত্র নই, আমি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জাতের অংশ নই, আমি মাখলূক; আমি মানবজাতির মধ্যেই তাশরীফ এনেছি, যেন তোমরা আমাকে অনুসরণ করতে পারোকিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বলে দিন, “يُوحَىٰ إِلَيَّ”, আমার উপর ওহী নাযিল হয়তাই আমি সাধারণ বাশার নই, আমি ওহীপ্রাপ্ত রছুল

এখানে দুইটি বাতিল দরজা বন্ধ করা হয়েছেপ্রথম দরজা হলো, কেউ যেন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে ইলাহ না বানায়দ্বিতীয় দরজা হলো, কেউ যেন উনাকে নিজের মতো সাধারণ মানুষ মনে না করেপ্রথম দরজা বন্ধ হয়েছে بَشَرٌ مِّثْلُكُمْদিয়েদ্বিতীয় দরজা বন্ধ হয়েছে يُوحَىٰ إِلَيَّদিয়ে

তাই আয়াতের সঠিক অর্থ হলেনঃ আমি তোমাদের মতো বাশারিয়াতের পোশাকে তাশরীফ এনেছি, কিন্তু তোমাদের মতো সাধারণ মানুষ নই; আমার উপর ওহী নাযিল হয়, যা নূরের ভাণ্ডার অথচ তূর-এ-ছিনায় তাকিয়ে দেখো, নূরের এক ঝলকে ছ্বহাবি মৃত, নবী মুছা কালিমুল্লাহ অজ্ঞান, অথচ আমি দিব্যি ২৩ বছর তোমাদের মধ্যে আনলিমিটেড নূর সিনায় নিয়ে চলাফেরা করেছি হ্যাঁ আমি মাখলূক, কিন্তু আফদ্বলুল মাখলূকআমি বান্দা, কিন্তু য়াবদে খাছআমি মানুষ, কিন্তু ছাইয়্যিদুল বাশার আমি তোমাদের মতো রক্ত, গোশত, হাড় ওয়ালা মানুষ, তবে আমার অজুদ নূরানী, আমি ইলাহ নই, কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা উনার হাবীব ও রছুল

(এইখানে আমাদের আক্বিদাহ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনি সৃষ্ট নূরের অধিকারী, নূরের তৈরী নন, না উনার নূর মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জাত/ছিফাতের অন্তর্ভুক্ত, এগুলো ভিন্ন সাবজেক্ট যা আমরা শিগ্রই আপ করে দেব ব্লগে।)

মক্কার মুশরিকরা এমন কথাও বলত যে, রছুল আবার মানুষ কেন? ফেরেশতা কেন নন? কখনো বলত, তিনি খাবার কেন খান, বাজারে কেনো চলাফেরা করেন? পবিত্র ক্বুরআন শরীফে তাদের আপত্তিগুলো এইভাবে এসেছেনঃ (وَقَالُوا مَالِ هَٰذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ) অর্থাৎ, তারা বলল, এ কেমন রছুল যে, তিনি খাদ্য খান এবং বাজারে চলাফেরাও করেন?

ছুরাহ আল ফুরক্বান - ২৫:৭

মুশরিকদের ভুল ছিল, তারা ভাবত রছুল হলে মানুষ হওয়া যাবে নামহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেনরছুল মানুষই হবেন, কারণ মানুষকে হিদায়েত দিতে হলে মানুষের ভাষায়, মানুষের জীবনে, মানুষের সামনে, মানুষের অনুসরণযোগ্য আদর্শ হিসেবে আসতে হবেফেরেশতা হলে মানুষ বলত, আমরা তো ফেরেশতা নই, আমরা কীভাবে অনুসরণ করব? উনি তো ক্লান্ত হোন না, বৌ বাচ্চা, সংসারের ঝামেলা মূক্ত, নফছের আক্রমণ মূক্ত, শয়তানের আক্রমণ থেকে মুক্ত, আমরা কিভাবে উনার ছুন্নাহ পালন করবো যেখানে আমাদের মধ্যে দিন রাতের তফাৎ।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (قُلْ لَوْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةٌ يَمْشُونَ مُطْمَئِنِّينَ، لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِمْ مِّنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَّسُولًا) অর্থাৎ, পেয়ারে হাবিব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আপনি বলুন, যদি জমিনে ফেরেশতারা নিশ্চিন্তে চলাফেরা করত, তবে আমি অবশ্যই আসমান থেকে তাদের কাছে ফেরেশতাকেই রছুল হিসেবে নাযিল করতাম

ছুরাহ আল ইছরা - ১৭:৯৫

অতএব নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বাশারিয়াত উনার মর্যাদা কমানোর জন্য নয়, বরং উনাকে অনুসরণযোগ্য করার জন্যতিনি খেতেন, যেন উম্মত হালাল খাওয়ার আদব শিখেতিনি ঘুমাতেন, যেন উম্মত ঘুমের ছুন্নত শিখেতিনি বিবাহ করেছেন, যেন উম্মত পবিত্র পারিবারিক জীবন শিখেতিনি বাজারে গেছেন, যেন উম্মত লেনদেনের আদব শিখেতিনি কষ্ট পেয়েছেন, যেন উম্মত ছ্ববর শিখেতিনি ঈবাদত করেছেন, যেন উম্মত বন্দেগি শিখেতিনি বাশারিয়াতের পোশাকে এসেছেন, যেন উম্মত বলতে না পারে, “আমরা তো উনাকে অনুসরণ করতে পারব না

কিন্তু এই বাশারিয়াতকে ধরে কেউ যদি উনাকে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে নামিয়ে আনে, তাহলে সে ক্বুরআনের অন্য আয়াত শরীফগুলো ভুলে যায়মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে সাধারণ মানুষ বলেননি, বরং বলেছেনঃ (وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ) অর্থাৎ, আমি আপনাকে সকল য়ালমের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি

ছুরাহ আল আম্বিয়া - ২১:১০৭

আমরা কি সমগ্র য়ালামীন বা সমস্ত জগতের জন্য রহমত? না রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম সমস্ত কায়েনাতের জন্যে রহমততাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে হবেন?

আবার মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا) অর্থাৎ, বরকতময় তিনি, যিনি উনার বান্দার উপর ফুরক্বন নাযিল করেছেন, যাতে তিনি সমস্ত য়ালমের জন্য সতর্ককারী হোন

ছুরাহ আল ফুরক্বান - ২৫:১

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি পুরো য়ালামীন বা সমগ্র কায়েনাতের জন্য নাজীর? আমরা কি জিন, ইনছান, পূর্ব, পশ্চিম, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, সব জগতের জন্য মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে সতর্ককারী? নাএই মাক্বাম শুধু রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার, আম পাবলিক তো বহুত দূর ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৯২ জন পয়গম্বরও নিজেদের ৩১২ জন মুরছাল এর মতো বলার সুযোগ নাই, ৩১২ জন মুরছালিনেরও সুযোগ নাই নিজেদেরকে ৪ জন উলুল আজ্বম রছুল উনাদের মতো বলার এমনকি ৪ জন উলুল আজ্বম রছুল উনাদেরও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মতো শেষ নাবী বলার, সেখানে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার বলা জাহিলদের কবে থেকে এই অধিকার জন্ম নিলো? কে দিল? উত্তর কি পাওয়া যাবে?

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এমন আজ্বিম এক চরিত্র যার কোন মিছাল নাই পুরো সৃষ্টিতে, তিনি সৃষ্টিতে আজ্বিম অদ্বিতীয় মাখলুক। মহান আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই ইরশাদ করেনঃ (وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের সর্বোচ্চ মাক্বামে প্রতিষ্ঠিত

ছুরাহ আল ক্বালাম - ৬৮:৪

আমাদের চরিত্রে দোষ আছে, ভুল আছে, নফছ আছে, গ্বাফলত আছে, পরিবর্তন আছেঅন্যদিকে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তিনি মহান চরিত্রের সর্বোচ্চ মাক্বামে ফায়েজ হওয়া সরাসরি রব্বে জুল জালাল উনার পক্ষ থেকেতাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে হোন?

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরও ইরশাদ করেনঃ (النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ) অর্থাৎ, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মুমিনদের নিকট প্রাণাধিক প্রিয় এবং তাদের নিজেদের বিষয়ে সর্বাধিক হকদার ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।

ছুরাহ আল আহযাব - ৩৩:৬

আমরা কি কোনো মুমিনের কাছে তাঁর নিজের প্রাণের চেয়েও অধিক হকদার? নাএই মাক্বাম শুধু নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনারতাহলে “আমাদের মতো” কথাটি কোথায় দাঁড়ায়?

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরও ইরশাদ করেনঃ (إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ، يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা ও উনার ফেরেশতাগণ নবীর উপর দুরূদ শরীফ পাঠ করেনহে ঈমানদারগণ, তোমরাও উনার উপর দুরূদ শরীফ পাঠ করো এবং যথাযথভাবে ছালাম পেশ করো

ছুরাহ আল আহযাব - ৩৩:৫৬

আমাদের উপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা ও ফেরেশতাগণ এভাবে দুরূদ শরীফ পাঠ করেন, করার নির্দেশ দিয়েছেন? আমাদের নাম শুনলে কি উম্মতের উপর দুরূদ পড়া ওয়াজিব হয়ে যায়? নাএই মাক্বাম কেবল রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার জন্যতাহলে বোঝাই যাচ্ছে, কস্মিনকালেও তিনি আমাদের মতো সাধারণ মানুষ ননতিনি বাশার, কিন্তু ছাইয়্যিদুল বাশারতিনি মাখলূক, কিন্তু আফদ্বলুল মাখলূকতিনি বান্দা, কিন্তু য়াবদে খাছতিনি রছুল, তিনি হাবীব, তিনি শাফী, তিনি রহমাতাল্লিল য়ালামীন

এখানে আরেকটি খুব সহজ, কিন্তু গভীর চিন্তার বিষয় আছে। যদি কেউ বলে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তিনি আমাদের মতোই সাধারণ বাশার, তাহলে তাকে জিজ্ঞাসা করা হোকঃ আপনি কি আমার কালিমা পড়তে পারবেন? আমি কি আপনার কালিমা পড়তে পারবো?

অথচ আমি যদি বলিঃ (لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ، فُلَانٌ رَسُولُ اللهِ) অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, “অমুক ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা উনার রছুল” তাহলে এটা কি ঈমানদার বানাবে? না, বরং অলরেডি মুছলিম হলে কাফের বানিয়ে দেবেআপনি যদি আমার নাম নিয়ে কালিমা পড়েন, তাতে ঈমানতো আসবেই না, বরং থাকলে যাবেদুনিয়ার গ্বইরে নবী সকল মানুষ বাদ দিলাম, কোন পূর্বরতি নবী, রছুল উনাদের নামের কালিমা পড়লেও কি মানুষ মুছলমান হতে পারবে? না পারবেনা কিন্তু যখন বলা হয়ঃ (لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ، مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, হযরত মুহাম্মদ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রছুল

তখন মানুষ ঈমানের দরজায় প্রবেশ করে, মুছলমান হয়এখন প্রশ্ন হলো, যাঁর নাম কালিমার অংশ, যাঁর রিছালাত স্বীকার না করলে ইমান কামিল হয় না, যাঁকে না মানলে “لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ” বলার পরও নাজাতের দরজা খোলে না, তিনি কীভাবে আমাদের মতো সাধারণ বাশার হন?

আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের নাম কালিমায় নেইআমরা বাশার, কিন্তু আমাদের রিছালাত মানা ফরজ নয়আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের অস্বীকার করলে ঈমান নষ্ট হয় নাআর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এমন বাশার, যাঁর রিছালাত স্বীকার করা ঈমানের শর্তঅতএব তিনি বাশার হলেও যে, আমাদের মতো সাধারণ বাশার নন এটা বাচ্চারাও বুঝবে

এখানেই (بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ) এর সঠিক অর্থ পরিষ্কার হয়তিনি ইলাহ নন, তিনি মাখলূক, তিনি মানবজাতির মধ্যেই তাশরীফ এনেছেন; কিন্তু উনার মাক্বাম এমন যে, উনার নাম ছাড়া কালিমা শরীফ পূর্ণ হয় না, উনার রিছালাত ছাড়া ঈমান পূর্ণ হয় না, উনার অনুসরণ ছাড়া মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার মুহব্বতের দরজা খোলে না

এখানে একটি হাদীছ শরীফ বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেনরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এক প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেনঃ (إِنِّي لَسْتُ كَهَيْئَتِكُمْ، إِنِّي أَبِيتُ يُطْعِمُنِي رَبِّي وَيَسْقِينِي) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমার অবস্তা তোমাদের অবস্থার মতো নয়আমি রাত কাটাই, আমার রব আমাকে খাওয়ান এবং পান করান

ছ্বহীহ আল বুখারী, কিতাবুস ছাওম; ছ্বহীহ মুছলিম, কিতাবুছ ছিয়াম

এই হাদীছ শরীফ স্পষ্ট করে দেন, বাহ্যিক বাশারিয়াত আছে, কিন্তু নববী হাক্বিকত সাধারণ মানুষের মতো নয়যেখানে সাধারণ মানুষ দুর্বল, সেখানে উনার মাক্বাম আলাদাযেখানে সাধারণ মানুষ খাওয়া-পারার মুখাপেক্ষী, সেখানে উনার উপর রব্বানী ফায়েজের আলাদা তাছির আছেতাই “তিনি আমাদের মতোই” বলা হাদীছ শরীফের বিরুদ্ধেও যায়

আহলুছ ছুন্নাহর ভাষা হলেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বাশারিয়াতের দিক থেকে মানুষ, কিন্তু হাক্বিকত, মাক্বাম, ঈলম, নূর, ওহী, ইছমত, আজ্বমত, শাফায়াত, রহমত, মর্যাদা, ক্বুরব, খাছাইছ ও কামালাতের দিক থেকে আমাদের মতো ননতিনি আমাদের মতো হলে উনার অনুসরণ ফরজ হতো না, উনার উপর দুরূদ পাঠের হুকুম এভাবে আসত না, উনার শানে বেআদবী করলে সমস্ত নেক য়ামল নষ্ট হওয়ার ভয় আসত না

যেমন, কুরআন শরীফে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ، وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ، أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ) অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ, (তোমরা যখন কথা বলো তখন) তোমাদের আওয়াজ যেনো (আমার) নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার আওয়াজের চেয়ে উর্ধ্বে না যায়এবং (তোমরা) নিজেদের মধ্যে একে অপরের সাথে যেভাবে উচ্চস্বরে (বা আদব ছাড়া) কথা বলো, অনুরূপ ভাষায়ও কথা বলনা; এমন যেনো কখনো না হয় যে তোমাদের সকল নেক য়ামল বা ইবাদত (শুধুমাত্র এই কারনেই) বরবাদ করে দেওয়া হবে, অথচ তোমরা তা জানতেও পারবেনা

ছুরাহ আল হুজুরাত - ৪৯:২

যদি নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমাদের মতো সাধারণ মানুষ হতেন, তাহলে উনার সামনে আওয়াজ উঁচু করলে য়ামল বিনষ্ট হওয়ার ভয় কেন? সাধারণ মানুষের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বললে কি আমল নষ্ট হয়ে যায়? না যায়নাকিন্তু নবীর দরবারে আদব এর খিলাফ হলে য়ামল নষ্ট হয়ে যায়এখানেই বোঝা যায়, বাশারিয়াত আছে, কিন্তু সাধারণত্ব নেইমানব রূপ আছে, কিন্তু মাক্বাম আলাদাশরীর আছে, কিন্তু নূরানী, নূরে মুহাম্মাদী ওয়ালা উনি উনার মর্যাদাই আলাদা

এই আয়াত শরীফের আসল শিক্ষা হলো, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সঙ্গে “আমাদের মতো” আচরণ করা যাবে নাউনার দরবারের আদব আলাদাউনার নামের আদব আলাদাউনার ছুন্নতের মর্যাদা আলাদাউনার ক্ববর মুবারকের আদব আলাদাউনার রওযা শরীফ সাধারণ কোন ক্ববর নয়উনার হায়াতে বারযাখী হাক্বউনার উপর উম্মতের দরূদ পেশ করা হয়উনার দরবারে বেয়াদবি দ্বীন-ইমানের জন্য ভয়ংকর

এখনো যারা বলে, “নবী তো আমাদের মতোই বাশার,” তাদের সামনে কিছু সরল প্রশ্ন রাখা দরকার

আমরা কি মাটির নিচে ক্ববরে থাকা কোনো নবীকে দেখতে পাই, যেভাবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে ক্ববরের মধ্যে নামাযরত অবস্থায় দেখেছেন? ছ্বহীহ মুছলিমে আছে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মি’রাজের রাতে হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে ক্ববরের মধ্যে দাঁড়িয়ে নামায পড়তে দেখেছেনআমরা কি এমন দেখতে পাই? নাতাহলে তিনি আমাদের মতো দৃষ্টিসীমার মানুষ কীভাবে?

আমরা কি ক্ববরবাসীর শাস্তি দেখতে বা শুনতে পাই, যেভাবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম দুই ক্ববরবাসীর শাস্তির খবর দিয়েছেন? ছ্বহীহ হাদীছে এসেছেন, তিনি দুই ক্ববরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে বললেন, তাদের শাস্তি হচ্ছেএকজন প্রস্রাব থেকে বাঁচত না, আরেকজন চুগলখোরি করতআমরা কি ক্ববরের ভিতরের এই হাল দেখতে বা জানতে পারি? নাতাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে?

আমরা কি ফেরেশতা দেখতে পাই? রেওয়ায়েতে এসেছেন, কোনো কোনো জানাযা ও বিশেষ মুহূর্তে এত ফেরেশতা নাযিল হয়েছেন যে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম পা রাখার জায়গা না পেয়ে পা টিপে টিপে হেটেছেনআমরা কি ফেরেশতাদের নুযূল দেখি? আমাদের চোখ কি সেই নূরানী জগৎ দেখতে পারে? নাতাহলে আমাদের চোখ উনার চোখের মতো কীভাবে?

আমরা কি অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া, বাহ্যিক যানের সীমাবদ্ধতা ছাড়া, আনলিমিটেড গতিতে স্পেসস্যুট ছাড়া মহাশূন্য অতিক্রম করে আসমানের বাইরে গিয়ে, ছিদরাতুল মুনতাহার সিমানা পেরিয়ে, আবার মুহূর্তের মধ্যে ফিরে আসতে পারি? রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মি’রাজে গিয়েছেনতিনি মাছযিদুল হারাম থেকে মাছযিদুল আক্বছা, সেখান থেকে আসমানসমূহ, তারপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ক্বুরবের মাক্বামে গিয়েছেন, যেখানে ফেরেশতাদের সর্দার যাওয়ার সাহস করেন নাই ভয়ে যে ১ ইঞ্চি আগালে পুড়ে যাবেনআমরা কি তা পারি, নাকি পারবো? তাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে?

আমরা কি দুনিয়ায় বসে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখতে পাই? ছ্বহীহ হাদীছে এসেছেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নামাযে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেছেনতিনি জান্নাতের আঙ্গুরের একটি থোকা ধরতে হাত বাড়িয়েছিলেন, পরে তা ছেড়ে দিয়েছেনআমরা কি দুনিয়ার চোখে জান্নাতের ফল দেখতে পাই? আমরা কি জাহান্নামের দৃশ্য দেখতে পাই? আমাদের হাত কি মদিনা থেকে বাড়ালে জান্নাতের ফল ধরতে পারবে? নাতাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে?

আমরা কি উনার মতো সামনে ও পেছনে দেখতে পাই? ছ্বহীহ হাদীছে এসেছেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, আমি আমার পেছনেও দেখি, যেমন সামনে দেখিআমরা কি ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিশক্তির মালিক? আমরা কি পেছনের দৃশ্য সামনে দেখার মতো দেখতে পাই? নাতাহলে আমাদের দৃষ্টি উনার দৃষ্টির মতো কীভাবে?

আমরা কি আসমানের সেই শব্দ শুনতে পাই, যা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম শুনেছেন? হাদীছ শরীফে এসেছেন, তিনি বলেছেন, আমি যা দেখি, তোমরা তা দেখ না; আমি যা শুনি, তোমরা তা শুন নাআসমান কড়মড় শব্দ করছে, আর তার জন্য তা করা যথার্থ; কারণ সেখানে চার আঙুল জায়গাও নেই, যেখানে কোনো ফেরেশতা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জন্য সিজদা বা ক্বিয়ামে নেইআমরা কি এই শব্দ শুনি? নাতাহলে আমাদের শ্রবণশক্তি উনার শ্রবণশক্তির মতো কীভাবে?

এই প্রশ্নগুলো কোনো অতিরঞ্জন নয়এগুলো রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার খাছাইছ ও মোযেজার দরজাতিনি বাশার, কিন্তু এমন বাশার, যার দৃষ্টি সাধারণ দৃষ্টি নয়, যার শ্রবণ সাধারণ শ্রবণ নয়, যার মি’রাজ সাধারণ সফর নয়, যার হাল সাধারণ মানুষের হাল নয়, যার ক্বুরব সাধারণ মাখলূকের ক্বুরব নয়

যারা বলে, “নবী তো আমাদের মতো বাশার,” তাদের ভুল হলো, তারা বাশার শব্দ ধরে নবুওয়ত, ওহী, ইছমত, নূর, রহমত, শাফায়াত, আদব, খাছাইছ সব ঢেকে দিতে চায়অথচ ক্বুরআনের ভাষা ভারসাম্যপূর্ণএকদিকে বলেন, তিনি বাশার, যাতে কেউ উনাকে খোদা না বানায়অন্যদিকে বলে, তিনি রহমাতাল্লিল য়ালামীন, যাতে কেউ উনাকে সাধারণ পৃথিবীর ১ মাখলুক না বানায়একদিকে বলেন, উনার প্রতি ওহী আসেঅন্যদিকে বলেন, উনার অনুসরণ করলে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ভালোবাসবেনঃ (قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللهَ، فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ) অর্থাৎ, বলুন, যদি তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে ভালোবাস, তবে আমাকে অনুসরণ করো, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের ভালোবাসবেন

ছুরাহ আলে ইমরান - ৩:৩১

মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার মুহব্বতের দরজা নবীর অনুসরণের সঙ্গে যুক্ততাহলে তিনি কি সাধারণ বাশার? নাতিনি সেই বাশার, যাঁর অনুসরণ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার মুহব্বতের দরজাতিনি সেই বাশার, যাঁর ছুন্নত দুনিয়া ও আখিরাতের নাজাততিনি সেই বাশার, যাঁর নামের সঙ্গে দুরূদ ছাড়া মুমিনের জবান পূর্ণ আদব পায় না

এখন মূল সিদ্ধান্ত হলোঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বাশার, কারণ কুরআন শরীফে আছেকিন্তু তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার নন, কারণ কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা, আদব, নবুওয়ত, ওহী, ইছমত, আজ্বমত খাছাইছ এবং উনার মাক্বাম সবই প্রমাণ করেন যে তিনি ছাইয়্যিদুল বাশার

বাশারিয়াত মানলে ঈমান ঠিক থাকেসাধারণত্ব চাপালে আদব নষ্ট হয়উনাকে খোদা বানানো কুফর, আর উনাকে নিজের মতো সাধারণ বানানো গোস্তাখীআহলুছ ছুন্নাহ এই দুই বাতিল পথের মাঝখানে হক্বের পথ ধরে: তিনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বান্দা ও রছুল, তিনি নূরে মুজাছছাম, তিনি ছাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরছালিন, তিনি রহমাতাল্লিল য়ালামীন, তিনি আফদ্বলুল খালক্ব, তিনি আমাদের মতো নন

তাই যে কেউ কাহাফের শেষ আয়াত এর প্রথম অংশ পড়ে যদি বলে, “নবী আমাদের মতো,” তাহলে তাকে বলা হবেঃ আয়াত পুরো পড়ুন (يُوحَىٰ إِلَيَّ) দেখুনঅন্য আয়াতগুলোও দেখুনদুরূদের আয়াত শরীফ দেখুনআদবের আয়াত শরীফ দেখুনরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মুমিনদের নিকট প্রাণাধিক প্রিয় এবং তাদের নিজেদের বিষয়ে সর্বাধিক হকদার ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত” আয়াত শরীফ দেখুন“রহমাতাল্লিল য়ালামীন” আয়াত শরীফ দেখুন“সমগ্র জগতের নাজীর” আয়াত শরীফ দেখুনমি’রাজ শরীফ দেখুনক্ববরের হাল জানা দেখুনফেরেশতাদের নুযূল দেখুনজান্নাত জাহান্নাম দেখুনসামনে-পেছনে দেখার খাসিয়্যাত দেখুনআসমানের শব্দ শুনার খাসিয়্যাত দেখুনতারপর বুঝবেন, আয়াতের উদ্দেশ্য নবীর মাক্বাম কমানো নয়, বরং উনাকে খোদা বানানোর পথ বন্ধ করে নবুওয়তের মাক্বামে প্রতিষ্ঠা করা

এখন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার দোয়া-আন-নূরের দীর্ঘ রেওয়ায়েতের একটি সূক্ষ্ম শব্দের দিকে লক্ষ্য করুন। দোয়ার এসেছেঃ (أَللّٰهُمَّ أَعْطِنِي نُورًا، وَاجْعَلْ فِي عَصَبِي نُورًا، وَفِي لَحْمِي نُورًا، وَفِي دَمِي نُورًا، وَفِي شَعْرِي نُورًا، وَفِي بَشَرِي نُورًا) অর্থাৎ, হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আপনি আমাকে নূর দান করুন; আমার স্নায়ুকে নূর বানিয়ে দিন, আমার গোশতকে নূর বানিয়ে দিন, আমার রক্তকে নূর বানিয়ে দিন, আমার চুলকে নূর বানিয়ে দিন, আর আমার বাশারকে (অর্থাৎ আমার চামড়া ও বাহ্যিক মানবীয় আবরণকেও) নূর বানিয়ে দিন

এখানে بَشَرِي শব্দটি খুব গুরুত্বপূর্ণরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজেই যখন বলেনঃ (وَفِي بَشَرِي نُورًا) তখন বুঝা যায়, بَشَر শব্দের একটি প্রকাশ্য অর্থ হলো মানুষের বাহ্যিক দেহাবরণ, চামড়া, দেহগত মানবীয় রূপঅতএব কুরআন শরীফে যখন বলা হয়ঃ (قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ) অর্থাৎ, (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি বলুন, আমি তো তোমাদের মতো একজন বাশার, তবে আমার ওপর ওহী নাজিল করা হয়

ছুরাহ আল কাহফ - ১৮:১১০

তখন এর অর্থ এই নয় যে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমাদের মতো সাধারণ মানুষ। বরং এর অর্থ হলো, উনি ইলাহ নন, উনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জাতের অংশ নন, উনি ফেরেশতা নন; উনি মানবজাতির মধ্যেই বাশারিয়াতের বাহ্যিক পোশাকে তাশরীফ এনেছেন। কিন্তু সেই বাশারিয়াতও সাধারণ বাশারিয়াত নয়। কারণ উনার নিজের দোয়া মুবারকেই আছে, উনার স্নায়ুতে নূর, গোশতে নূর, রক্তে নূর, চুলে নূর, এমনকি উনার بَشَر বা বাহ্যিক দেহাবরণেও নূর।

তাই “বাশার” শব্দ দিয়ে উনার মাক্বাম কমানো যায় নাবরং বলা হবে, উনি বাশার, কিন্তু নূরানী বাশারউনি মানুষ, কিন্তু ছাইয়্যিদুল বাশারউনি মাখলূক, কিন্তু আফদ্বলুল মাখলূকউনি বান্দা, কিন্তু আবদে খাছউনি আমাদের মতো দেহধারী মানব রূপে তাশরীফ এনেছেন, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের অন্তর্ভুক্ত নন; কারণ আমাদের উপর ওহী আসে না, আমাদের বাশারিয়াত নূরে মুহাম্মদীর মাক্বামে নয়, আমাদের দেহ দ্বীনের উৎস নয়, আমাদের জীবন শরীয়তের মাপকাঠি নয়

অতএব (بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ) এর উদ্দেশ্য হলেন তাওহীদ রক্ষা করা: যেন কেউ উনাকে ইলাহ না বানায়আর (يُوحَىٰ إِلَيَّ) এর উদ্দেশ্য হলো নবুওয়তের মাক্বাম প্রতিষ্ঠা করাঃ যেন কেউ উনাকে সাধারণ মানুষ না বানায়দোয়া-আন-নূরের ভাষা এই হাক্বিকতকে আরও স্পষ্ট করে দেন যে, নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বাশারিয়াতও নূরানী, উনার মানবীয় রূপও রব্বানী সৃষ্ট নূর মুবারক, আর উনার বাহ্যিক দেহাবরণও সাধারণ মানুষের মতো নয়

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মানুষ, কিন্তু এমন মানুষ, যার মতো কোনো মানুষ নেইতিনি বাশার, কিন্তু বাশারিয়াতের সর্দারতিনি মাখলূক, কিন্তু মাখলূকের শ্রেষ্ঠজনতিনি বান্দা, কিন্তু য়াবদে কামিলতিনি রছুল, কিন্তু ছাইয়্যিদুল মুরছালীনতিনি নবী, কিন্তু খতামুন নাবিয়্যীনতিনি আমাদের মতো নন; বরং আমাদের ইমান, আমাদের য়ামল, আমাদের নাজাত, আমাদের মহব্বত, আমাদের আদব, সবকিছু উনার দরবারের সঙ্গে যুক্ত

এটাই আহলুছ ছুন্নাহ-এর আক্বীদাহএটাই আদবের পথএটাই ঈমানের নিরাপদ সীমা