Friday, March 20, 2026

ক্বুরআন-ছুন্নাহ অনুসারে জাকাত না দেওয়ার কঠিন পরিণতি

ক্বুরআন-ছুন্নাহ অনুসারে জাকাত না দেওয়ার কঠিন পরিণতি

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বান্দাকে সম্পদ দান করেন পরীক্ষার জন্যসম্পদ নিজে কোনো সফলতা নয়; বরং সফলতা হলো সেই সম্পদের হক্ব আদায় করাআর সেই হক্বের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ফরজ ঈবাদত হলো জাকাতজাকাত কোনো দয়া নয়, বরং এটি অসহায় ও বঞ্চিতদের নির্ধারিত অধিকার যা মহান আল্লাহ তা’য়ালা ধনীদের সম্পদের মধ্যে ফরজ করে দিয়েছেনযারা এই ফরজ আদায়ে অবহেলা করে, তাদের জন্য ক্বুরআন ও ছুন্নায় অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছেমূলত গরীবের হক্বটাই মহান আল্লাহ তায়ালা ধনীদের দিয়ে দেন যাতে তারা সেই আমানত তার প্রাপকের কাছে নফছের তাজকিয়ার জন্যে দিয়ে দেয়অধিকাংশ মানুষ ভাবে জাকাত মহান আল্লাহ পাক ফরজ করেছেন তাই দিতে হবে, কিন্তু ফরজ কেন, আর কিভাবে সঠিকভাবে দিতে হবে তারা সেটাই জানেনা (এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এটা পড়ুন)

প্রথমতো যারা মোটেও জাকাত দেয়না তাদের বিষয়ে পবিত্র আল-ক্বুরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছুরাহ আত-তাওবার মধ্যে স্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেনঃ (وَ الَّذِیۡنَ یَكۡنِزُوۡنَ الذَّهَبَ وَ الۡفِضَّۃَ وَ لَا یُنۡفِقُوۡنَهَا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ۙ فَبَشِّرۡهُمۡ بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ یَّوۡمَ یُحۡمٰی عَلَیۡهَا فِیۡ نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكۡوٰی بِهَا جِبَاهُهُمۡ وَ جُنُوۡبُهُمۡ وَ ظُهُوۡرُهُمۡ ؕ هٰذَا مَا كَنَزۡتُمۡ لِاَنۡفُسِكُمۡ فَذُوۡقُوۡا مَا كُنۡتُمۡ تَكۡنِزُوۡنَ) আর যারা সোনা-রূপা জমা করে রাখে এবং তা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে ব্যয় করে না, আপনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিনক্বিয়ামতের দিন (তাদের) সেই সম্পদ যাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে, তারপর তা দিয়ে তাদের কপাল, পার্শ্ব ও পিঠ দগ্ধ করা হবে; (এবং বলা হবে) এটাই তো (তোমার) সেই সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য জমিয়ে রেখেছিলে; সুতরাং এখন আস্বাদন করো তার স্বাধ যা তোমরা সঞ্চয় করতে”। (ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:৩৪-৩৫)

এ আয়াতে পাকে জমাকৃত স্বর্ণ ও রৌপ্যকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশ দগ্ধ করার যে কঠোর সাজার উল্লেখ রয়েছে, তা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তার এ সাজা তারই অর্জন করাঅর্থাৎ যে অর্থ সম্পদ অবৈধ পন্থায় জমা করা হয়, কিংবা বৈধ পন্থায় জমা করলেও তার জাকাত আদায় করা না হয়, সে সম্পদই তার জন্য আযাবের কারণ হয়হাদীছ শরীফে এসেছেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যারা সম্পদ পুঞ্জীভূত করে রাখে তাদেরকে সেই যাহান্নামের উত্তপ্ত পাথরের ছেকার সুসংবাদ দিন, যা যাহান্নামের আগুনের দ্বারা দেয়া হবেযা তাদের কারও স্তনের বোঁটার মধ্যে রাখা হবে, আর তা বের হবে দু কাঁধের উপরিভাগেআর দু কাঁধের উপরিভাগে রাখা হবে যা স্তনের বোঁটার মধ্য দিয়ে বের হবে। (মুছলিম শরীফ ৯৯২)

কোন কোন মুফাছছির বলেনঃ এ আয়াতে যে ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশ দগ্ধ করার উল্লেখ এজন্যে করা হয়েছে যে, যে কৃপন ব্যক্তি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাহে খরচ করতে চায় না, তার কাছে যখন কোন ভিক্ষুক কিছু চায়; কিংবা ছ্বদকা তলব করে, তখন সে প্রথমে ভ্রুকুঞ্চন করে, তারপর পাশ কাটিয়ে তাকে এড়িয়ে যেতে চায়এতেও সে ক্ষান্ত না হলে তাকে পৃষ্ঠ দেখিয়ে চলে যায়এজন্যে বিশেষ করে এ তিন অঙ্গে আযাব দানের উল্লেখ করা হয়েছে। (তাফছীরে কুরতুবী)

আব্দুল্লাহ বিন উমার রদ্বিআল্লাহু আনহু বলেন যে, এটা জাকাত ফরয হওয়ার পূর্বের আদেশযাকাতের হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার পর জাকাত দ্বারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা মাল-সম্পদকে পবিত্র করার মাধ্যম বানিয়েছেনএই জন্য য়ু’লামাগণ বলেন, যে মাল থেকে জাকাত বের করা হবে সে মাল (আয়াতে নিন্দনীয়) ‘জমা করে রাখা’ মাল নয়আর যে মাল থেকে জাকাত বের করা হবে না, সে মালই হবে ‘জমা করে রাখা’ ধনভান্ডার; যার জন্য রয়েছে এই ক্বুরআনী ধমকসুতরাং হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘‘প্রত্যেক সোনা ও চাঁদীর অধিকারী ব্যক্তি যে তার হক্ব (জাকাত) আদায় করে না, যখন ক্বিয়ামতের দিন আসবে তখন তার জন্য ঐ সমুদয় সোনা-চাঁদীকে আগুনে দিয়ে বহু পাত তৈরী করা হবেঅতঃপর সেগুলোকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তার পাঁজর, কপাল ও পিঠে দাগা হবেযখনই সে পাত ঠান্ডা হয়ে যাবে তখনই তা পুনরায় গরম করে অনুরূপ দাগার শাস্তি সেই দিনে চলতেই থাকবে যার পরিমাণ হবে ৫০ হাজার বছরের সমান; যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দাদের মাঝে বিচার-নিষ্পত্তি শেষ করা হয়েছেঅতঃপর সে তার পথ দেখতে পাবে; হয় জান্নাতের দিকে না হয় দোযখের দিকে’’ (মুছলিম শরীফ ৯৮৭) ছ্বহিহ হাদীছ শরীফে এসেছেন যে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা সম্পদ দান করেছেন, তারপর যে সেই সম্পদের জাকাত দিবে না, ক্বিয়ামতের দিন তার সম্পদ তার জন্য চক্ষুর পাশে দুটি কালো দাগবিশিষ্ট বিষাক্ত সাপে পরিণত হবে, তারপর সেটি তার চোয়ালের দু’পাশে আক্রমন করবে এবং বলতে থাকবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার গচ্ছিত ধন। (বুখারী শরীফ ১৪০৩)

অন্য হাদীছ শরীফে এসেছেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যে কোন ব্যক্তি তাঁর উটের জাকাত দিবে না সে যেভাবে দুনিয়াতে ছিল তার থেকে উত্তমভাবে এসে তাকে পা দিয়ে মাড়াতে থাকবে, অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি ছাগলের জাকাত দিবে না সে যেভাবে দুনিয়াতে ছিল তার থেকেও উত্তমভাবে এসে তাকে তার খুর ও শিং দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকবেআর তোমাদের কেউ যেন ক্বিয়ামতের দিন তার কাধে ছাগল নিয়ে উপস্থিত না হয়, যে ছাগল চিৎকার করতে থাকবে, তখন সে বলবে, ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম! আর আমি বলব, আমি তোমার জন্য কোন কিছুরই মালিক নই, আমি তো তোমার কাছে বাণী পৌছিয়েছিআর তোমাদের কেউ যেন তার কাধে কোন উট নিয়ে উপস্থিত না হয়, যা শব্দ করছেতখন সে বলবে, ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমি বলব, আমি তোমার জন্য কোন কিছুর মালিক নই, আমি তো তোমাদেরকে পৌছিয়েছি। (বুখারী শরীফ ১৪০২; মুছলিম শরীফ ৯৮৮)

আবার কৃপণতা ও জাকাত আটকে রাখার কুফল বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (وَ لَا یَحۡسَبَنَّ الَّذِیۡنَ یَبۡخَلُوۡنَ بِمَاۤ اٰتٰهُمُ اللّٰهُ مِنۡ فَضۡلِهٖ هُوَ خَیۡرًا لَّهُمۡ ؕ بَلۡ هُوَ شَرٌّ لَّهُمۡ ؕ سَیُطَوَّقُوۡنَ مَا بَخِلُوۡا بِهٖ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ وَ لِلّٰهِ مِیۡرَاثُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ) মহান আল্লাহ তায়ালা নিজ অনুগ্রহে তাদের যে প্রাচুর্য দিয়েছেন তা থেকে যারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে ব্যয় করতে যারা কার্পণ্য করে, তারা যেন কখনো এটা মনে না করে, এটা তাদের জন্যে কোনো কল্যাণকর কিছু হবেবরং এ (কৃপণতা আসলে) তাদের জন্যে খুবই অকল্যাণকর (হবে)কার্পণ্য করে তারা যা জমা করেছে, ক্বিয়ামতের দিন অচিরেই তা দিয়ে তাদের গলায় বেড়ি পরিয়ে দেয়া হবে, আসমানসমূহ ও যমীনের উত্তরাধিকার তো কেবল মহান আল্লাহ তায়ালা উনারই জন্যে, আর তোমরা যা করো মহান আল্লাহ তায়ালা তা সম্পর্কে বেখবর নন। (ছুরাহ আলে ইমরান য়ালাইহিছ ছালাম ৩:১৮০) এই আয়াতে এমন কৃপণের কথা বলা হচ্ছে, যে মহান আল্লাহ পাক উনার দেওয়া সম্পদ উনার রাস্তায় ব্যয় করে নাএমন কি সেই মালের ওয়াজিব জাকাতও আদায় করে না

অনেক মানুষ হয়তো মানতেই পারবেনা যে সে যদি জাকাত ইনকার করে, কখনোই না দিয়ে মারা যায় তাহলে সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে, কেননা মহান আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেছেনঃ (فَاِنۡ تَابُوۡا وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَوُا الزَّكٰوۃَ فَاِخۡوَانُكُمۡ فِی الدِّیۡنِ ؕ وَ نُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ) অতঃপর যদি তারা (মুশরিকরা) তাওবাহ করে এবং নামায আদায় করে এবং জাকাত প্রদান করে তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই। আর আমি জ্ঞানীদের জন্য (আমার) আয়াতসমূহ খুলে খুলে বর্ণনা করি। (ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:১১) এছাড়াও মহান আল্লাহ তায়ালা ছুরাহ ফুছছিলাতে যা বলেছেন তা আরও ভয়াবহ, তিনি বলেনঃ (وَ وَیۡلٌ لِّلۡمُشۡرِكِیۡنَ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡتُوۡنَ الزَّكٰوۃَ وَ هُمۡ بِالۡاٰخِرَۃِ هُمۡ كٰفِرُوۡنَ) আর ধ্বংস মুশরিকদের জন্য যারা জাকাত আদায় করে না, মূলত তারাই আখিরাতে অবিশ্বাসী। (ছুরাহ ফুছছিলাত ৪১:৬-৭)

মুফাছছীরগণের মতে এখানে জাকাত না দেওয়াকে কুফর ও শিরকী আচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছেকিন্তু আমি সোজা সাপ্টা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত বলেই মনে করি বলুনতো জাকাত মুছলিম নাকি মুশরিকদের উপর ফরজ? যদি মুছলিমদের উপর হয়ে থাকে তাহলে যারা জাকাত দেয় না তাদের কাম খতম, যদিও নামাজ, রোজা, হজ্জ করা হাজী হয়ে থাকে।

দুনিয়াবি ও সামাজিক শাস্তিঃ জাকাত না দেওয়া কেবল পরকালের আযাবই ডেকে আনে না, বরং দুনিয়াতেও রহমত কমিয়ে দেয়রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ লোকেরা যখন তাদের সম্পদের জাকাত বন্ধ করে দেয়, তখন আকাশ থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হয়; যদি পশু-পাখি না থাকত, তবে তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিতই হতো না” (ছুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ ৪০১৯)

শরয়ী ও ফিক্বহি সিদ্ধান্তঃ ইছলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে জাকাত অস্বীকার করা কুফরি, আর অবহেলা করে আদায় না করা কঠিন ফাছিকি ও কবিরা গুনাহ বলেছেন ইমামগণ যদিও আমি অবহেলাও মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া মনে করছি

বলপ্রয়োগে আদায়ঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এবং আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিআল্লাহু আনহু উনার ছুন্নাহ অনুযায়ী, কেউ জাকাত দিতে অস্বীকার করলে ইছলামী শাসক তা বলপ্রয়োগে আদায় করবেন

অতিরিক্ত দণ্ডঃ কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী (ছুনানে নাছাই শরীফ), জাকাত দিতে অস্বীকারকারীর থেকে জাকাতের পাশাপাশি দণ্ডস্বরূপ তার অর্ধেক মাল নিয়ে নেওয়ার বিধানও বর্ণিত হয়েছে

উপসংহারঃ অতএব জাকাত না দেওয়া কোনো সাধারণ আর্থিক ভুল নয়; এটি আখিরাত ধ্বংসকারী গুনাহ এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুমের অবাধ্যতাআজ যা সঞ্চয়, কাল তা-ই আযাবের হাতিয়ারসুতরাং প্রতিটি সামর্থ্যবান মুছলিমের উচিত অবিলম্বে হিসাব করে জাকাত আদায় করা এবং অতীতের ভুলের জন্য খাঁটি তাওবাহ করা

হাদীছ শরীফ অনুযায়ী ছ্বলাতুত তাছবীহ-এর চার রক’য়াত নামাযের নিয়ম ও ফজিলত

হাদীছ শরীফ অনুযায়ী ছ্বলাতুত তাছবীহ-এর চার রক’য়াত নামাযের নিয়ম ও ফজিলত

হাদীছ শরীফে এই নামাজের অত্যন্ত ফজিলত বর্ণিত হয়েছেরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার চাচা হযরত আব্বাছ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে এই নামাজ শিক্ষা দিয়েছিলেন

একবার রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হযরত আব্বাছ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে বললেন, “হে আমার চাচাজান! আমি কি আপনাকে দেব না? আমি কি আপনাকে দান করবো না? আমি কি আপনাকে বিশেষভাবে অনুগ্রহ করবো না? আমি কি আপনার সাথে এমন দশটি গুণের কাজ করবো না, যা আপনি করলে মহান আল্লাহ তায়ালা আপনার গুনাহ মাফ করে দেবেন, এর প্রথমটিও এবং শেষটিও, পুরোনোটিও এবং নতুনটিও, ভুলবশত হওয়াটিও এবং ইচ্ছাকৃতটিও, ছোটটিও এবং বড়টিও, গোপনটিও এবং প্রকাশ্যটিও

সেই দশটি গুণের কাজ হলোঃ আপনি চার রকয়াত নামায পড়বেনপ্রত্যেক রকয়াতে ছুরাহ ফাতিহা শরীফের পর একটি ছুরাহ পড়বেনঅতঃপর প্রথম রকয়াতে কিরাআত শেষ করলে, যখন আপনি দাঁড়ানো অবস্থায় থাকবেন, তখন পাঠ করবেনঃ (سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ) ছুবহানাল্লাহী, আলহামদুলিল্লাহী, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবারপনেরো বার

তারপর আপনি রুকূ করবেন, তখন রুকূ অবস্থায় সেটি দশ বার পাঠ করবেনতারপর রুকূ থেকে মাথা উঠাবেন, তখন সেটি দশ বার পাঠ করবেনতারপর সিজদায় যাবেন, তখন সিজদা অবস্থায় সেটি দশ বার পাঠ করবেনতারপর সিজদা থেকে মাথা উঠাবেন, তখন সেটি দশ বার পাঠ করবেনতারপর আবার সিজদা করবেন, তখন সেটি দশ বার পাঠ করবেনতারপর মাথা উঠাবেন, তখন সেটি দশ বার পাঠ করবেনএভাবে প্রত্যেক রকয়াতে মোট পঁচাত্তর বার হবেআপনি এভাবেই চার রকয়াতে তা আদায় করবেন

এখন আপনার পক্ষে যদি সম্ভব হয়, তবে প্রতিদিন একবার এটি আদায় করুনযদি তা না পারেন, তবে প্রতি জুমুয়াহ শরীফে একবারযদি তা না পারেন, তবে প্রতি মাসে একবারযদি তা না পারেন, তবে প্রতি বছরে একবারযদি তাও না পারেন, তবে অন্তত আপনার জীবনে একবার হলেও পাঠ করবেন

আমাদের মধ্যে আরেকটি ত্বরীকাহ মশহুর, অনলাইনে/অফলাইনেসেটার হাক্বিকত কি?

বর্তমানে অনলাইনে/অফলাইনে হাদিছের চেয়ে ভিন্ন এক ত্বরীকাহ বা পদ্ধতির ছড়াছড়ি দেখা যায়, তার মূল কারণ হলো হাদীছ শরীফের বর্ণনার বৈচিত্র্য এবং মুজতাহিদ ইমামগণের ইজতিহাদ (গবেষণা), মূলত ছ্বলাতুত তাছবীহ সম্পর্কে প্রধানত দুটি ছ্বহীহ পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছেঃ

১. মূল হাদীছ শরীফের শব্দ বনাম প্রচলিত য়ামলঃ আবু দাউদ শরীফের ১২৯৭ নং হাদীছ শরীফে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নিজের শেখানো সরাসরি পদ্ধতি হলেন কিরাতের পর ১৫ বার এবং দ্বিতীয় সেজদার পর ১০ বার বসার (جَلْسَةُ الِاسْتِرَاحَةِ) নির্দেশ রয়েছে

অনলাইনে অনেক সময় মূল হাদীছ শরীফের এই সূক্ষ্ম বিন্যাসটি এড়িয়ে গিয়ে সহজলভ্য বা প্রচলিত ফিক্বহী কিতাবের পদ্ধতিটিই ঢালাওভাবে প্রচার করা হয়ফলে সাধারণ মানুষ মনে করে পদ্ধতি একটাই

২. ইমামগণের ইজতিহাদ ও সহজীকরণঃ অনলাইনে আমরা যে পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি দেখি (যেখানে কিরাতের আগে ১৫ বার এবং রুকুর আগে ১০ বার পড়ার কথা বলা হয়), সেটি মূলত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার বর্ণিত পদ্ধতি

ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার কিতাবে এই পদ্ধতিটি উল্লেখ করেছেনফক্বীহগণ এই পদ্ধতিটিকে পছন্দ করার কারণ হলোঃ এতে দ্বিতীয় সিজদার পর আর বসতে হয় না, সরাসরি পরবর্তী রকয়াতের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়া যায়সাধারণ মানুষের জন্য নামাজের স্বাভাবিক রুকন বজায় রেখে এটি আদায় করা সহজ মনে করা হয়

৩. বর্ণনার পার্থক্যঃ মুহাদ্দিছীনগণ বলেন, ছ্বলাতুত তাছবীহ নিয়ে বিভিন্ন ছ্বহাবী রদ্বিআল্লাহু আনহুম উনাদের থেকে বর্ণিত হাদীছ শরীফ গুলোতে তাছবীহ পাঠের স্থান নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা আছে

আবু দাউদ শরীফে  ও ইবনে মাজাহ শরীফের বর্ণনায়ঃ কিরাতের পর ১৫ বার

তিরমিযী শরীফে ইবনে মুবারকের বর্ণনায়ঃ কিরাতের আগে ১৫ বার

সারকথাঃ অনলাইনে ভিন্নতা থাকার কারণ হলো, অধিকাংশ সাইট বা অ্যাপ কোনো একটি নির্দিষ্ট ফিক্বহী মাজহাব বা কোনো একজন ইমামের পছন্দ করা পদ্ধতিটি হুবহু কপি-পেস্ট করেআমরা মাজহাবি হলেও যেহেতু সরাসরি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার শেখানো একটি পদ্ধতি বিদ্যমান তা শেয়ার করা ফরজ মনে করেছিকিন্তু উভয় পদ্ধতিতে আদায় হবে, তবে মূল পদ্ধতিতে ১০০% ছুন্নাহ মানা হবে

এখন আবার কেউ খারেজি ছালাফিদের মতো উনাকে তাকফিরে যেনো না যায়হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি (১১৮ হিজরী - ১৮১ হিজরী) ছিলেন ইছলামের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁকে মুহাদ্দিসগণ আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীছ” (হাদীছ  শরীফ শাস্ত্রের বিশ্বাসীদের নেতা) উপাধিতে ভূষিত করেছেন

ছ্বলাতুত তাছবীহ নামাযের বর্ণনার ক্ষেত্রে উনার নাম বিশেষভাবে পরিচিত, কারণ ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার ছুনান গ্রন্থে ছ্বলাতুত তাছবীহ অধ্যায়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার বর্ণিত পদ্ধতিটিই বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন

তবে আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার বর্ণিত পদ্ধতিটি তাওয়াত্তুর” (যুগ পরম্পরায় অকাট্যভাবে বর্ণিত) হিসেবে গণ্য নয়, বরং এটি ফিক্বহী কিতাবসমূহে মশহুর” (প্রসিদ্ধ) এবং মুস্তাহছান” (উত্তম বা পছন্দনীয়) পদ্ধতি হিসেবে গৃহীত

বিষয়টি আরও পরিষ্কার করার জন্য আরও খোলাখোলি ব্যাখ্যা করছিঃ

১. তাওয়াত্তুরবনাম মশহুর

তাওয়াত্তুরঃ এটি এমন বর্ণনা যা প্রত্যেক যুগে এত বিপুল সংখ্যক রাবী (বর্ণনাকারী) বর্ণনা করেছেন যে, তাতে ভুল হওয়া অসম্ভবছ্বলাতুত তাছবীহ নামাজের কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতিই তাওয়াত্তুরপর্যায়ে পড়ে না, কারণ এটি একটি নফল নামাজ

মশহুর ও মুস্তাহছানঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার পদ্ধতিটি ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার কিতাবে উল্লেখ করার কারণে এবং পরবর্তীতে ফক্বীহগণ (বিশেষ করে হানাফী ফক্বীহগণ) এটিকে সহজ মনে করে গ্রহণ করায় এটি জনসাধারণের মাঝে মশহুরবা সর্বাধিক পরিচিত হয়ে উঠেছে

২. কেন এই পদ্ধতিটি মশহুর হলো?

ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার ছুনান গ্রন্থে বলেনঃ ছ্বলাতুত তাছবীহ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক এবং আরও অনেক য়ালিম বর্ণনা করেছেন এবং তারা এর ফযীলত উল্লেখ করেছেনমূলত ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি যখন ছ্বলাতুত তাছবীহ অধ্যায়টি সাজান, তখন তিনি সরাসরি হাদীছ শরীফের (আবু দাউদ শরীফ, ১২৯৭) পাশাপাশি ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার য়া'মলকেও দলীল হিসেবে পেশ করেনফক্বীহগণ দেখেন যে, ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার পদ্ধতিতে সিজদা থেকে উঠে অতিরিক্ত বসতে (ইস্তিরাহাত) হয় না, যা নামাজের স্বাভাবিক গতির সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণএই কারণেই এটি অনলাইন এবং ফিক্বহী কিতাবগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার পদ্ধতির ছ্বলাতুত তাছবীহ-এর নিয়মঃ

তাছবীহঃ (سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ)

বাংলা উচ্চারণঃ ছুবহানাল্লাহী, ওয়ালহামদুলিল্লাহী, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার

নিয়াত ও ছানাঃ প্রথমে ৪ রকয়াত নামাজের নিয়ত করে ছুবহানাকা” (ছানা) পড়ার পর ১৫ বার তাছবীহটি পড়তে হবে

ছুরাহ পাঠের পরঃ এরপর আয়ুজুবিল্লাহ-বিছমিল্লাহ পড়ে ছুরাহ ফাতিহা শরীফ ও অন্য একটি ছুরাহ মিলিয়ে পড়ার পর রুকুতে যাওয়ার আগে দাঁড়ানো অবস্থায় আরও ১০ বার তাছবীহ পড়তে হবে

রুকুতেঃ রুকুতে গিয়ে রুকুর তাছবীহ (ছুবহানা রব্বিয়াল য়াজীম) পড়ার পর ১০ বার তাছবীহ পড়তে হবে

কওমায় (রুকু থেকে দাঁড়িয়ে): রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রব্বানা ওয়া লাকাল হামদপড়ার পর দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ১০ বার তাছবীহ পড়তে হবে

প্রথম সিজদায়ঃ সিজদায় গিয়ে সিজদার তাছবীহ (ছুবহানা রব্বিয়াল য়ালা) পড়ার পর ১০ বার তাছবীহ পড়তে হবে

জলসায় (দুই সেজদার মাঝে): প্রথম সিজদা থেকে মাথা উঠিয়ে সোজা হয়ে বসে জলসার তাছবীহ আল্লাহুম্মাগ্বফিরলী ২ বারপড়ার পরে ১০ বার তাছবীহ পড়তে হবে

দ্বিতীয় সিজদায়ঃ পুনরায় সিজদায় গিয়ে সিজদার তাছবীহ পাঠের পর ১০ বার তাছবীহ পড়তে হবেঅতঃপর রেগুলার নামাজের মতো সিজদা থেকে দাঁড়াবে

স্বরনীয় যেঃ দ্বিতীয় রকয়াতে জলসায় বসে আত্তাহিয়াতু + দুরুদ শরীফ পড়ে তৃতীয় রকয়াতে দাঁড়াবে

গুরুত্বপূর্ণ নোটঃ এইভাবে এক রকয়াতে মোট ৭৫ বার তাছবীহ সম্পন্ন হবে৪ রকয়াতে ৩০০ বার

সময়ঃ এই নামাজ প্রতিদিন একবার, যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে সপ্তাহে একবার, তাও না পারলে মাসে একবার, তাও না পারলে বছরে একবার, অথবা জীবনে অন্তত একবার হলেও পড়ার জন্য হাদীছ শরীফে তাগিদ দেওয়া হয়েছে

রাত হলো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সৃষ্ট এক রহস্যময় মাখলুক

রাত হলো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সৃষ্ট এক রহস্যময় মাখলুক

সাধারণত রাত বলতে মানুষ অন্ধকার, সূর্যাস্তের পরের সময়, কিংবা দিনের আলো নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পরের অবস্থাকেই বুঝে থাকেকিন্তু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, পবিত্র ক্বুরআন শরীফে রাত বা লাইল’-কে কেবল আলোর অনুপস্থিতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি; বরং একে পৃথক, স্বতন্ত্র এবং আলাদাভাবে সৃষ্ট এক মাখলুক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছেযেন এর সৃষ্টি অন্যভাবে, বিশেষভাবে এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ এক বাস্তবতা হিসেবে সংঘটিত হয়েছেউদাহরণস্বরূপ, ছুরাহ আল-আম্বিয়া য়ালাইহিমুছ ছালাম-উনাতে, যেখানে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বড় বড় এবং শক্তিশালী সৃষ্টিসমূহের উল্লেখ করেছেনসেখানে বলা হয়েছে যে, তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি রাত, দিন, সূর্য ও চন্দ্র সৃষ্টি করেছেনএখানে রাতের উল্লেখ আগে, তারপর দিনেরযেন ইঙ্গিত করা হচ্ছে আগে রাত সৃষ্টি হয়েছে, পরে দিন; অর্থাৎ রাত একটি স্বতন্ত্র মাখলুক, যাকে প্রথমে পয়দা করা হয়েছে

এমনই আরেকটি সাদৃশ্যপূর্ণ বর্ণনা ছুরাহ আল-আনয়াম শরীফে পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছেঃ সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তায়ালা উনারই জন্য, যিনি আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং অন্ধকারসমূহ ও আলো সৃষ্টি করেছেনএখানেও অন্ধকারের উল্লেখ আলোর আগে এসেছেএর দ্বারা বুঝা যায়, রাত বা অন্ধকার কেবল আলো না থাকার নাম নয়; বরং এটি এক আলাদা সৃষ্টি, যা নিজস্ব অস্তিত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠিততবে বিষয়টি এখানেই শেষ হয় না; বরং আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, পবিত্র ক্বুরআন শরীফে বর্ণিত বহু বড় বড় ঐতিহাসিক ও মহাজাগতিক ঘটনা রাত থেকেই শুরু হয়েছেযেমন, ছুরাহ আল-হাক্কাহ-তে কওমে আদ্ব-এর ওপর যে ভয়ংকর ঝড় প্রেরিত হয়েছিল, তা সাত রাত এবং আট দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিলঅর্থাৎ সেই আযাবের সূচনা হয়েছিল রাতেই, পরে তা দিনে চলমান ছিলআবার ছুরাহ আল-ইছরা শরীফ অনুসারে মিয়রাজ শরীফের মহান ঘটনাও এই রাতেই সংঘটিত হয়েছিলছুরাহ আল-হিজর শরীফ অনুযায়ী, হযরত লূত য়ালাইহিছ ছালাম-উনাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তিনি রাতের এক অংশে উনার পরিবারকে ছদূম ও আমূরার জনপদ থেকে বের করে নিয়ে যাবেন, কারণ সেই রাতেই সেখানে আযাব অবতীর্ণ হবেএকইভাবে হযরত মুছা য়ালাইহিছ ছালাম-উনাকেও বনী ইছরাঈলকে সঙ্গে নিয়ে মিশর ত্যাগের নির্দেশ রাতেই দেওয়া হয়েছিল; ছুরাহ আদ-দুখনে এ মর্মে বলা হয়েছেঃ রাতে আমার বান্দাদের নিয়ে বের হয়ে যাওআর হুযূর পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মক্কা থেকে হিজরতও রাতের বেলাতেই সংঘটিত হয়েছিল

পবিত্র ক্বুরআন শরীফ-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়াত, যে আয়াত সম্পর্কে ইহুদিরা হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিআল্লাহু আনহু-উনাকে বলেছিল, “যদি এই আয়াত আমাদের ওপর নাযিল হতো, তবে আমরা সেই দিনটিকে ঈদের দিন বানিয়ে নিতামসে আয়াত শরীফও রাতেই নাযিল হয়েছিলএটি হলো ছুরাহ আল-মায়িদাহ- শরীফের তৃতীয় আয়াত, যেখানে মহান আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন যে, আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করে দিলামএকইভাবে হুযূর পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ মুবারক করেছেন যে, শায়বান মাসে এমন একটি রাত আসে, যখন মহান আল্লাহ তায়ালা উনার মাখলুকাতের প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টিতে তাকানআরও লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, পবিত্র ক্বুরআন শরীফ উনার সাত জায়গায় মহান আল্লাহ তায়ালা রাতের কছম খেয়েছেনউপরন্তু, একটি পূর্ণাঙ্গ ছুরাহ-ই রাতের নামে নামকরণ করা হয়েছে যা ছুরাহ আল-লাইল নামে পরিচিত

ইসলামি তাকভীম বা বর্ষপঞ্জিতেও সময়ের সূচনা রাত থেকেই হয়যেমন রমাদ্বন শরীফের মাস শুরু হয় কখন? যখন চাঁদ দেখা যায়, সেই রাত থেকেইসেই রাতেই তারাউয়্যী শুরু হয়, আর সেই রাতের শেষ প্রান্তে ছাহরী হয়, যার মাধ্যমে রোযার দিনের সূচনা ঘটেঅর্থাৎ ইছলামী সময়-চেতনায় রাত আগে, দিন পরেতবে রাত সম্পর্কে পবিত্র ক্বুরআন শরীফের সবচেয়ে গভীর ও রহস্যময় বর্ণনাগুলোর একটি রয়েছে ছুরাহ ইয়াছিন শরীফে, যেখানে বলা হয়েছেঃ তাদের জন্য একটি নিদর্শন হলো রাত; আমি তা থেকে দিনকে টেনে বের করে নিইএখানে টেনে বের করে নেওয়া”-র জন্য যে শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে নাছলাখুতার অর্থ হচ্ছে কোনো প্রাণীর দেহ থেকে চামড়া টেনে ছড়িয়ে বা ছিঁড়ে আলাদা করে নেওয়াএই শব্দচয়ন অত্যন্ত বিস্ময়করএর দ্বারা যেন বোঝানো হচ্ছে, আসল ও মৌলিক বাস্তবতা হলো রাত; আর দিন হলো তার ওপর একটি আবরণ, একটি স্তর, একটি খোলস, যা রাতের ওপর জড়ানো থাকে, পরে তা টেনে আলাদা করা হয়

এটি পবিত্র ক্বুরআন শরীফের এক অভূতপূর্ব উদ্ঘাটনএই আয়াত শরীফ যেনো জানিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃত অবস্থা হলো রাত, আর দিন হলো আলোর একটি অস্থায়ী স্তর মাত্রবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও বিষয়টি গভীর তাৎপর্যপূর্ণকারণ আমাদের এই মহাবিশ্বের মৌলিক অবস্থা হলো অন্ধকার; মহাশূন্যে নিজস্ব কোনো আলো নেইসর্বত্রই রাতের আধিপত্য বিরাজমানকেবল সূর্য কিংবা অন্য নক্ষত্রের উপস্থিতির কারণে পৃথিবী বা অন্য কোনো গ্রহে সাময়িকভাবে কিছু সময়ের জন্য দিনের অবস্থা তৈরি হয়অর্থাৎ দিন স্থায়ী নয়; বরং বিশেষ পরিস্থিতিতে উদ্ভাসিত সাময়িক আলোকাবস্থাএই ইঙ্গিতও পবিত্র ক্বুরআন শরীফে পূর্ব থেকেই বিদ্যমানছুরাহ আন-নাযিআত শরীফের মর্মার্থে দেখা যায়, রাত আসমানের এক বৈশিষ্ট্য, যাকে অন্ধকার করা হয়েছে, যাকে নূরশূন্য করা হয়েছে, যাকে অন্ধকারের গুণে চিহ্নিত করা হয়েছেফলে মূল বাস্তবতা রাত, আর আমাদের এই সৃষ্টিজগতে নাযিল হওয়া বিশেষ রাতগুলোর শীর্ষে রয়েছেন লাইলাতুল ক্বদর শরীফ, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে অর্থাৎ ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদত ঐ রাতের সমান নয়

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উঠে আসেআজকাল অনেকে জিজ্ঞাসা করেঃ লাইলাতুল ক্বদর শরীফ কোন অঞ্চলের বেজোড় রাতে অনুসন্ধান করতে হবেবাংলাদেশের বেজোড় রাত, না সৌদি আরবের বেজোড় রাত? এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো প্রশ্নকারণ সারা পৃথিবীতে রমাদ্বন শরীফ একই তারিখে শুরু বা চলমান থাকে নাএমনও হতে পারে, অ্যামেরিকাতে এখন বেজোড় রাত চলছে, অথচ বাংলাদেশ/ভারত/পাকিস্তানে তা পরেরদিন হবেএ কারণেই রাতের ধারণা শুরুতেই বুঝে নেওয়া জরুরিমহান আল্লাহ তায়ালা উনার নিকট মূল সত্তা হলো রাতএমনকি পবিত্র ক্বুরআন শরীফে যখন ২৪ ঘণ্টার একটি পূর্ণ সময়কাল উল্লেখ করা হয়, তখনও অনেক ক্ষেত্রে রাতশব্দটি দিয়েই তা প্রকাশ করা হয়উদাহরণস্বরূপ, ছুরাহ আল-আরাফ-এ মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন যে, তিনি হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম-উনার সঙ্গে ত্রিশ রাতের ওয়াদা করেছেনএখানে এই ত্রিশ রাত মানে কেবল ত্রিশটি রাত নয়; বরং পূর্ণ ত্রিশ দিনের সময়কালও এর অন্তর্ভুক্ত

অনুরূপভাবে ছুরাহ মরিয়ম য়ালাইহাছ ছালাম-এ হযরত যাকারিয়া য়ালাইহিছ ছালাম-উনার ঘটনা উল্লেখ আছেতিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নিকট নেক সন্তান কামনা করে দ্বোআ করেছিলেনমহান আল্লাহ তায়ালা উনার দ্বোআ কবুল করেন এবং তার নিদর্শন হিসেবে বলেন যে, তিনি তিন রাত পর্যন্ত কারও সঙ্গে কথা বলতে পারবেন নাএখানেও তিন রাতবলতে শুধু রাত নয়; বরং দিনসহ পূর্ণ সময়কাল বুঝানো হয়েছেঅর্থাৎ সমগ্র কায়িনাত এক বিশেষ মহাজাগতিক বিধান বা কসমিক অর্ডার অনুসরণ করছে, যার কেন্দ্রীয় সত্য হলো রাতই মৌলিক বাস্তবতারাত মহাবিশ্বের সর্বত্র বিস্তৃত, আর লাইলাতুল ক্বদর শরীফেও পুরো কায়িনাতে একই সাথে অবতীর্ণ হয়এই রাত সর্বত্র একই সময়ে বিস্তৃত থাকেতবে প্রতিটি দেশ নিজ নিজ চাঁদ দেখার হিসাব অনুযায়ী সেই রাতকে নিজেদের ভূখণ্ডে শনাক্ত করে থাকে। (লাইলাতুল ক্বদরের রাজ রহস্য জানতে পড়ুন।)

সুতরাং রাত নিছক অন্ধকার নয়, নিছক দিনশেষের শূন্যতা নয়, নিছক আলোহীনতার নামও নয়বরং রাত হলো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সৃষ্ট এক রহস্যময়, মৌলিক, স্বতন্ত্র এবং তাৎপর্যপূর্ণ মাখলুকক্বুরআন শরীফের ভাষা, নবী য়ালাইহিমুছ ছালামগণ উনাদের ঘটনা, ইছলামী সময়গণনা, মহাজাগতিক বাস্তবতা এবং লাইলাতুল ক্বদরের রহস্য, সবকিছু মিলিয়ে রাতের এক অসাধারণ মর্যাদা ও গভীর সৃষ্টিতত্ত্ব আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়এই দৃষ্টিতে দেখলে স্পষ্ট হয়, দিন যেন রাতের ওপর চাপানো এক অস্থায়ী আলোকস্তর, আর রাত হলো সেই বিস্তৃত, গম্ভীর, প্রাথমিক বাস্তবতা, যার বুকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বহু নিদর্শন, বহু রহস্য এবং বহু বিশেষ ফায়ছালার আবির্ভাব ঘটে