Monday, July 27, 2026

ছুরাহ কাহাফের শেষ আয়াতেঃ নবী কি আমাদের মতো বাশার বলা হয়েছে?

ছুরাহ কাহাফের শেষ আয়াতেঃ নবী কি আমাদের মতো বাশার বলা হয়েছে?

এই প্রশ্নটি সাধারণ প্রশ্ন নয়এটি আক্বীদার প্রশ্ন, আদবের প্রশ্ন, ঈমানের প্রশ্ন“নবী কি আমাদের মতো বাশার?” এই বাক্যটি বাহ্যিকভাবে ছোট, কিন্তু এর ভিতরে দুইটি পথ আছেএক পথ আহলুছ ছুন্নাহর, আরেক পথ গোস্তাখীরআহলুছ ছুন্নাহ বলেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বাশার, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ বাশার ননতিনি বাশারিয়াতের পোশাকে নূরে মুজাছছাম, ছাইয়্যিদুল বাশার, আফদ্বলুল খালক্ব, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সবচেয়ে প্রিয় হাবীব

এখন যদি কেউ বলে, নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বাশার নন, তাহলে সে কুরআন শরীফের প্রকাশ্য ভাষার বিরুদ্ধে গেলোআবার যদি কেউ বলে, তিনি আমাদের মতোই সাধারণ বাশার, তাহলে সে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার শান, মান, মর্যাদা কমিয়ে দিলোসঠিক আক্বীদাহ হলো, তিনি বাশার, কিন্তু “আমাদের মতো” নন কেননা পবিত্র ক্বুরআন শরীফে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ أَنَّمَا إِلٰهُكُمْ إِلٰهٌ وَاحِدٌ) অর্থাৎ, (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি বলুন, আমি তো তোমাদের মতো একজন বাশার, তবে আমার ওপর ওহী নাজিল করা হয় (আর সে ওহীর মূল কথা হচ্ছেন), তোমাদের যিনি মাবুদ তিনি একক ইলাহ

ছুরাহ আল কাহফ - ১৮:১১০

এই আয়াত শরীফ দিয়ে যারা বলে, “দেখুন, নবী তো আমাদের মতোই মানুষ,” তারা আয়াত শরীফের অর্ধেক দেখে, বাকিটা গোপন করেআয়াত শরীফে বলা হয়েছে, بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ, অর্থাৎ বাশারিয়াতের দিক থেকে তোমাদের মতো; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলা হয়েছে, يُوحَىٰ إِلَيَّ, অর্থাৎ কিন্তু আমার ওপর ওহী নাজিল করা হয়এখানেই পার্থক্যআমরা বাশার, কিন্তু আমাদের উপর ওহী আসে নাআমরা বাশার, কিন্তু আমরা ছাইয়্যিদুল আম্বিয়া নইআমরা বাশার, কিন্তু আমাদের নাম আরশে লেখা নয়আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের উপর ক্বুরআন শরীফ নাযিল করা হয়নিআমরা বাশার, কিন্তু আমরা রহমাতাল্লিল য়ালামীন নই

আর আয়াতে এই কথা বলা হয়নি যে, “তোমরাও আমার মতো” বলা হয়েছে, “আমি তোমাদের মতো বাশার” এই দুই বাক্যের মধ্যে আসমান জমিনের পার্থক্য রয়েছে“আমি তোমাদের মতো বাশার” মানে, আমি খোদা নই, আমি মালাক নই, আমি তোমাদের কাছে বুঝার মতো, অনুসরণের মতো, জীবনযাপনের আদর্শ হিসেবে পাঠানো একজন রছুলকিন্তু “তোমরাও আমার মতো” এই কথা কোথাও বলা হয়নিসাধারণ মানুষকে নবীর মাক্বামের সমান করে দেওয়া এই আয়াতের উদ্দেশ্য নয়

বাশার কেন বলা হয়েছে তা বুঝতে হলে এই আয়াতের শানে নুযূল ও প্রেক্ষাপট বুঝতে হবেমহান আল্লাহ তায়ালা কেন উনার হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে দিয়ে বলালেন, “আমি তোমাদের মতো বাশার”? এই ঘোষণা কি উনার মাক্বাম কমানোর জন্য? নাকি উনার নবুওয়তকে রক্ষা করার জন্য?

এই জায়গায় আয়াতের প্রেক্ষাপট বুঝা জরুরিকারণ কোনো আয়াত শরীফকে উনার শানে নুযূল, পরিবেশ, মুখাতিব বা যাদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে, তাদের আক্বীদা না বুঝে অর্থ ধরলে মানুষ ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়

তৎকালীন আরব, মক্কা, মুশরিক, ইহুদি, নাসারা, এদের আক্বীদাগত অবস্থা দেখুনমানুষ পাথরের মূর্তি বানিয়ে পূজা করতকাঠের মূর্তি বানিয়ে পূজা করতনিজের হাতে বানানো বস্তুকে ইলাহ মনে করত আটা ময়দা দিয়ে বানানো মুর্তি আবার ভুক লাগলে খেয়েও ফেলতো এমন নজির ও আছে। লাত, মানাত, উযযা, এসব মূর্তিকেতো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার মেয়েও বলতো, উনার নৈকট্যের মাধ্যম হিসেবেও পূজা করতকেউ চাঁদ, সূর্য, তারকা, গাছ, পশু, জড়বস্তু পর্যন্ত পূজা করতঅর্থাৎ তাদের সমস্যা ছিল, তারা মাখলূককে খলিকের মাক্বামে তুলত

এমনকি আহলে কিতাবের মধ্যেই ইহুদিদের একটি দল তো হযরত উযাইর য়ালাইহিছ ছালাম উনার সম্পর্কে বলেছিল, তিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পুত্র, নাউযুবিল্লাহনাসারারা হযরত ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম উনার সম্পর্কে বলেছিল, তিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পুত্রক্বুরআন শরীফে মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের এই বাতিল দাবিকে উল্লেখ করে ইরশাদ করেনঃ (وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللهِ، وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللهِ، ذَٰلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ، يُضَاهِئُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ، قَاتَلَهُمُ اللهُ، أَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ) অর্থাৎ, ইহুদিরা বলল, উযাইর আল্লাহর পুত্র; আর নাসারারা বলল, মসীহ আল্লাহর পুত্রএটি তাদের মুখের কথাতারা পূর্ববর্তী কাফিরদের কথার সাদৃশ্য করছেমহান আল্লাহ তায়ালা তাদের ধ্বংস করুন, তারা কোথায় ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

ছুরাহ আত তাওবাহ - ৯:৩০

এখন চিন্তা করুন, যেসব জাতি কোনো কোনো নবীর কিছু মুজিযা দেখে নবীকে আল্লাহর পুত্র বলে ফেলেছে, তাদের সামনে যখন সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরছালিন, ইমামুল মুরছালি, হাবীবে খোদা, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তাশরীফ আনলেন, যাঁর মুজিযা পূর্ববর্তী নবীগণের সকলের সম্মিলিত মুজিযার চেয়েও বেশী, যাঁর হাতে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হলো, যাঁর ইশারায় গাছ এগিয়ে এলো, পাথর ছালাম দিল, অল্প খাদ্যে বহু মানুষ তৃপ্ত হলো, আঙুল মুবারক থেকে পানি প্রবাহিত হলো, যাঁর উপর ক্বুরআন শরীফ নাযিল হলো, যাঁকে মিরাজ শরীফে নেওয়া হলো, তখন বাতিল আক্বীদার লোকদের জন্য ঘুলু করার আশঙ্কা আরও বেশি ছিল এইটা জাহিল গ্বইরে ছুন্নী খারেজীরা না বুঝলেও মহান আল্লাহ তায়ালা তো জানতেনই।

অতএব قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْআয়াত শরীফটি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মাক্বাম কমানোর জন্য আসেনি; বরং তাওহীদ রক্ষা করার জন্য এসেছেন। অর্থাৎ, (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম), আপনি তাদের বলে দিন, আমি ইলাহ নই, আমি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পুত্র নই, আমি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার যাতের অংশ নই, আমি মাখলূক; আমি মানবজাতির মধ্যেই তাশরীফ এনেছি, যেনো তোমরা আমাকে অনুসরণ করতে পারোকিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বলে দিন, “يُوحَىٰ إِلَيَّ”, আমার উপর ওহী নাযিল হয়তাই আমি সাধারণ বাশার নই, আমি ওহীপ্রাপ্ত রছুল

এখানে দুইটি বাতিল দরজা বন্ধ করা হয়েছেপ্রথম দরজা হলো, কেউ যেন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে ইলাহ না বানায়দ্বিতীয় দরজা হলো, কেউ যেন উনাকে নিজের মতো সাধারণ মানুষ মনে না করেপ্রথম দরজা বন্ধ হয়েছে بَشَرٌ مِّثْلُكُمْদিয়েদ্বিতীয় দরজা বন্ধ হয়েছে يُوحَىٰ إِلَيَّদিয়ে

তাই আয়াতের সঠিক অর্থ হলো আমি তোমাদের মতো বাশারিয়াতের পোশাকে তাশরীফ এনেছি, কিন্তু তোমাদের মতো সাধারণ মানুষ নই; আমার উপর ওহী নাযিল হয়, সেই ওয়াজি যা নূরের ভাণ্ডার অথচ দেখ চেয়ে তূর-এ-ছিনায়, নূরের এক ঝলকে ছ্বহাবি মৃত নবী মুছা কালিমুল্লাহ অজ্ঞন, অথচ আমি দিব্যি ২৩ বছর তোমাদের মধ্যে আনলিমিটেড নূর নিয়ে চলাফেরা করেছি হ্যাঁ আমি মাখলূক, কিন্তু আফদ্বলুল মাখলূকআমি বান্দা, কিন্তু আবদে খাছআমি মানুষ, কিন্তু ছাইয়্যিদুল বাশারআমি ইলাহ নই, কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা উনার হাবীব ও রছুল

মক্কার মুশরিকরা এমন কথাও বলত যে, রছুল আবার মানুষ কেন? ফেরেশতা কেন নন? কখনো বলত, তিনি খাবার কেন খান, বাজারে কেনো চলাফেরা করেন? পবিত্র ক্বুরআন শরীফে তাদের আপত্তিগুলো এইভাবে এসেছেনঃ (وَقَالُوا مَالِ هَٰذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ) অর্থাৎ, তারা বলল, এ কেমন রছুল যে, তিনি খাদ্য খান এবং বাজারে চলাফেরা করেন?

ছুরাহ আল ফুরক্বান - ২৫:৭

মুশরিকদের ভুল ছিল, তারা ভাবত রছুল হলে মানুষ হওয়া যাবে নামহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেনরছুল মানুষই হবেন, কারণ মানুষকে হিদায়েত দিতে হলে মানুষের ভাষায়, মানুষের জীবনে, মানুষের সামনে, মানুষের অনুসরণযোগ্য আদর্শ হিসেবে আসতে হবেফেরেশতা হলে মানুষ বলত, আমরা তো ফেরেশতা নই, আমরা কীভাবে অনুসরণ করব?

মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (قُلْ لَوْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةٌ يَمْشُونَ مُطْمَئِنِّينَ، لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِمْ مِّنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَّسُولًا) অর্থাৎ, পেয়ারে হাবিব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আপনি বলুন, যদি জমিনে ফেরেশতারা নিশ্চিন্তে চলাফেরা করত, তবে আমি অবশ্যই আসমান থেকে তাদের কাছে ফেরেশতাকেই রছুল হিসেবে নাযিল করতাম

ছুরাহ আল ইছরা - ১৭:৯৫

অতএব নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বাশারিয়াত উনার মর্যাদা কমানোর জন্য নয়, বরং উনাকে অনুসরণযোগ্য করার জন্যতিনি খেতেন, যেন উম্মত হালাল খাওয়ার আদব শিখেতিনি ঘুমাতেন, যেন উম্মত ঘুমের ছুন্নত শিখেতিনি বিবাহ করেছেন, যেন উম্মত পবিত্র পারিবারিক জীবন শিখেতিনি বাজারে গেছেন, যেন উম্মত লেনদেনের আদব শিখেতিনি কষ্ট পেয়েছেন, যেন উম্মত ছ্ববর শিখেতিনি ঈবাদত করেছেন, যেন উম্মত বন্দেগি শিখেতিনি বাশারিয়াতের পোশাকে এসেছেন, যেন উম্মত বলতে না পারে, “আমরা তো উনাকে অনুসরণ করতে পারব না

কিন্তু এই বাশারিয়াতকে ধরে কেউ যদি উনাকে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে নামিয়ে আনে, তাহলে সে কুরআনের অন্য আয়াতগুলো ভুলে যায়মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে সাধারণ মানুষ বলেননি, বরং বলেছেনঃ (وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ) অর্থাৎ, আমি আপনাকে সকল য়ালমের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি

ছুরাহ আল আম্বিয়া - ২১:১০৭

আমরা কি সমগ্র য়ালামীন বা সমস্ত জগতের জন্য রহমত? না রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম সমস্ত কায়েনাতের জন্যে রহমততাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে হবেন?

আবার মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا) অর্থাৎ, বরকতময় তিনি, যিনি উনার বান্দার উপর ফুরক্বন নাযিল করেছেন, যাতে তিনি সমস্ত য়ালমের জন্য সতর্ককারী হন

ছুরাহ আল ফুরক্বান - ২৫:১

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি পুরো য়ালামীন বা সমগ্র কায়েনাতের জন্য নাজীর? আমরা কি জিন, ইনছান, পূর্ব, পশ্চিম, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, সব জগতের জন্য মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে সতর্ককারী? নাএই মাক্বাম শুধু রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার, আম পাবলিক তো বহুত দূর ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৯২ পয়গম্বর ও না, ৩১২ মুরছাল ও না, ৪ উলুল আজ্বম রছুল ও উনার মতো নাতাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে বলছি?

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরও ইরশাদ করেনঃ (وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের সর্বোচ্চ মাক্বামে প্রতিষ্ঠিত

ছুরাহ আল ক্বালাম - ৬৮:৪

আমাদের চরিত্রে দোষ আছে, ভুল আছে, নফছ আছে, গাফলত আছে, পরিবর্তন আছেআর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মহান চরিত্রের সর্বোচ্চ মাক্বামেতাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে?

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরও ইরশাদ করেনঃ (النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ) অর্থাৎ, নবী মুমিনদের নিজেদের প্রাণের চেয়েও অধিক নিকট ও অধিক অধিকারী

ছুরাহ আল আহযাব - ৩৩:৬

আমরা কি কোনো মুমিনের নিজের প্রাণের চেয়েও অধিক অধিকারী? নাএই মাক্বাম শুধু নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনারতাহলে “আমাদের মতো” কথাটি কোথায় দাঁড়ায়?

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরও ইরশাদ করেনঃ (إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ، يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা ও উনার ফেরেশতাগণ নবীর উপর দুরূদ শরীফ পাঠ করেনহে ঈমানদারগণ, তোমরাও উনার উপর দুরূদ শরীফ পাঠ করো এবং যথাযথভাবে ছালাম পেশ করো

ছুরাহ আল আহযাব - ৩৩:৫৬

আমাদের উপর কি মহান আল্লাহ তা’য়ালা ও ফেরেশতাগণ এভাবে দুরূদ শরীফ পাঠ করেন? আমাদের নাম শুনলে কি উম্মতের উপর দুরূদ পড়া মুহব্বতের আদব, ওয়াজিব হয়ে যায়? নাএই মাক্বাম কেবল রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার জন্যতাহলে বোঝাই যাচ্ছে তিনি আমাদের মতো সাধারণ মানুষ ননতিনি বাশার, কিন্তু ছাইয়্যিদুল বাশারতিনি মাখলূক, কিন্তু আফদ্বলুল মাখলূকতিনি বান্দা, কিন্তু য়াবদে খাছতিনি রছুল, তিনি হাবীব, তিনি শাফী, তিনি রহমাতুল্লিল য়ালামীন

এখানে আরেকটি খুব সহজ, কিন্তু গভীর চিন্তার বিষয় আছে। যদি কেউ বলে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমাদের মতোই সাধারণ বাশার, তাহলে তাকে জিজ্ঞাসা করা হোকঃ আপনি কি আমার কালিমা পড়তে পারেন? আমি কি আপনার কালিমা পড়তে পারবো?

অথচ আমি যদি বলিঃ (لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ، فُلَانٌ رَسُولُ اللهِ) অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, “অমুক ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার রছুল” তাহলে এটা ঈমানদার বানাবে না, বরং অলরেডি মুছলিম হলে কাফের বানিয়ে দেবে। আপনি যদি আমার নাম নিয়ে কালিমা পড়েন, তাতেও ঈমান আসবে না, বরং যাবে। দুনিয়ার কোনো মানুষের নাম বাদ দিলাম, কোন পূর্বরতি নবী, রছুল উনাদের নাম দ্বারা কালিমা পড়লেও মানুষ মুছলমান হয় না। কিন্তু যখন বলা হয়ঃ (لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ، مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, হযরত মুহাম্মদ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রছুল।

তখন মানুষ ঈমানের দরজায় প্রবেশ করে, মুছলমান হয়। এখন প্রশ্ন হলো, যাঁর নাম কালিমার অংশ, যাঁর রিছালাত স্বীকার না করলে ইমান পূর্ণ হয় না, যাঁকে না মানলে “لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ” বলার পরও নাজাতের দরজা খোলে না, তিনি কীভাবে আমাদের মতো সাধারণ বাশার হন?

আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের নাম কালিমায় নেই। আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের রিছালাত মানা ফরজ নয়। আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের অস্বীকার করলে ঈমান নষ্ট হয় না। আর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এমন বাশার, যাঁর রিছালাত স্বীকার করা ঈমানের শর্ত। অতএব তিনি বাশার হলেও যে, আমাদের মতো সাধারণ বাশার নন এটা বাচ্চারাও বুঝবে।

এখানেই (بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ) এর সঠিক অর্থ পরিষ্কার হয়। তিনি ইলাহ নন, তিনি মাখলূক, তিনি মানবজাতির মধ্যেই তাশরীফ এনেছেন; কিন্তু উনার মাক্বাম এমন যে, উনার নাম ছাড়া কালিমা শরীফ পূর্ণ হয় না, উনার রিছালাত ছাড়া ঈমান পূর্ণ হয় না, উনার অনুসরণ ছাড়া মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার মহব্বতের দরজা খোলে না।

এখানে একটি হাদীছ শরীফ বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এক প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেনঃ (إِنِّي لَسْتُ كَهَيْئَتِكُمْ، إِنِّي أَبِيتُ يُطْعِمُنِي رَبِّي وَيَسْقِينِي) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের অবস্থার মতো নই। আমি রাত কাটাই, আমার রব আমাকে খাওয়ান এবং পান করান।

ছ্বহীহ আল বুখারী, কিতাবুস ছাওম; ছ্বহীহ মুছলিম, কিতাবুছ ছিয়াম।

এই হাদীছ শরীফ স্পষ্ট করে দেন, বাহ্যিক বাশারিয়াত আছে, কিন্তু নববী হাক্বিকত সাধারণ মানুষের মতো নয়যেখানে সাধারণ মানুষ দুর্বল, সেখানে উনার মাক্বাম আলাদাযেখানে সাধারণ মানুষ খাওয়া-পানার মুখাপেক্ষী, সেখানে উনার উপর রব্বানী ফয়েজের আলাদা তাছির আছেতাই “তিনি আমাদের মতোই” বলা হাদীছ শরীফের বিরুদ্ধেও যায়

আহলুছ ছুন্নাহর ভাষা হলো, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বাশারিয়াতের দিক থেকে মানুষ, কিন্তু হাক্বিকত, মাক্বাম, ঈলম, নূর, ওহী, ইছমত, আজ্বমত, শাফায়াত, রহমত, মর্যাদা, কুরব, খাছাইছ ও কামালাতের দিক থেকে আমাদের মতো ননতিনি আমাদের মতো হলে উনার অনুসরণ ফরজ হতো না, উনার উপর দুরূদ পাঠের হুকুম এভাবে আসত না, উনার শানে বেআদবী করলে সমস্ত নেক য়ামল নষ্ট হওয়ার ভয় আসত না

কুরআন শরীফে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ، وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ، أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ) অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ, (তোমরা যখন কথা বলো তখন) তোমাদের আওয়াজ যেনো (আমার) নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার আওয়াজের চেয়ে উর্ধ্বে না যায়এবং (তোমরা) নিজেদের মধ্যে একে অপরের সাথে যেভাবে উচ্চস্বরে (বা আদব ছাড়া) কথা বলো, অনুরূপ ভাষায়ও কথা বলনা; এমন যেনো কখনো না হয় যে তোমাদের সকল নেক য়ামল বা ইবাদত (শুধুমাত্র এই কারনেই) বরবাদ করে দেওয়া হবে, অথচ তোমরা তা জানতেও পারবেনা

ছুরাহ আল হুজুরাত - ৪৯:২

যদি নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমাদের মতো সাধারণ মানুষ হতেন, তাহলে উনার সামনে আওয়াজ উঁচু করলে য়ামল বিনষ্ট হওয়ার ভয় কেন? সাধারণ মানুষের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বললে আমল নষ্ট হয় নাকিন্তু নবীর দরবারে আদব এর খিলাফ হলে য়ামল নষ্ট হয়ে যেতে পারেএখানেই বোঝা যায়, বাশারিয়াত আছে, কিন্তু সাধারণত্ব নেইমানব রূপ আছে, কিন্তু মাক্বাম আলাদাশরীর আছে, কিন্তু নূরানী, নূরে মুহাম্মাদী ওয়ালা উনি উনার মর্যাদাই আলাদা

এই আয়াতের আসল শিক্ষা হলো, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সঙ্গে “আমাদের মতো” আচরণ করা যাবে নাউনার দরবারের আদব আলাদাউনার নামের আদব আলাদাউনার ছুন্নতের মর্যাদা আলাদাউনার ক্ববর মুবারকের আদব আলাদাউনার রওযা শরীফ সাধারণ কোন কবর নয়উনার হায়াতে বারযাখী হক্বউনার উপর উম্মতের দরূদ পেশ হয়উনার দরবারে বেয়াদবি দ্বীনের জন্য ভয়ংকর

এখনো যারা বলে, “নবী তো আমাদের মতোই বাশার,” তাদের সামনে কিছু সরল প্রশ্ন রাখা দরকার

আমরা কি মাটির নিচে ক্ববরে থাকা কোনো নবীকে দেখতে পাই, যেভাবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে ক্ববরের মধ্যে নামাযরত অবস্থায় দেখেছেন? ছ্বহীহ মুছলিমে আছে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মি’রাজের রাতে হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে ক্ববরের মধ্যে দাঁড়িয়ে নামায পড়তে দেখেছেনআমরা কি এমন দেখতে পাই? নাতাহলে তিনি আমাদের মতো দৃষ্টিসীমার মানুষ কীভাবে?

আমরা কি ক্ববরবাসীর শাস্তি দেখতে বা শুনতে পাই, যেভাবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম দুই ক্ববরবাসীর শাস্তির খবর দিয়েছেন? ছ্বহীহ হাদীছে এসেছেন, তিনি দুই ক্ববরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে বললেন, তাদের শাস্তি হচ্ছেএকজন প্রস্রাব থেকে বাঁচত না, আরেকজন চুগলখোরি করতআমরা কি ক্ববরের ভিতরের এই হাল দেখতে বা জানতে পারি? নাতাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে?

আমরা কি ফেরেশতা দেখতে পাই? রেওয়ায়েতে এসেছেন, কোনো কোনো জানাযা ও বিশেষ মুহূর্তে এত ফেরেশতা নাযিল হয়েছেন যে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম পা রাখার জায়গা না পেয়ে পা টিপে টিপে চলেছেনআমরা কি ফেরেশতার নুযূল দেখি? আমাদের চোখ কি সেই নূরানী জগত দেখতে পারে? নাতাহলে আমাদের চোখ উনার চোখের মতো কীভাবে?

আমরা কি অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া, বাহ্যিক যানের সীমাবদ্ধতা ছাড়া, আনলিমিটেড গতিতে স্পেসস্যুট ছাড়া মহাশূন্য অতিক্রম করে আসমানের বাইরে গিয়ে, ছিদরাতুল মুনতাহার মাক্বাম পর্যন্ত গিয়ে, আবার মুহূর্তের মধ্যে ফিরে আসতে পারি? রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মি’রাজে গিয়েছেনতিনি মাছযিদুল হারাম থেকে মাছযিদুল আক্বছা, সেখান থেকে আসমানসমূহ, তারপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কুরবের মাক্বামে গিয়েছেন, যেখানে ফেরেশতাদের সর্দার যাওয়ার সাহস করেন নাই ভয়ে যে ১ ইঞ্চি আগালে পুড়ে যাবেনআমরা কি তা পারি, পারবো? নাতাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে?

আমরা কি দুনিয়ায় বসে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখতে পাই? ছ্বহীহ হাদীছে এসেছে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নামাযে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেছেনতিনি জান্নাতের আঙ্গুরের একটি থোকা ধরতে হাত বাড়িয়েছিলেন, পরে তা ছেড়ে দিয়েছেনআমরা কি দুনিয়ার চোখে জান্নাতের ফল দেখতে পাই? আমরা কি জাহান্নামের দৃশ্য দেখতে পাই? আমাদের হাত কি মদিনা থেকে বাড়ালে জান্নাতের ফল ধরতে পারবে? নাতাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে?

আমরা কি উনার মতো সামনে ও পেছনে দেখতে পাই? ছ্বহীহ হাদীছে এসেছে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, আমি আমার পেছনেও দেখি, যেমন সামনে দেখিআমরা কি ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিশক্তির মালিক? আমরা কি পেছনের দৃশ্য সামনে দেখার মতো দেখতে পাই? নাতাহলে আমাদের দৃষ্টি উনার দৃষ্টির মতো কীভাবে?

আমরা কি আসমানের সেই শব্দ শুনতে পাই, যা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম শুনেছেন? হাদীছ শরীফে এসেছেন, তিনি বলেছেন, আমি যা দেখি, তোমরা তা দেখ না; আমি যা শুনি, তোমরা তা শুন নাআসমান কড়মড় শব্দ করছে, আর তার জন্য তা করা যথার্থ; কারণ সেখানে চার আঙুল জায়গাও নেই, যেখানে কোনো ফেরেশতা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জন্য সিজদা বা ক্বিয়ামে নেইআমরা কি এই শব্দ শুনি? নাতাহলে আমাদের শ্রবণশক্তি উনার শ্রবণশক্তির মতো কীভাবে?

এই প্রশ্নগুলো কোনো অতিরঞ্জন নয়এগুলো রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার খাছাইছ ও মো’জেজার দরজাতিনি বাশার, কিন্তু এমন বাশার, যার দৃষ্টি সাধারণ দৃষ্টি নয়, যার শ্রবণ সাধারণ শ্রবণ নয়, যার মি’রাজ সাধারণ সফর নয়, যার হাল সাধারণ মানুষের হাল নয়, যার কুরব সাধারণ মাখলূকের কুরব নয়

যারা বলে, “নবী তো আমাদের মতো বাশার,” তাদের ভুল হলো, তারা বাশার শব্দ ধরে নবুওয়ত, ওহী, ইছমত, নূর, রহমত, শাফায়াত, আদব, খাছাইছ সব ঢেকে দিতে চায়অথচ ক্বুরআনের ভাষা ভারসাম্যপূর্ণএকদিকে বলেন, তিনি বাশার, যাতে কেউ উনাকে খোদা না বানায়অন্যদিকে বলে, তিনি রহমাতুল্লিল য়ালামীন, যাতে কেউ উনাকে সাধারণ না বানায়একদিকে বলেন, উনার প্রতি ওহী আসেঅন্যদিকে বলেন, উনার অনুসরণ করলে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ভালোবাসবেনঃ (قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللهَ، فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ) অর্থাৎ, বলুন, যদি তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে ভালোবাস, তবে আমাকে অনুসরণ করো, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের ভালোবাসবেন

ছুরাহ আলে ইমরান - ৩:৩১

মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার মুহব্বতের দরজা নবীর অনুসরণের সঙ্গে যুক্ততাহলে তিনি কি সাধারণ বাশার? নাতিনি সেই বাশার, যাঁর অনুসরণ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার মুহব্বতের দরজাতিনি সেই বাশার, যাঁর ছুন্নত দুনিয়া ও আখিরাতের নাজাততিনি সেই বাশার, যাঁর নামের সঙ্গে দুরূদ ছাড়া মুমিনের জবান পূর্ণ আদব পায় না

এখন মূল সিদ্ধান্ত হলোঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বাশার, কারণ কুরআন শরীফে আছেকিন্তু তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার নন, কারণ কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা, আদব, নবুওয়ত, ওহী, ইছমত, আজ্বমত খাছাইছ এবং উনার মাক্বাম সবই প্রমাণ করেন যে তিনি ছাইয়্যিদুল বাশার

বাশারিয়াত মানলে ঈমান ঠিক থাকেসাধারণত্ব চাপালে আদব নষ্ট হয়উনাকে খোদা বানানো কুফর, আর উনাকে নিজের মতো সাধারণ বানানো গোস্তাখীআহলুছ ছুন্নাহ এই দুই বাতিল পথের মাঝখানে হক্বের পথ ধরে: তিনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বান্দা ও রছুল, তিনি নূরে মুজাসসাম, তিনি ছাইয়্যিদুল আম্বিয়া, তিনি রহমতুল্লিল য়ালামীন, তিনি আফদ্বলুল খালক্ব, তিনি আমাদের মতো নন

তাই যে কেউ কাহাফের শেষ আয়াত এর প্রথম অংশ পড়ে যদি বলে, “নবী আমাদের মতো,” তাহলে তাকে বলা হবেঃ আয়াত পুরো পড়ুন (يُوحَىٰ إِلَيَّ) দেখুনঅন্য আয়াতগুলোও দেখুনদুরূদের আয়াত শরীফ দেখুনআদবের আয়াত শরীফ দেখুন“নবী মুমিনদের নিজের প্রাণের চেয়েও অধিক অধিকারী” আয়াত শরীফ দেখুন“রহমাতাল্লিল য়ালামীন” আয়াত শরীফ দেখুন“সমগ্র জগতের নাজীর” আয়াত শরীফ দেখুনমি’রাজ শরীফ দেখুনক্ববরের হাল জানা দেখুনফেরেশতার নুযূল দেখুনজান্নাত জাহান্নাম দেখুনসামনে-পেছনে দেখার খাসিয়্যাত দেখুনআসমানের শব্দ শুনার খাসিয়্যাত দেখুনতারপর বুঝবেন, আয়াতের উদ্দেশ্য নবীর মাক্বাম কমানো নয়, বরং উনাকে খোদা বানানোর পথ বন্ধ করে নবুওয়তের মাক্বামে প্রতিষ্ঠা করা

এখন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার দোয়া-আন-নূরের দীর্ঘ রেওয়ায়েতের একটি সূক্ষ্ম শব্দের দিকে লক্ষ্য করুন। দোয়ার এসেছেঃ (أَللّٰهُمَّ أَعْطِنِي نُورًا، وَاجْعَلْ فِي عَصَبِي نُورًا، وَفِي لَحْمِي نُورًا، وَفِي دَمِي نُورًا، وَفِي شَعْرِي نُورًا، وَفِي بَشَرِي نُورًا) অর্থাৎ, হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আপনি আমাকে নূর দান করুন; আমার স্নায়ুকে নূর বানিয়ে দিন, আমার গোশতকে নূর বানিয়ে দিন, আমার রক্তকে নূর বানিয়ে দিন, আমার চুলকে নূর বানিয়ে দিন, আর আমার বাশারকে (অর্থাৎ আমার চামড়া ও বাহ্যিক মানবীয় আবরণকেও) নূর বানিয়ে দিন

এখানে بَشَرِي শব্দটি খুব গুরুত্বপূর্ণরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজেই যখন বলেনঃ (وَفِي بَشَرِي نُورًا) তখন বুঝা যায়, بَشَر শব্দের একটি প্রকাশ্য অর্থ হলো মানুষের বাহ্যিক দেহাবরণ, চামড়া, দেহগত মানবীয় রূপঅতএব কুরআন শরীফে যখন বলা হয়ঃ (قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ) অর্থাৎ, (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি বলুন, আমি তো তোমাদের মতো একজন বাশার, তবে আমার ওপর ওহী নাজিল করা হয়

ছুরাহ আল কাহফ - ১৮:১১০

তখন এর অর্থ এই নয় যে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমাদের মতো সাধারণ মানুষ। বরং এর অর্থ হলো, উনি ইলাহ নন, উনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার যাতের অংশ নন, উনি ফেরেশতা নন; উনি মানবজাতির মধ্যেই বাশারিয়াতের বাহ্যিক পোশাকে তাশরীফ এনেছেন। কিন্তু সেই বাশারিয়াতও সাধারণ বাশারিয়াত নয়। কারণ উনার নিজের দোয়া মুবারকেই আছে, উনার স্নায়ুতে নূর, গোশতে নূর, রক্তে নূর, চুলে নূর, এমনকি উনার بَشَر বা বাহ্যিক দেহাবরণেও নূর।

তাই “বাশার” শব্দ দিয়ে উনার মাক্বাম কমানো যায় নাবরং বলা হবে, উনি বাশার, কিন্তু নূরানী বাশারউনি মানুষ, কিন্তু ছাইয়্যিদুল বাশারউনি মাখলূক, কিন্তু আফদ্বলুল মাখলূকউনি বান্দা, কিন্তু আবদে খাছউনি আমাদের মতো দেহধারী মানব রূপে তাশরীফ এনেছেন, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের অন্তর্ভুক্ত নন; কারণ আমাদের উপর ওহী আসে না, আমাদের বাশারিয়াত নূরে মুহাম্মদীর মাক্বামে নয়, আমাদের দেহ দ্বীনের উৎস নয়, আমাদের জীবন শরীয়তের মাপকাঠি নয়

অতএব (بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ) এর উদ্দেশ্য হলো তাওহীদ রক্ষা করা: যেন কেউ উনাকে ইলাহ না বানায়আর (يُوحَىٰ إِلَيَّ) এর উদ্দেশ্য হলো নবুওয়তের মাক্বাম প্রতিষ্ঠা করাঃ যেন কেউ উনাকে সাধারণ মানুষ না বানায়দোয়া-আন-নূরের ভাষা এই হাক্বিকতকে আরও স্পষ্ট করে দেন যে, নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বাশারিয়াতও নূরানী, উনার মানবীয় রূপও রব্বানী অতার আলোয় মুবারক, আর উনার বাহ্যিক দেহাবরণও সাধারণ মানুষের মতো নয়

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মানুষ, কিন্তু এমন মানুষ, যার মতো কোনো মানুষ নেইতিনি বাশার, কিন্তু বাশারিয়াতের সর্দারতিনি মাখলূক, কিন্তু মাখলূকের শ্রেষ্ঠজনতিনি বান্দা, কিন্তু য়াবদে কামিলতিনি রছুল, কিন্তু ছাইয়্যিদুল মুরছালীনতিনি নবী, কিন্তু খতামুন নাবিয়্যীনতিনি আমাদের মতো নন; বরং আমাদের ইমান, আমাদের য়ামল, আমাদের নাজাত, আমাদের মহব্বত, আমাদের আদব, সবকিছু উনার দরবারের সঙ্গে যুক্ত

এটাই আহলুছ ছুন্নাহর আক্বীদাএটাই আদবের পথএটাই ঈমানের নিরাপদ সীমা

Tuesday, July 14, 2026

দেওবন্দীদের আরেক ধোঁকাঃ তাহলে ইমাম আবূ হানীফা রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার স্বপ্নের তাবীরকারীও কি খারাপ?

দেওবন্দীদের আরেক ধোঁকাঃ তাহলে ইমাম আবূ হানীফা রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার স্বপ্নের তাবীরকারীও কি খারাপ?

দেওবন্দী পক্ষ আশরাফ আলী থানভীর আত্মপ্রশংসামূলক তাবীরকে রক্ষা করার জন্য হযরত ইমামে আযম আবূ হানীফা রদ্বিল্লাহু য়ানহু উনার একটি স্বপ্নের ঘটনা সামনে আনেতারা বলতে চায়ঃ

হযরত ইমাম আবু হানীফা রহঃ একদা স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি রাসূল সাঃ এর মাযারে পৌছলেনসেখানে পৌছে তিনি রাসুল সাৰ এর কবর মুবারক ভেঙ্গে ফেললেন। [আল্লাহ হিফাযত করুন]এ মারাত্মক ও পেরেশানী উদ্দীপক স্বপ্নটি তিনি তার উস্তাদকে জানালেনসে সময় ইমাম সাহেব রহঃ মক্তবে পড়ছিলেনতখন তার উস্তাদ বললেন-যদি সত্যিই তুমি এ স্বপ্ন দেখে থাক, তাহলে এর ব্যাখ্যা হল-তুমি রাসুল সাঃ এর হাদীসের অনুসরণ করবেআর শরীয়তে মুহাম্মদী সাঃ কে পরিপূর্ণ তথ্য-তালাশ করে গবেষণা করবেব্যাস! যেভাবে উস্তাদ বলেছিলেন সে ব্যাখ্যাটি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছিল{তাবীরুর রুউআ-১০৮, আকবর বুক ডিপো}

উক্ত অনুবাদ দিয়ে বলে তাহলে থানভীর তাবীরকে খারাপ বলা হলে ইমামে আযমের তাবীরকারীকেও খারাপ বলতে হবে অথচ ইমামে আযম স্বপ্নে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ক্ববর শরীফ খুঁড়েছিলেনআর এর ভালো তাবীর করা হয়েছিল, কোন কালে কেউ কোন আপত্তিই তোলেনিএটি সম্পূর্ণ ভুল তুলনাপ্রথমে ঘটনাটির সঠিক বর্ণনা জানা প্রয়োজন

উপরোক্ত প্রচারিত বর্ণনাটিতে কয়েকটি ভুল রয়েছে

প্রচারিত বাংলা বর্ণনায় বলা হয়ঃ

১) ঘটনাটি ইমামে আযম রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার মক্তবে পড়ার সময় ঘটেছিল;
২) তিনি উনার মক্তবের উস্তাদকে স্বপ্নটি বলেছিলেন;
৩) তিনি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার “কবর ভেঙে ফেলেছিলেন”;
৪) উনার উস্তাদ তাবীর করেছিলেন।

কিন্তু প্রাচীন সূত্রে সংরক্ষিত মূল বর্ণনায় এসব কথা এভাবে নেই আল-খতীব আল-বাগদাদী তারীখে বাগদাদ-নদসহ বর্ণনা করেনঃ (سَمِعْتُ أَبَا حَنِيفَةَ يَقُولُ: رَأَيْتُ رُؤْيَا فَأَفْزَعَتْنِي، رَأَيْتُ كَأَنِّي أَنْبِشُ قَبْرَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَتَيْتُ الْبَصْرَةَ، فَأَمَرْتُ رَجُلًا يَسْأَلُ مُحَمَّدَ بْنَ سِيرِينَ، فَسَأَلَهُ، فَقَالَ: هَذَا رَجُلٌ يَنْبِشُ أَخْبَارَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ)

অর্থাৎ: হযরত ইমামে আযম আবূ হানীফা রদ্বিয়াল্লাহু য়ানহু বলেছেন, “আমি এমন একটি স্বপ্ন দেখলাম যা আমাকে ভীত করে দিয়েছিলআমি দেখলাম, যেন আমি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার কবর শরীফ মুবারক খুঁড়ছিআমি বসরায় গিয়ে একজন লোককে মুহাম্মাদ ইবনে ছীরীন রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনার কাছে স্বপ্নটির তাবীর জিজ্ঞেস করতে পাঠালামতিনি বললেন, ‘এ ব্যক্তি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সংবাদ ও বর্ণনাগুলো গভীরভাবে অনুসন্ধান করবে’”

একই মূল বক্তব্য ইমাম যাহাবী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি ছিয়ারু আলামিন নুবালা-তেও উদ্ধৃত করেছেনঅতএব, নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় তাবীরকারী কোনো অজ্ঞাত মক্তবের উস্তাদনন; তিনি প্রসিদ্ধ তাবিয়ি ও স্বপ্নতাবীরবিদ হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ছীরীন রহমতুল্লাহি য়ালাইহিইমামে আযম সরাসরি তার ছাত্র ছিলেন বা ঘটনাটি মক্তবের বয়সে ঘটেছিল, মূল বর্ণনায় তা বলা হয়নিবরং তিনি একজনকে ইবনে ছীরীন রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনার কাছে পাঠিয়েছিলেন

কবর ভেঙে ফেললেন এ অনুবাদও ভুল

মূল আরবি শব্দ হলোঃ (أَنْبِشُ قَبْرَ النَّبِيِّ) এখানে (نَبْشُ الْقَبْرِ) অর্থ কবর খোঁড়া, উন্মোচন করা বা ভেতরে যা রয়েছে তা বের করার উদ্দেশ্যে মাটি সরানোএর সরাসরি অর্থ কবর ভেঙে ধ্বংস করে দেওয়ানয়আরবি অভিধানেও (نَبْشُ الْقَبْرِ)-এর অর্থ দেওয়া হয়েছেঃ (حَفَرَهُ لِاسْتِخْرَاجِ مَا فِيهِ) অর্থাৎ, “ভেতরে যা আছে তা বের করার উদ্দেশ্যে কবরটি খুঁড়ল

কবর ভেঙে ফেললেনবললে ইচ্ছাকৃত ধ্বংস ও অবমাননার অর্থ তৈরি হয় যা দেওবন্দী বাটপারেরা ইচ্ছেকৃত অনুবাদ করেছে যাতে তাদের বাবা আশরাফকে বাঁচানো যায় অথচ মূল রেওয়ায়েতে সেই শব্দ ব্যবহার করা হয়নি

হযরত ইবনে ছীরীন রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনার তাবীর কেন সঠিক ছিল?

স্বপ্নের বাক্য এবং তাবীরের বাক্য পাশাপাশি রাখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবেঃ (أَنْبِشُ قَبْرَ النَّبِيِّ) “আমি নবীজী উনার কবর মুবারক খুঁড়ছি।”

তাবীরঃ (يَنْبِشُ أَخْبَارَ رَسُولِ اللهِ) “সে রছুলে পাক উনার বর্ণনা ও সংবাদ গভীরভাবে অনুসন্ধান করবে।”

দুই বাক্যেই একই ক্রিয়ামূল ব্যবহৃত হয়েছেঃ نَبَشَ - يَنْبِشُ এর অর্থ হলোঃ মাটির নিচে ঢাকা কোনো বস্তু খুঁজে বের করার মতো গভীরভাবে অনুসন্ধান করা।

স্বপ্নে কবর মুবারক খোঁড়ার দৃশ্যটি ছিল একটি প্রতীক। ইবনে ছীরীন রহমতুল্লাহি য়ালাইহি সেই প্রতীকের সরাসরি ভাষাগত সম্পর্ক ধরে তাবীর করেছেনঃ কবরের ভেতর অনুসন্ধান করা রছুলে পাক উনার রেখে যাওয়া সংবাদ, আছার ও হাদীছ শরীফ গভীরভাবে অনুসন্ধান করা। এখানে তাবীরকারী কবর খোঁড়াকে বাস্তবে জায়েয বা প্রশংসনীয় বলেননি, না নিজের কোন শান, বা নিজে নবীজির মনোনীত কেউ প্রমান করে নিজেকে জাহির করতে চেয়েছেন। তিনি স্বপ্নের প্রতীকী অর্থ প্রকাশ করেছেন মশহুর তাবিরকারক হিসেবে।

থানভীর ঘটনার সঙ্গে মৌলিক পার্থক্য

প্রথম পার্থক্যঃ একটি প্রতীকী দৃশ্য, অন্যটি স্পষ্ট আক্বীদাগত শব্দ

ইমামে আযম রদ্বিল্লাহু য়ানহু উনার স্বপ্নে কোনো মানুষকে নবী”, “রছুলুল্লাহবা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিকল্প বলা হয়নিতিনি একটি প্রতীকী কাজের দৃশ্য দেখেছিলেন কবর খোঁড়া

কিন্তু থানভীর ঘটনায় স্পষ্টভাবে কালিমার মধ্যেঃ (مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ)-এর পরিবর্তে আশরাফ আলীর নাম উচ্চারিত হয়েছে এবং দুরূদের মধ্যে তাকেঃ (سَيِّدِنَا وَنَبِيِّنَا وَمَوْلَانَا) অর্থাৎ, “আমাদের নেতা, আমাদের নবী ও আমাদের মাওলাবলা হয়েছে

অতএব একটি প্রতীকী দৃশ্য এবং একটি স্পষ্ট নবুওয়াতসূচক বাক্য এক বিষয় নয়

দ্বিতীয় পার্থক্যঃ ইবনে ছীরীন নিজের সার্টিফিকেট তৈরি করেননি

হযরত ইবনে ছীরীন রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি স্বপ্নের মধ্যে নিজে উপস্থিত ছিলেন নাউনার নাম রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নামের স্থানে বসানো হয়নিতিনি তাবীর করে নিজের কোনো মর্যাদা, বুযুর্গি বা ছুন্নাত অনুসরণের সার্টিফিকেট গ্রহণ করেননি তিনি অন্য একজন ব্যক্তির স্বপ্নের তাবীর করেছেন এবং তার ফলও অন্য ব্যক্তির দিকে ফিরেছে

কিন্তু থানভীর ঘটনায়ঃ

১) থানভীর নিজের নাম রছুলে পাক উনার নামের স্থানে উচ্চারিত হয়েছে;
২) থানভীর নিজের নামের সঙ্গে “আমাদের নবী” শব্দ যুক্ত হয়েছে;
৩) থানভী নিজেই তার তাবীর করেছে;
৪) এবং তাবীরের ফলও নিজের প্রশংসার দিকে ফিরিয়েছে।

অর্থাৎ, থানভী নিজেই ঘটনার সুবিধাভোগী, নিজেই তাবীরকারী এবং নিজেই নিজের জন্য সার্টিফিকেটদাতা

তৃতীয় পার্থক্যঃ ইবনে ছীরীনের তাবীরে সুস্পষ্ট ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে

কবর খোঁড়া এবং হাদীছ-আছার খুঁজে বের করা উভয়ের মধ্যে অনুসন্ধান ও গুপ্ত বিষয় উদ্ঘাটনের একটি পরিষ্কার ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে

কিন্তু “আশরাফ আলী রছুলুল্লাহ” অথবা “আমাদের নবী আশরাফ আলী” থেকে কীভাবে - “আশরাফ আলী ছুন্নতের অনুসারী” এই তাবীর বের হলো?

এর মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট ভাষাগত, ক্বুরআনী, হাদীছভিত্তিক বা স্বীকৃত তাবীরশাস্ত্রীয় সম্পর্ক দেখানো হয়নি। থানভী শুধু নিজের পক্ষে একটি ইতিবাচক অর্থ ঘোষণা করেছে।

চতুর্থ পার্থক্যঃ ইমামে আযম নিজেই আতঙ্কিত হয়েছিলেন

মূল বর্ণনায় হযরত ইমামে আযম রদ্বিল্লাহু য়ানহু বলেছেনঃ (رَأَيْتُ رُؤْيَا فَأَفْزَعَتْنِي) আমি এমন একটি স্বপ্ন দেখেছিলাম, যা আমাকে ভীত করে দিয়েছিল তিনি স্বপ্নটি দেখে আনন্দিত হননি, নিজের শ্রেষ্ঠত্বের দলিল বানাননি এবং বলেননিঃ এতে আমার জন্য সান্ত্বনা আছে যে আমি বড় ছুন্নাতের অনুসারী বরং তিনি ভয় পেয়েছেন এবং নিজের পরিচয় গোপন রেখে একজন বিজ্ঞ তাবীরকারীর কাছে এর ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন অন্যদিকে থানভী তার নিজের নামকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ভয়াবহ ঘটনাটির মধ্যে নিজের জন্য তাসল্লীও প্রশংসা খুঁজে পেয়েছে

পঞ্চম পার্থক্যঃ ইবনে ছীরীনের ব্যাপারে পূর্ণ কথোপকথন সংরক্ষিত হওয়ার দাবি নেই

হযরত ইবনে ছীরীন রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনার ঘটনা একটি ঐতিহাসিক রেওয়ায়েত হিসেবে সংক্ষেপে উদ্ধৃত হয়েছেসেখানে মূলত স্বপ্ন ও তাবীরটি সংরক্ষিত হয়েছেতিনি এর আগে বা পরে ইস্তিআযাহ, নছিহত কিংবা অন্য কোনো কথা বলেছেন কি না বর্ণনাটিতে তা আলোচনাই করেনি সুতরাং শুধু সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক রেওয়ায়েতে কোনো কথা উল্লেখ না থাকায় বলা যাবে নাঃ ইবনে ছীরীন নিশ্চয়ই ইস্তিআযাহ করেননি বা সতর্ক করেননি কিন্তু থানভীর ক্ষেত্রে আমাদের সামনে তার নিজের প্রকাশিত লিখিত উত্তর রয়েছেপ্রশ্নের জবাবে সে কী বলেছিল, তা তার নিজের সম্পাদিত আল-ইমদাদ-এ ছাপা হয়েছেএ ঘটনায় সান্ত্বনা রয়েছে যে, যার দিকে তুমি প্রত্যাবর্তন করছ, তিনি মহান আল্লাহ তায়ালার সাহায্যে ছুন্নতের অনুসারী অতএব, একটি সংক্ষিপ্ত জীবনীমূলক রেওয়ায়েত এবং থানভীর নিজের প্রকাশিত উত্তরকে একই মানদণ্ডে বিচার করা যাবে না

সহজ উদাহরণে পার্থক্য

এক ব্যক্তি স্বপ্ন দেখল, সে একটি বন্ধ গ্রন্থাগারের দরজা ভেঙে ভেতরের বই বের করছে তাবীরকারী বললঃ তুমি অজানা ইলম অনুসন্ধান করে মানুষের সামনে প্রকাশ করবে এখানে দরজা ভাঙাকে বাস্তবে জায়েয বলা হয়নিদৃশ্যটির প্রতীকী অর্থ করা হয়েছে

কিন্তু অন্য একজন বললঃ আমি স্বপ্নে আপনার নামকে নবীর নামের জায়গায় উচ্চারণ করেছি এবং আপনাকে আমাদের নবী বলেছি সেই ব্যক্তি যদি উত্তর দেয়ঃ এতে প্রমাণিত হলো আমি ছুন্নতের অনুসারী তাহলে এটি আগের ঘটনার মতো নয়এখানে সে নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত ভয়াবহ বাক্যকে প্রত্যাখ্যান না করে সেই বাক্য থেকেই নিজের প্রশংসা বের করেছে

দেওবন্দীদের যুক্তির অন্তর্নিহিত প্রতারণা

তাদের যুক্তি হলোঃ ইবনে ছীরীন একটি বাহ্যিকভাবে ভয়ংকর স্বপ্নের ভালো তাবীর করেছেনঅতএব থানভীর যেকোনো ভালো তাবীরও সঠিক এ যুক্তি গ্রহণ করলে যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো ভয়াবহ স্বপ্নের নিজের পছন্দমতো প্রশংসামূলক তাবীর দিতে পারবে

সঠিক নিয়ম হলোঃ কোনো কোনো ভয়ংকর স্বপ্নের ভালো তাবীর হতে পারে; কিন্তু প্রতিটি নির্দিষ্ট তাবীরের পক্ষে অর্থগত সম্পর্ক, শরয়ী সামঞ্জস্য এবং তাবীরকারীর নিরপেক্ষতা থাকতে হবে

ইবনে ছীরীনের তাবীরে তিনটিই রয়েছেঃ

১) স্বপ্নের প্রতীকের সঙ্গে তাবীরের সরাসরি ভাষাগত সম্পর্ক;
২) কোনো কুফরি আক্বীদার অনুমোদন নেই;
৩) তাবীরকারীর ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আত্মপ্রশংসা নেই।

থানভীর তাবীরে এগুলোর কোনোটিই পরিষ্কারভাবে নেইঃ

১) নবুওয়াতসূচক শব্দ থেকে “ছুন্নত অনুসরণ”-এর নির্দিষ্ট সম্পর্ক দেখানো হয়নি;
২) কুফরি অর্থবোধক শব্দগুলো প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করা হয়নি;
৩) তাবীরটি সরাসরি থানভীর নিজের প্রশংসা ও মর্যাদার সার্টিফিকেটে পরিণত হয়েছে।

তাদের কাছে পাল্টা প্রশ্ন

দেওবন্দীদের জিজ্ঞেস করছিঃ ইবনে ছীরীন রহমতুল্লাহি য়ালাইহি কি স্বপ্নে নিজের নামকে রছুলে পাক উনার নামের স্থানে শুনেছিলেন?

না

তিনি কি নিজেকে আমাদের নবীউচ্চারণ করার ঘটনাকে নিজের প্রশংসায় ব্যবহার করেছিলেন?

না

তিনি কি নিজের বিষয়ে নিজেই সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন?

না

কবর খোঁড়াহাদীছ অনুসন্ধান”-এর মধ্যে ভাষাগত সম্পর্ক আছে?

হ্যাঁ

আশরাফ আলী রছুলুল্লাহআশরাফ আলী ছুন্নতের অনুসারী এর মধ্যে সেই ধরনের প্রতিষ্ঠিত ভাষাগত সম্পর্ক কোথায়?

তারা দেখাতে পারেনি অতএব, হযরত ইমামে আযম আবূ হানীফা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার স্বপ্নের ঘটনা থানভীর প্রতিরক্ষা নয়বরং দুটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে থানভীর আচরণের অসংগতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে

চূড়ান্ত জবাব

হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ছীরীন রহমতুল্লাহি য়ালাইহি একটি প্রতীকী স্বপ্নদৃশ্যের নিরপেক্ষ ও ভাষাগতভাবে সম্পর্কযুক্ত তাবীর করেছিলেনতিনি কোনো কুফরি বাক্যকে অনুমোদন করেননি, নিজের নামকে নবুওয়াতের স্থানে বসাননি এবং স্বপ্নটিকে নিজের আধ্যাত্মিক সার্টিফিকেটও বানাননিপক্ষান্তরে আশরাফ আলী থানভী নিজের নামকে রছুলুল্লাহআমাদের নবীশব্দের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘটনাকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান না করে নিজের মুতাবিয়ে ছুন্নতহওয়ার সান্ত্বনা বানিয়েছেঅতএব, দুটি ঘটনাকে এক বলা জাহালত অথবা ইচ্ছাকৃত ধোঁকাবাজি

আর প্রচারিত মক্তবের উস্তাদকবর ভেঙে ফেললেনবর্ণনাটি মূল প্রাচীন রেওয়ায়েতের হুবহু বক্তব্য নয়মূল সূত্রে তাবীরকারী হলেন হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ছীরীন রহমতুল্লাহি য়ালাইহি এবং ব্যবহৃত শব্দের অর্থ কবর খোঁড়া বা উন্মোচন করা ধ্বংস করে ফেলানয়

মহান আল্লাহ তায়ালা দেওবন্দি নফছের পূজারী, গ্বইরুল্লাহকে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার চেয়ে বেশী মুহব্বতকারীদের থেকে আমাদের সবাইকে হেফাজতে রাখুন। আমীন।