Wednesday, March 25, 2026

ক্বুরআন-ছুন্নার আলোকে জিহাদ ও জিহাদ বিরোধী অপপ্রচারের খণ্ডন

ক্বুরআন-ছুন্নার আলোকে জিহাদ ও জিহাদ বিরোধী অপপ্রচারের খণ্ডন

ক্বুরআন-ছুন্নার আলোকে জিহাদের প্রকার, অনিবার্যতা, ও কারা জীহাদ করবে ও জিহাদ বিরোধী অপপ্রচারের খণ্ডনঃ ইছলামের সবচেয়ে সম্মানিত ও উচ্চস্তরের একটি ফরয ঈবাদাতের নাম হচ্ছেন “জিহাদ”ক্বুরআন শরীফ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, জিহাদের মুহব্বত ব্যতীত প্রকৃত মুমিন হওয়া মোটেও সম্ভব নয়বরং যে ব্যক্তি জিহাদের চেয়ে তার পরিবার, সম্পদ, ব্যবসা ও বসতবাড়িকে বেশি ভালোবাসে, মুহব্বত করে, তার সম্পর্কে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে যেঃ মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে কখনো হেদায়াত দান করবেন নাপবিত্র আল ক্বুরআনে ইরশাদ হয়েছেঃ (قُلۡ اِنۡ كَانَ اٰبَآؤُكُمۡ وَ اَبۡنَآؤُكُمۡ وَ اِخۡوَانُكُمۡ وَ اَزۡوَاجُكُمۡ وَ عَشِیۡرَتُكُمۡ وَ اَمۡوَالُۨ اقۡتَرَفۡتُمُوۡهَا وَ تِجَارَۃٌ تَخۡشَوۡنَ كَسَادَهَا وَ مَسٰكِنُ تَرۡضَوۡنَهَاۤ اَحَبَّ اِلَیۡكُمۡ مِّنَ اللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ جِهَادٍ فِیۡ سَبِیۡلِهٖ فَتَرَبَّصُوۡا حَتّٰی یَاۡتِیَ اللّٰهُ بِاَمۡرِهٖ ؕ وَ اللّٰهُ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الۡفٰسِقِیۡنَ) (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি তাদের বলে দিন, (হে মুছলিম সম্প্রদায়) তোমাদের পিতা (মাতা), তোমাদের সন্তানাদি, তোমাদের ভাই (বোন), তোমাদের স্ত্রীগণ (মহিলাদের বেলায় স্বামী), তোমাদের (রক্ত সম্পর্কীয় সকল) আত্মীয়-স্বজন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছো এবং সকল ব্যবসা-বাণিজ্য, যা লোকসানে হয়ে যাবে বলে তোমরা ভয় করো, এমনকি তোমাদের প্রিয় আবাসস্থলযদি (এগুলা) তোমাদের কাছে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, উনার রছূল ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ও জিহাদ ফি ছাবিলিল্লার চাইতে অধিক মুহব্বতের বস্তু হয়, তাহলে তোমরা মহান আল্লাহ তা'য়লার (পক্ষ থেকে উনার আযাবের) ঘোষণা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো, আর (যেনো রাখো) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা'য়ালা কখনো ফাসিক সম্প্রদায়কে হেদায়াত প্রদান করেন না (ছুরাহ আত-তাওবা ৯:২৪)

নছফের তাজকিয়া ব্যতীত উক্ত আয়াত শরীফের কায়িম মাক্বাম হওয়া অসম্ভব, আর কোন আম ব্যক্তির পক্ষে নিজে নিজে তাজকিয়া করাও অসম্ভব, কিন্তু এইখানে আমি তাজকিয়ার আলাপ করবনা, ইশারা দিয়ে রাখলাম খারেজীদের জন্যে, যারা নিজেদের ঠিকাদার ভাবে, যাদের সাথে তাছাউফের কোন সম্পর্কই নাই

যদিও উক্ত আয়াত শরীফে ৩ টা জিনিসের উপর ফোকাস করা হয়েছে, কিন্তু আমরা কেবল ১ টা নিয়ে আলোচনা করবো যেটা আজকে আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়, আর সেটা হচ্ছেন জ্বিহাদ ফি ছাবিলিল্লাহ

প্রথমতোঃ দুনিয়াবি সবকিছুকে মুহব্বত করাকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, কিন্তু সীমানার বাইরে গেলেই মাক্বামে “ফাসিকে খাছ” হয়ে যেতে হবে, যার পরিণতি দুনিয়া আখিরাতের জন্যে ভয়ানকযেমন, “মহান আল্লাহ তা’য়ালা এই আয়াত শরীফে পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, মাল-সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আবাসস্থলের মুহব্বতের কথা বলেছেন” যা প্রাকৃতিকভাবেই মানুষ করে থাকে, যা হারাম নয়, বরং বৈধ ও মানবিকও বটে, কিন্তু সতর্ক করে বলা হয়েছে, যদি এই মুহব্বত মহান আল্লাহ তা’য়ালা, রছূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এবং জ্বিহাদ ফি ছাবিলিল্লাহর চাইতে বেশি প্রাধান্য পায়, তাহলে তা ঈমানদারিত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়এখানে কোনো বস্তু হারাম করা হয়নি; বরং মাপকাঠি স্থির করা হয়েছে কার মুহব্বত সর্বোচ্চ রাখতে হবে?

দ্বিতয়তঃ মহান আল্লাহ তায়ালা ও রছূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের পরে জিহাদকে আলাদা করে বলা হয়েছে কেন? আয়াতে বলা হয়েছেঃ (مِّنَ اللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ جِهَادٍ فِیۡ سَبِیۡلِهٖ) তিনটি বিষয়ের মাঝে আলাদা “و” ব্যবহৃত হয়েছে, যার দ্বারা প্রমাণিত হয় জিহাদ স্বতন্ত্র ও মৌলিক এক বাস্তব পরীক্ষাহুব্বে ইলাহী ও হুব্বে রছূল ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মূলত অন্তরের বিষয়; কিন্তু জিহাদ হলো সেই মুহব্বতের প্রমাণ স্বরূপ, নফছকে তালাক দিয়ে, শারীরিক ও বাহ্যিক ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ করা, যদিও ইছলামের মূল পাঁচ স্তম্ভে জিহাদের উল্লেখ নেই ঈমানের ৫ স্তম্ভের হাদিছ শরীফে, কিন্তু এই আয়াতে পাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা জিহাদকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন এটা মুহব্বত যাচাইয়ের অন্যতম মাপকাঠিতাই যারা জিহাদের চেয়ে ঘর-বাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবারকে বেশি মুহব্বত করে, তারা প্রকৃত ঈমানদারতো নয়ই, বরং পরীক্ষায় ফেল করে খাছ ফাসিকদের মাক্বামের অধিকারী হয়ে যায় এমন ফাসিক, যার হেদায়েতের দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়

তৃতীয়তঃ জিহাদ বিমুখতার ভয়ংকর পরিণতি সম্পর্কে আয়াতে পাকে বলা হয়েছেঃ (فَتَرَبَّصُوۡا) - অর্থাৎ, “তাহলে অপেক্ষা করো”; এটি ক্বুরআনের অন্যতম কঠিন হুমকিসূচক শব্দ, যা আযাব আসার নিশ্চিততা বোঝায়শুধু আযাবের কথা নয়, বরং (وَ اللّٰهُ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الۡفٰسِقِیۡنَ) “আর (যেনো রাখো) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা'য়ালা কখনো ফাসিক সম্প্রদায়কে হেদায়াত প্রদান করেন না”, বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছেঅর্থাৎ যারা দুনিয়াবি মুহব্বতকে প্রাধান্য দেয়, জ্বিহাদ ফি ছাবিলিল্লাহর উপরে, তারা ফাসিক হয়ে যায়আর একবার কেউ “ফাসিকে খাছ” বলে ঘোষিত হলে, ক্বুরআনের বিধান অনুযায়ী তার উপর হিদায়াতের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়অর্থাৎ, জিহাদ বিমুখতা মানুষকে শুধু মহান আল্লাহ তায়ালা উনার গজবের মুখে ফেলে না, বরং তা এমন জাতির অন্তর্ভুক্ত করে দেয়, যাদের আর কখনো হিদায়াত নসীব হয় না তাই এই আয়াত শরীফ সরাসরি প্রমাণ করেন যে, জিহাদ থেকে বিমুখ হওয়া মানেই, হুব্বে দুনিয়া, হুব্বে মাল, হুব্বে আহলুন্ নাফছকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার উপর প্রাধান্য দেওয়া, এবং এর শাস্তি হলো খোদায়ী আযাব-গজব ও চিরতরে হিদায়াত থেকে বঞ্চিত হওয়া

এই আয়াত শরীফ প্রমাণ করেন যে, জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বা সেটাকে গৌণ মনে করাও ইমানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নামান্তরজিহাদ কোনো ঐচ্ছিক কাজ নয়, বরং ঈমানের অংশ কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় বিপদ হল - খারেজি ছালাফি গোষ্ঠী কর্তৃক “জিহাদ” নামক পবিত্র ফরয ঈবাদাতকে বিকৃত করে পরিচালনা করাআইএস, আল-কায়েদা, বোকো হারাম, আল শাবাব, শিয়া হিজবুল্লাহ ইত্যাদি ছ্বলাফি ও ওহাবি, শিয়া সংগঠনসমূহ মূলত ইহুদি-নাসারাদের দালাল হিসেবে মুছলিম জাহানের ভিতরে বিভ্রান্তি ও হানাহানি সৃষ্টি করছেতারা জিহাদের নাম দিয়ে মুমিনদের হত্যা করেছে, শিশু ও মহিলাদের ধর্ষণ করছে, আহলে কিবলার মসজিদে হামলা করেছে - যা ইছলামে জিহাদের নামে ফাসাদ ফিল আরদ্ব

মহান আল্লাহ পাক কালামুল্লাহ শরীফে খুব সুন্দর একটি আয়াত শরীফ নাযিল করেছেন এই বিষয়েমহান আল্লাহ পাক বলেনঃ (وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا۟ فِى ٱلْأَرْضِ قَالُوٓا۟ إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ أَلَآ إِنَّهُمْ هُمُ ٱلْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ) আর যখন তাদের বলা হয়, ‘তোমরা জমিনে (ফিত্না)-ফাসাদ সৃষ্টি করো না,’ তখন তারা বলে, ‘আমরাই তো (বরং) ইছলাহকারি’ (অতএব) সাবধান (থেকো এদের ব্যাপারে)! মূলত তারাই হচ্ছে আসল ফাসাদকারী, কিন্তু তারা তা অনুধাবন করতে পারে না (ছুরাহ আল-বাক্বরাহ ২:১১-১২) বুঝতে পারছেন? জীহাদের নামে মুছলমানদের বিরুদ্দেই তাদের সকল কার্যক্রম, সেটা খারেজি ছালাফি, ওহাবী, শিয়া যারাই হোক না কেনএরা কাফেরদের কোন ক্ষয়ক্ষতি না করলেও কথিত শিরক নির্মুলের নামে মুছলমানদের সবকিছুই ধ্বংস করে যাচ্ছে

যাইহোক, সম্মানিত আহলুছ ছুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের আক্বীদা + তাজকিয়া সহ জিহাদ-ই হচ্ছেন হাক্বিকি জিহাদযে জিহাদে তাযকিয়াতুন নফছ নেই, বরং দুনিয়া ও রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকে, সেই জিহাদ, জিহাদ নয়, বরং তা একধরনের ফিতনাপ্রকৃত জিহাদ শুরু হয় নিজের নফছের বিরুদ্ধে, তারপর সঠিক নেতৃত্ব ও শরঈ নিয়ম অনুসারে দুশমনের বিরুদ্ধে

এই প্রবন্ধে আমরা ইনশাআল্লাহ আলোচনা করবোঃ

জিহাদ কীঃ- এর সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য

জিহাদের প্রকারভেদঃ- নফস, ইলম, দাওয়াহ, কিতাল

কখন কোন জিহাদ ফরয হয়ঃ- ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়

কার বিরুদ্ধে হাক্বিকি জিহাদ হয়ঃ- কাফির, যালিম, মুনাফিক নাকি মুছলিম?

এবং সর্বশেষঃ- জিহাদ পরিচালনার অধিকার কার? ব্যক্তির না রাষ্ট্রের?

এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করবো যেঃ জিহাদ এক পবিত্র ঈবাদাত, কিন্তু ভুল নেতৃত্ব ও আক্বিদার অধীনে তা ভয়াবহ ফিতনায় রূপ নিতে পারে

জিহাদঃ সংজ্ঞা ও পরিভাষাগত ব্যাখ্যা

শব্দমূল বিশ্লেষণ (Root Meaning): “جِهَادٌ” শব্দটি এসেছেন “جَهَدَ - يَجْهَدُ - جُهْدًا وَجِهَادًا” মূল ধাতু থেকে, যার অর্থঃ

·        جَهَدَ - সে পরিশ্রম করলোঃ অর্থাৎ পরিশ্রম করা

·        يَجْهَدُ - সে পরিশ্রম করেঃ অর্থাৎ কঠিন চেষ্টা করা

·        جُهْدًا – পরিশ্রম, সাধনা

·        جِهَادًا - সংগ্রাম: বাতিলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা

এছাড়াও, “জুহদ (جُهْد) শব্দটিও একই মূল ধাতু থেকে এসেছে, যার মানে হলো - কষ্টসহিষ্ণু সাধনা আবার “زُهْد” শব্দটি এসেছে “زَهِدَ – يَزْهَدُ – زُهْدًا” ধাতু থেকে (যার মানেঃ দুনিয়া পরিত্যাগ)

·        زَهِدَ - সে দুনিয়াবিমুখ হলো

·        يَزْهَدُ - সে দুনিয়াবিমুখ হয়

·        زُهْدًا - দুনিয়াবিমুখতাঃ দুনিয়া পরিত্যাগ

ক্বুরআন শরীফে “জিহাদ” শব্দের ব্যবহারঃ

“জিহাদ” শব্দটি ক্বুরআনে প্রায় ৩০+ বার এসেছেন দেখেছি আমিসর্বদাই এটি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সন্তুষ্টির জন্যে জান-মাল-নফছ দ্বারা আত্মোৎসর্গমূলক চেষ্টা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছেনযেমনঃ

১) (وَ جَاهِدُوۡا فِی اللّٰهِ حَقَّ جِهَادِهٖ) তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথে জিহাদের হক্ব আদায় করেই জিহাদ করো (ছুরাহ আল-হাজ্জঃ ২২:৭৮)

২) (فَلَا تُطِعِ الۡكٰفِرِیۡنَ وَ جَاهِدۡهُمۡ بِهٖ جِهَادًا كَبِیۡرًا) (হে নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) অতএব, আপনি কাফিরদের আনুগত্য করবেন না, বরং ফুরক্বন দ্বারা তাদের বিরুদ্ধে এক আজ্বিমুশ্‌শান জিহাদ পরিচালনা করুন(ছুরাহ আল-ফুরকানঃ ২৫:৫২) এখানে মহান আল্লাহ তায়ালা ফুরক্বনি শানে জিহাদ করার হুকুম দিচ্ছেন, যা প্রমাণ করে যে জিহাদ মানেই শুধু অস্ত্র নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ময়দানের যুদ্ধ নয়

এইখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, অনেক অনুবাদক ফুরক্বন শব্দের অর্থ করেছেন ক্বুরআন, আমি তাদের সাথে মোটেও একমত নই, আমার মতে ফুরক্বন কোন কিতাব নয়, বরং এটি একটি ছিফাৎ, ছিফাৎ আর কিতাবের মধ্যে দ্বীন রাতের তফাৎ রয়েছেন, তাছাড়া ক্বুরআন কেবল রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকেই আতা করা হয়েছে, অথচ ফুরক্বন এর ব্যপারে মহান আল্লাহ পাক স্পষ্ট বলছেনঃ (وَ اِذۡ اٰتَیۡنَا مُوۡسَی الۡكِتٰبَ وَ الۡفُرۡقَانَ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُوۡنَ) আর (স্মরণ করো), যখন আমি মূছা য়ালাইহিছ ছালামকে কিতাব ও ফুরক্বন দিয়েছিলাম, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও(ছুরাহ আল-বাক্বরাহ ২:৫৩) এইখানে কিতাব ও ফুরক্বন আলাধা করেই বলেছেন মহান আল্লাহ তায়ালা, যদি ফুরক্বন কিতাবই হতেন ক্বুরআনের মতো তাহলে কিতাব ও ফুরক্বন দিয়েছিলাম বলতেন না, বরং ফুরক্বন নামের এক কিতাব দিয়েছিলাম বলতেনশুধু তাই নয় আরো স্পষ্ট করেই বলেছেনঃ (یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ تَتَّقُوا اللّٰهَ یَجۡعَلۡ لَّكُمۡ فُرۡقَانًا وَّ یُكَفِّرۡ عَنۡكُمۡ سَیِّاٰتِكُمۡ وَ یَغۡفِرۡ لَكُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ ذُو الۡفَضۡلِ الۡعَظِیۡمِ) হে মুমিনগণ! তোমরা যদি মুত্তাক্বী হও, তাহলে তিনি তোমাদেরকে ফুরক্বনী নূর আতা করবেন, তোমাদের গুনাহসমূহ মোচন করে দেবেন, এবং তোমাদের ক্ষমা করে দেবেনআর আল্লাহ তা’য়ালাইতো মহা অনুগ্রহশীল। (ছুরাহ আনফাল ৮:২৯)

তাফসীরের প্রায় সকল কিতাব অনুসারেঃ (الفُرْقَانَ) হচ্ছেন সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী, হালাল ও হারামের বিধান বর্ণনাকারী, ক্বুরআনের আরেক নাম হলো ফুরক্বনকিন্তু আমার নিকট ফুরক্বন হলেন সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী, হালাল ও হারামের বিধান বর্ণনাকারী একটি নূর, আধ্ম্যাত্বীক শক্তি ও হুকুম, যা ক্বুরআনের মধ্যেও নাযিল করা হয়েছে, তাই অনেকে ক্বুরআন নামেই অনুবাদ করে থাকেনতবে মূলে এটা কিতাব নয় বরং আমর ও ছিফাৎ বলেই আমি মনে করি

আবূ ছাঈদ আল-খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ (اتَّقُوا فِرَاسَةَ الْمُؤْمِنِ، فَإِنَّهُ يَنْظُرُ بِنُورِ اللَّهِ) “তোমরা মু’মিনের অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় করো, নিশ্চয়ই সে মহান আল্লাহ তা’য়ালার নূর দ্বারা দেখে থাকে”এরপর তিনি এই আয়াত শরীফ তিলাওয়াত করেনঃ (اِنَّ فِیۡ ذٰلِكَ لَاٰیٰتٍ لِّلۡمُتَوَسِّمِیۡنَ) “নিশ্চয় এসব ঘটনার মধ্যে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য নিদর্শন রয়েছে(ছুরাহ আল-হিজরঃ ১৫:৭৫, ছুনান আত-তিরমিযি ৩১২৭) হাদীসের মানঃ হাসান, বলেছেন ইমাম আল-হাইসামী রহমতুল্লাহ

ছালাফিদের ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেনঃ “এটি এমন এক নূর, যা মহান আল্লাহ তা’য়ালা তিনি উনার বান্দার অন্তরে দান করেন, যার দ্বারা সে হক্ব ও বাতিল, উপকারী ও অপকারী, সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীর মাঝে পার্থক্য করতে সক্ষম হয়” (সূত্রঃ মাদারিজুস ছালিকীন, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৫৩)

অতএব ফুরক্বন একটি নূরে ইলাহী, উহার দ্বারা সকল ধরণের জ্বিহাদ করা সহজসেটা দাওয়াতি হোক কিংবা ফিজিক্যালি আর এটাই ঐ আয়াতে বলেছেন যে, “হে মুমিনগণ! তোমরা যদি মুত্তাক্বী হও, তাহলে তিনি তোমাদেরকে ফুরক্বনী নূর আতা করবেন”তাহলে দেখা গেলো ক্বুরআন শুধু শত্রুর সাথে ময়দানে জিহাদ করতে বলেননি, বরং আজ্বিমুশ্‌শান জিহাদ ফুরক্বন দ্বারা করতে বলেছেন

হাদীছ শরীফে জিহাদের সংজ্ঞাঃ

১) হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (وَالْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي طَاعَةِ اللَّهِ) রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, “প্রকৃত মুজাহিদ হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের নফছের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার আনুগত্যে জিহাদ করেন”(তিরমিযি শরীফ ১৬২১, শু‘আবুল ঈমান, মিশকাত)

২) হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ إِذَا أَنَا عَمِلْتُهُ أَحَبَّنِي اللَّهُ وَأَحَبَّنِي النَّاسُ. قَالَ: «ازْهَدْ فِي الدُّنْيَا يُحِبُّكَ اللَّهُ وَازْهَدْ فِيمَا عِنْدَ النَّاسِ يُحِبَّكَ النَّاسُ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْن مَاجَه) ছাহল ইবনু ছা’য়দ রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের কাছে এসে বললেন, “ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম! আমাকে এমন একটি কাজের আদেশ দিন যা করলে মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে ভালোবাসবেন এবং মানুষেরাও আমাকে ভালোবাসবেতিনি বললেনঃ দুনিয়া বিমুখ হও (মানে দুনিয়ার প্রতি নফছের আসক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করো), তাহলে মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাকে ভালোবাসবেন এবং মানুষের নিকট যা আছে তার প্রতি লোভ করো নাতাহলে লোকেরা তোমাকে ভালোবাসবে(ছুনান ইবনে মাজাহ ৪১০২, রিয়াদ্বুছ ছ্বলেহিন, বুলুগুল মারাম, মিশকাতুল মাসাবীহ) এই দুনিয়া বিমুখী জীহাদের ব্যপারে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকেও রয়েছে অসম্ভব সুন্দর নছিহত, মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (قَدۡ اَفۡلَحَ مَنۡ تَزَكّٰی وَ ذَكَرَ اسۡمَ رَبِّهٖ فَصَلّٰی بَلۡ تُؤۡثِرُوۡنَ الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃُ خَیۡرٌ وَّ اَبۡقٰی) নিশ্চয়ই সে ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে তার নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করেছে, অতঃপর তার রব তায়ালা উনার নামের যিকির করেছে, এরপর সে নামায আদায় করেছেকিন্তু তোমরা তো দুনিয়ার জীবনকেই আখেরাতের জীবনের ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকো, অথচ আখেরাতের জীবনই হচ্ছেন সর্বোত্তম ও চিরস্থায়ী (ছুরাহ আল-আ‘লা ৮৭:১৪–১৭)

৩) হাদিছ শরীফে আরো এসেছেনঃ (قَالَ سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنِ الرَّجُلِ يُقَاتِلُ شَجَاعَةً وَيُقَاتِلُ حَمِيَّةً وَيُقَاتِلُ رِيَاءً فَأَىُّ ذَلِكَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ ‏ "‏ مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ) এক ব্যক্তি নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলঃ এক ব্যক্তি যুদ্ধ করে বীরত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে, আরেকজন যুদ্ধ করে জাতিগত গোঁড়ামির কারণে, এবং কেউ যুদ্ধ করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে, “এদের মধ্যে কে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাস্তায় যুদ্ধ করছে?” তখন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেনঃ “যে ব্যক্তি এই উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে, যেন মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বাণীই সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই-ই (হাক্বিকতে) মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাস্তায় যুদ্ধ করছে কিংবা সেই মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাস্তার (প্রকৃত) মুজাহিদ (বুখারি ১২৩, মুছলিম ১৯০৪, ২৮১০, ৩১২৬, তিরমিযি ১৬৪৬, নাসাঈ ৩১৩৬, ইবনে মাজাহ ২৭৮৩, মিশকাত ৩৮১৪)

ইছলামি পরিভাষায় জিহাদের সংজ্ঞাঃ (بَذْلُ الجُهْدِ والطَّاقَةِ في نُصْرَةِ دِينِ اللهِ وتَعْلِيَةِ كَلِمَتِهِ، وَقِتَالِ أَعْدَائِهِ عِندَ الْحَاجَةِ تَحْتَ وِلَايَةٍ شَرْعِيَّةٍ) “মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও উনার বাণীকে শ্রেষ্ঠ করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করাকে জিহাদ বলা হয়যখন প্রয়োজন হয়, তখন শরয়ী অনুমোদিত নেতৃত্বের অধীনে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাও এর অন্তর্ভুক্ত

সারসংক্ষেপে জিহাদের সংজ্ঞাঃ জিহাদ হল এমন এক ঈবাদাত, যার মাধ্যমে একজন মু’মিন ব্যক্তি নিজের জান, মাল, সময় ও কল্পনাশক্তি ব্যয় করে, শুধুমাত্র মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টির জন্য, হক্ব প্রতিষ্ঠা ও বাতিল ধ্বংসের লক্ষ্যে সংগ্রাম করে

জিহাদ নয় যে বিষয়গুলোঃ

> ভুল ব্যাখ্যাঃ দুনিয়াবি স্বার্থে যুদ্ধ, রাজনৈতিক সহিংসতা, মুসলমানদের হত্যা করা, ইহুদি-নাছারাদের দালালি করে “জিহাদ” দাবী করা

> প্রকৃত অর্থঃ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টিতে সংগ্রাম, শরয়ী অনুমোদিত কিতাল, কুফরের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক সংগ্রাম, শুধুমাত্র আহলুস সুন্নাহর নেতৃত্বে অনুমোদিত জিহাদ

জিহাদের প্রকারভেদঃ ক্বুরআন ছুন্নাহর আলোকে বিশ্লেষণ

ভূমিকাঃ ইছলামে জিহাদ বলতে কেবলমাত্র তরবারির যুদ্ধকে বোঝানো হয় নাবরং ক্বুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাইঃ- জিহাদ একটি পূর্ণ জীবনব্যাপী সংগ্রাম, যার বিভিন্ন স্তর ও রূপ রয়েছেএসব রূপ একে অপরকে পরিপূর্ন করেকেউ যদি বাহ্যিক জিহাদ করে কিন্তু অন্তরে নফছের জিহাদ না থাকে, তবে সে খারেজি বা ফিতনা সৃষ্টিকারীর অন্তর্ভুক্ত হয়আর কেউ যদি কেবল আত্মিক সাধনায় লিপ্ত থাকে কিন্তু বাতিলের বিরুদ্ধে হক্ব প্রকাশ না করে, সে চরম দুর্বল ইমানের অধিকারী হয়

ক্বুরআন-হাদিছ রিসার্চ করে যেটা পাওয়া যায় সেটা হলো, জিহাদ মূলত ২ প্রকারঃ

১) নফছের জিহাদঃ- যা মানুষ নিজের সাথে করে থাকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পূর্ন আনুগত্যের প্রমাণ দিতে

২) শারীরিক জিহাদঃ যা সরাসরি অস্ত্রের মাধ্যমে শত্রুর বিরুদ্ধে ময়দানে সম্মানিত দ্বীন ইছলামের পক্ষে করা হয়

জিহাদ মূলত অন্তর-ভিত্তিক, আত্মিক ও বাহ্যিক উভয় সংগ্রামের সমষ্টি, যেটাকে আজকাল ভন্ড বাতিল ফেরকা ছ্বলাফিরা কেবল শারীরিক ময়দানের জ্বিহাদে সিমাবদ্ধ করে ফেলেছে তবে উক্ত দুই প্রকারকে প্রায় ৫ ভাগে ভাগ করা যায়

জিহাদুন নফছঃ নিজের প্রবৃত্তি ও নফছের খারাপ স্বভাবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা

জিহাদ বিল লিছানঃ সত্য কথা, নছিহত, খুতবা ও দাওয়াহর মাধ্যমে কুফর-মুনাফিকদের মোকাবিলা করা

জিহাদ বিল ক্বলমঃ কলম ও বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ, বাতিল মতবাদ খণ্ডন, নাস্তিক-মুর্তাদদের জবাব দেওয়া

জিহাদ বিল মালঃ অর্থ-সম্পদ দিয়ে দ্বীনের পথে সাহায্য করা

জিহাদ ফী ছাবীলিল্লাহ বা কিতালঃ অস্ত্রধারী জিহাদ, শুধুমাত্র শরয়ী নেতৃত্বে এবং সুনির্দিষ্ট শর্তে বৈধ

১. জিহাদুন নফছ (নফছের বিরুদ্ধে জিহাদ):

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَ الَّذِیۡنَ جَاهَدُوۡا فِیۡنَا لَنَهۡدِیَنَّهُمۡ سُبُلَنَا ؕ وَ اِنَّ اللّٰهَ لَمَعَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ) যারা আমাকে পাওয়ার জন্যে নিজের নফছের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যায়, তারা যদি পথ নাও পায়, আমি মহান আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং তাদের পথ দেখিয়ে দেইআর আর নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ তা’য়ালা মুহছিনদের সাথেই আছেন(সূরা আনকাবুতঃ ২৯:৬৯)

এই আয়াত শরীফে যুদ্ধের কোনো প্রসঙ্গ নেই; বরং নফসের বিরুদ্ধে আত্মিক সংগ্রাম বোঝানো হয়েছে

তাজকিয়া ছাড়া বাহ্যিক জিহাদ হলো ধোঁকা, কারণ যার অন্তর শুদ্ধ নয়, সে নেতৃত্ব নিয়ে ফাসাদ করে (যেমন খারেজিরা করেছে)

২. জিহাদ বিল লিসান (জিহাদ দ্বারা দাওয়াহ ও সত্য উচ্চারণ):

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (فَلَا تُطِعِ الۡكٰفِرِیۡنَ وَ جَاهِدۡهُمۡ بِهٖ جِهَادًا كَبِیۡرًا) (হে নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) অতএব, আপনি কাফিরদের আনুগত্য করবেন না, বরং ফুরক্বন দ্বারা তাদের বিরুদ্ধে এক আজ্বিমুশ্‌শান জিহাদ পরিচালনা করুন। (ছুরাহ আল-ফুরকানঃ ২৫:৫২)

এখানেও অস্ত্র নয়, বরং ক্বুরআনের মধ্যে নাজিলকৃত ফুরক্বনী নূর তথা অখন্ডিত যুক্তি, হিকমত ও অখন্ডিত বাণীর মাধ্যমে কাফেরদের মোকাবিলা করাই বড় জিহাদ বলা হয়েছে

৩. জিহাদ বিল ক্বলম (বুদ্ধিবৃত্তিক ও লেখনী জিহাদ):

“জিহাদ বিল ক্বলম” তথা বুদ্ধিবৃত্তিক ও লেখনী জিহাদ-এর ব্যপারে বিগত ১৪০০ বছরে বাঘা বাঘা ঈমামদের স্থান সবার উপরে, যারা বাতিল ফেরকা তথাঃ খারেজি, রাফেজি, মু’তাজিলা, নাসেবি, ওহাবি, দেওবন্দি, কাদিয়ানী, নাস্তিক ও ধর্মদ্রোহী (যারা ইছলামের অস্তিত্ব ও সত্যতাকে অস্বীকার করে) এছাড়াও ইহুদি ও নাসারা (ক্রুসেডার, যাযাবর বুদ্ধিজীবী, অরিয়েন্টালিস্ট, ইত্যাদির বিরুদ্ধে ছুন্নী ক্বলম দ্বারা সজাগ ও প্রতিরোধমূলক কাজ করেছেন

১৪০০ বছরের শ্রেষ্ঠ “জিহাদ বিল ক্বলম” পরিচালনাকারী সুন্নী য়ালিমগণ (ধারাবাহিকভাবে):

খোলাফায়ে রাশেদীনদের যুগের পরবর্তী প্রজন্ম, তাবেঈন, তবে তাবেঈন থেকে মধ্যযুগীয় য়া’লিমগণঃ

ইমাম আবু হানীফা রহমতুল্লাহঃ জাহমিয়্যাহ, ক্বদরিয়্যাহ, রাফেজিদের বিরুদ্ধে

ইমাম মালিক ইবনে আনাস রহমতুল্লাহঃ – বিদআতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি ফতোয়া

ইমাম আশ-শাফি’ঈ রহমতুল্লাহঃ – ক্বদরিয়্যাহ, রাফেজিদের বিরুদ্ধে বিশুদ্ধ আকীদা প্রতিষ্ঠা

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহঃ – খালিছ ক্বলমি ও মৌখিক জিহাদ করেছেন মুতাজিলাদের বিরুদ্ধে

ইমাম তাহাবি রহমতুল্লাহঃ – আকীদাহ তাহাবিয়্যাহ গ্রন্থে বাতিল আক্বীদার মোকাবেলা করেছেন

ইমাম আবুল হাসান আল আশআ’রি রহমতুল্লাহঃ – মুতাজিলাদের থেকে ফিরে এসে কালাম লিখে ছুন্নী আক্বিদার রক্ষক হোন

ইমাম আবু মনছুর আল মাতুরিদী রহমতুল্লাহঃ – বিশেষত মাওরা’উন-নাহরের তৎকালীন রাফেজি ও জিন্দিকদের বিরুদ্ধে

ইমাম যাহাবি রহমতুল্লাহঃ – শাজ আক্বিদার মুখোশ উন্মোচন করেন

ইমাম কুরতুবী রহমতুল্লাহঃ – রাফেজি ও দেহরিয়্যাহদের বিরুদ্ধে ক্বলম ধরেছেন

ইমাম গাযালী রহমতুল্লাহঃ – তাফাক্কুরী জিহাদের রাহবার“তাহাফুতুল ফালাসিফা”-এর মাধ্যমে ফিলোসফিক্যাল নাস্তিকদের ভণ্ডামি উন্মোচন করেছেন

ইমাম সুয়ূতী রহমতুল্লাহঃ – বহু মুনাযারা, বাতিল ফেরকার খণ্ডন লিখেছেন

আহমদ রেযা খান বেরেলভীঃ – ওহাবি/দেওবন্দি/নাজদিদের বিরুদ্ধে লিখেছেন

বদিউজ্জামান ছাঈদ নূরছি রহমতুল্লাহঃ – তুরস্কে রিয়ালিস্ট নাস্তিকতাবাদ ও সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধে রিসালা-ই-নূর রচনা করেন

আজকের যুগে বিজ্ঞান, কলম ও মিডিয়াই প্রধান যুদ্ধের ময়দান যারা সত্যের পক্ষে লিখেন, তারাই সবচেয়ে বড় মুজাহিদ কারো বাপের ক্ষমতা নাই কোন অস্ত্র ব্যবহার করে অ্যামেরিকা, ইউরোপ, ইংল্যান্ড, ইছরাঈল কিংবা রাশিয়া চিনের একটা চুল হিলাতে, কিন্তু লিখা, বিজ্ঞান, হ্যাকিং দিয়ে পেন্টাগন কিংবা ক্রামলিনের ঘুম হারাম করে দেওয়া সম্ভব

৪. জিহাদ বিল মাল (অর্থ দ্বারা জিহাদ):

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (اِنۡفِرُوۡا خِفَافًا وَّ ثِقَالًا وَّ جَاهِدُوۡا بِاَمۡوَالِكُمۡ وَ اَنۡفُسِكُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ؕ ذٰلِكُمۡ خَیۡرٌ لَّكُمۡ اِنۡ كُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ) তোমরা জিহাদে বেরিয়ে পড়ো, কম কিংবা বেশি (রনসম্ভারেই) হোক, জিহাদ করো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথে জান ও মাল দিয়েএটিই তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা তা বুঝতে পারো (ছুরাহ আত-তাওবাঃ ৯:৪১)

উক্ত আয়াতে ফিজিক্যাল জীহাদের ব্যপারে নির্দেশ দিচ্ছেন মহান আল্লাহ তায়ালা“কম কিংবা বেশি (রণসম্ভারেই) হোক” এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাগিদ দিচ্ছেন যে, দূরের রাস্তা, রোদ, কিংবা বেশি সরঞ্জাম বহনের কষ্টের অজুহাত দেখানো যাবে নাতাবুকের অভিযান ছিল প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরের যাত্রা, গ্রীষ্মের তীব্র তাপে, এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেঅনেক ছ্বহাবি প্রাথমিকভাবে অংশ নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন, কারণঃ দীর্ঘ যাত্রার কষ্ট, রোদ ও গরমের তীব্রতা, সরঞ্জাম বা সম্পদের অভাব ছিলোকিন্তু এই আয়াত শরীফের “اِنْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا” তাদেরকে তাগিদ দেন যে, যেকোনো অবস্থায় বা যেকোনো পরিমাণ সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে وَّ جَاهِدُوۡا بِاَمۡوَالِكُمۡ وَ اَنۡفُسِكُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ” আর জিহাদ থেকে জানের মায়ায়, মালের মায়ায়, পালানোর কোন সুযোগ নাই, বরং নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, জিহাদ করতে হবে জান-মাল দুইটা দিয়েইআজ ফিজিক্যাল জিহাদ নাই কিন্তু মালের জিহাদ তো মওজুদতাই যারা অর্থ-সম্পদ দিয়ে আহলুছ ছুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আক্বিদার দাওয়াহ চালায়, তারাই সত্যিকারের জিহাদ বিল মালের মুজাহিদ

৫. জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ (সশস্ত্র যুদ্ধ):

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (كُتِبَ عَلَیۡكُمُ الۡقِتَالُ وَ هُوَ كُرۡهٌ لَّكُمۡ ۚ وَ عَسٰۤی اَنۡ تَكۡرَهُوۡا شَیۡئًا وَّ هُوَ خَیۡرٌ لَّكُمۡ ۚ وَ عَسٰۤی اَنۡ تُحِبُّوۡا شَیۡئًا وَّ هُوَ شَرٌّ لَّكُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ یَعۡلَمُ وَ اَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ) তোমাদের উপর সশস্ত্র জিহাদ ফরজ করা হয়েছে, যদিও তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয় বিষয়, তবে হতে পারে কোন বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকরআবার এমনও হতে পারে যে কোন বিষয় তোমরা পছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকরআর মহান আল্লাহ তায়ালা (এইসব ভালো করেই) জানেন যদিও তোমরা তা না জানো (ছুরাহ আল-বাক্বারাহঃ ২:২১৬)

মহান আল্লাহ পাক সশস্ত্র যুদ্ধ ফরজ করার পর, কাদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ করতে হবে তাও বলে দিচ্ছেনঃ (وَ قَاتِلُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ الَّذِیۡنَ یُقَاتِلُوۡنَكُمۡ وَ لَا تَعۡتَدُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یُحِبُّ الۡمُعۡتَدِیۡنَ) তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথে সশস্ত্র জিহাদ করো তাদের বিরুদ্ধে, যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে; তবে সীমালঙ্ঘন করো নানিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না (ছুরাহ আল-বাক্বরাহ ২:১৯০)

এই যুদ্ধ আক্রমণ, আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক, কেবল শরীয়ত অনুমোদিত নেতৃত্ব থাকলেই তা বৈধ

এই হলো জীহাদের সকল প্রকার, যা অধিকাংশ ব্রেইন ওয়াশ করা পোলাপান জানেওনা বুঝেও না, মানেও না, ফলে নিজেরাও ফেত্নায় জড়ায়, পরিবার পরিজনকেও ফেলায়

খারেজি ও ছ্বলাফিদের জিহাদের ভ্রান্ত ব্যাখ্যার খণ্ডনঃ

খারেজিরা শুধু বাহ্যিক জিহাদকেই জিহাদ মনে করে, আর তাজকিয়াহ, ইখলাস, নেতৃত্বের অনুমোদন, এই সবকিছুকে বাতিল বলে অথচ পবিত্র ক্বুরআন-হাদীছে সেই জিহাদকে ফিতনা বলা হয়েছে, যা আহলে কিবলার রক্ত ঝরায় রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السِّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا) “যে ব্যক্তি আমাদের (মুসলমানদের) বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়” (বুখারী শরীফ ৭০৭০)

কখন কোন জিহাদ ফরয হয়? – আহকাম ও প্রেক্ষাপটভিত্তিক বিশ্লেষণ

ভূমিকাঃ জিহাদ একটি সর্বজনীন শব্দ, তবে সমস্ত প্রকার জিহাদ সবসময় সবার ওপর ফরয নয়, বরং ইছলামিক শরীয়ত পরিস্থিতি, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রভেদে জিহাদকে ফরয, নফল, মুস্তাহাব বা হারাম আকারেও শ্রেণিবদ্ধ করেছেন তেমনি, কোনো একটি জিহাদ এক শ্রেণির জন্য ফরযে আইন, আবার আরেক শ্রেণির জন্য এমনও হতে পারে যে তা ফরযে কিফায়া আর যেখানে নেতৃত্বহীন জিহাদ, আক্বিদাহ-বিচ্যুত সংগঠন, আত্মশুদ্ধি ছাড়া যুদ্ধ, সেগুলো শতভাগ হারাম ও ফিতনার অন্তর্ভুক্ত

১. জিহাদুন নফছ (নফছের বিরুদ্ধে জিহাদ) সর্বদা ফরযে আইনঃ প্রত্যেক বালেগ মুছলমানের উপর নিজ নফছের বিরুদ্ধে জিহাদ করা সরাসরি ফরযে আইন কারণ, ঈমানের হিফাজত, আমল, তাকওয়া এবং দ্বীনি জীবন গঠনের প্রথম শর্তই হলো নফছকে নিয়ন্ত্রণ করা মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَ اَمَّا مَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّهٖ وَ نَهَی النَّفۡسَ عَنِ الۡهَوٰی فَاِنَّ الۡجَنَّۃَ هِیَ الۡمَاۡوٰی) আর যে ব্যক্তি তার রব তায়ালা উনার সম্মুখে দাঁড়ানোর (দিনটির) বিষয়ে ভয় করেছে এবং (এ ভয়ে) তার নফসকে (সমস্ত) নাপাকি থেকে বিরত রাখে, নিশ্চয়ই জান্নাতুল মাওয়াই হবে তার চিরস্থায়ী ঠিকানা (ছুরাহ আন-নাযি’য়াত ৭৯:৪০-৪১)

২. জিহাদ বিল লিছানঃ জবান কিংবা ক্বলম দ্বারা সময়, সামর্থ্য ও পজিশন অনুযায়ী ব্যক্তি অনুসারে ফরয বা মুস্তাহাবঃ

যারা হাক্বিকি য়া’লিম, দায়ী, বক্তা, লেখক, তাদের উপর সত্য প্রচার ও বাতিল খণ্ডন করা ফরযে আইনআর সাধারণ মুসলমানদের জন্যেঃ কেউ ভুল করলে, তৌফীক অনুসারে সতর্ক করা ওয়াজিব হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَٰلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ.) আবূ ছাঈদ খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ আমি রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে বলতে শুনেছি, “তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় (মুনকার) দেখতে পায়, তবে সে যেনো তা নিজের হাতে পরিবর্তন করেযদি সামর্থ্য না থাকে, তবে নিজের মুখ দ্বারা (প্রতিবাদ করে)আর যদি তাও না পারে, তবে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করুক, আর এটাই হচ্ছে ঈমানের সর্বনিম্ন স্তরহাদিস শরীফ সুত্রঃ (বুখারী শরীফ ৯৫৬, মুছলিম শরীফ ৪৯, তিরমিযী শরীফ ২১৭২, নাছাঈ শরীফ ৫০০৮, ৫০০৯, আবূ দাউদ শরীফ ১১৪০, ৪৩৪০, ইবনু মাজাহ শরীফ ১২৭৫, ৪০১৩, মুছনাদে আহমাদ শরীফ ১০৬৮৯, ১০৭৬৬, ১১০৬৮, ১১১০০, ১১১২২, ১১১৪৫, ১১৪৬৬, দারেমী শরীফ ২৭৪০১)

৩. জিহাদ বিল মাল, অর্থের জিহাদঃ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফরযে আইন/কিফায়া

যখন উম্মাহ বিপদে, দাওয়াহ রোধ করা হচ্ছে, গরীবদের ইছলাম শেখার সামর্থ্য নেই, তখন অর্থ দিয়ে সাহায্য করা ফরযে আইন (اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ هَاجَرُوۡا وَ جٰهَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ بِاَمۡوَالِهِمۡ وَ اَنۡفُسِهِمۡ ۙ اَعۡظَمُ دَرَجَۃً عِنۡدَ اللّٰهِ ؕ وَ اُولٰٓئِكَ هُمُ الۡفَآئِزُوۡنَ) যারা মুমিন হয়েছে, হিজরত করেছে, আর মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথে নিজদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে, মহান আল্লাহ তায়ালা উনার কাছে তারা বড়ই মর্যাদাবান, আর তারাই মূলত ফজিলতপ্রাপ্ত-সফলকাম (ছুরাহ আত-তাওবাঃ ৯:২০)

সাধারণ পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাস্থায় অর্থ ব্যয় করা নফল বা মুস্তাহাব

৪. জিহাদ ফী ছাবিলিল্লাহঃ সশস্ত্র যুদ্ধ যে পরিস্থিতিতে ফরয হয়!

ফরযে আইন (ব্যক্তিগতভাবে): যখন শত্রু মুছলিম অঞ্চল আক্রমণ করে এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী কম থাকে, তখন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের উপর জান-মাল দিয়ে যুদ্ধ করা ফরযে আইন হয় মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَ مَا لَكُمۡ لَا تُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ الۡمُسۡتَضۡعَفِیۡنَ مِنَ الرِّجَالِ وَ النِّسَآءِ وَ الۡوِلۡدَانِ) তোমরা কেন সশস্ত্র জিহাদ করবে না সেই সমস্ত দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে যারা অত্যাচারিত? (ছুরাহ আন-নিছা ৪:৭৫)

ফরযে কিফায়া (সমষ্টিগত দায়িত্ব): যদি মুছলিম রাষ্ট্রে শান্তি বিরাজ করে, তবে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দ্বীন ছড়িয়ে দিতে ও সীমান্ত রক্ষা করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সামরিক প্রস্তুতি, বাহিনী ও দাওয়ার জিহাদ চালানো ফরযে কিফায়ামহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَلۡتَكُنۡ مِّنۡكُمۡ اُمَّۃٌ یَّدۡعُوۡنَ اِلَی الۡخَیۡرِ وَ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡكَرِ ؕ وَ اُولٰٓئِكَ هُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ) তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহবান করে এবং সৎ কাজে আদেশ করে ও অসৎ কাজে নিষেধ করে, আর তারাই মূলত সফলকাম (ছুরাহ আলে ইমরানঃ ৩:১০৪)

হারাম ও নিষিদ্ধঃ

যে জিহাদঃ

শরয়ী অনুমোদন ছাড়া হয়

ব্যক্তিগত ফতোয়ায় হয়

রাজনৈতিক দালালি মিশ্রিত

কাফেরের নয়, মুসলমানের বিরুদ্ধে হয়

তাজকিয়া ও ইখলাস ছাড়া হয়

সেসব “জিহাদ” নয় — বরং “ফাসাদ ফিল আরদ্ব” মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا۟ فِى ٱلْأَرْضِ قَالُوٓا۟ إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ أَلَآ إِنَّهُمْ هُمُ ٱلْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ) আর যখন তাদের বলা হয়, ‘তোমরা জমিনে (ফিত্না)-ফাসাদ সৃষ্টি করো না,’ তখন তারা বলে, ‘আমরাই তো (বরং) ইছলাহকারি’ (অতএব) সাবধান (থেকো এদের ব্যাপারে)! মূলত তারাই হচ্ছে আসল ফাসাদকারী, কিন্তু তারা তা অনুধাবন করতে পারে না (ছুরাহ আল-বাক্বরাহ ২:১১-১২)

সারসংক্ষেপ (একনজরে):

জিহাদের ধরন

কখন ফরয হয়

হুকুম

নফস

সর্বদা

ফরযে আইন

লিসান

হক প্রচার যখন প্রয়োজন

ফরয:মুস্তাহাব

মাল

উম্মাহর আর্থিক সংকটে

ফরযে আইন : কিফায়া

ক্বলম

বাতিল মতবাদ ছড়ালে

ফরযে কিফায়া

সশস্ত্র

শত্রুর হামলা হলে

ফরযে আইন

রাষ্ট্রীয় অভিযান

সীমান্তে, দাওয়াহ প্রচারে

ফরযে কিফায়া

খারেজি মডেল

আত্মশুদ্ধিহীন, গোমরাহি

হারাম

কাদের বিরুদ্ধে হাক্বিকি জিহাদ করা হয়? – ক্বুরআন ও ছুন্নাহর নির্দেশিত টার্গেট

ভূমিকাঃ “জিহাদ” শব্দটি পবিত্র হলেও, তার অপপ্রয়োগ ভয়ংকর ফিতনায় রূপ নিতে পারে - যদি এটি ভুল মানুষের বিরুদ্ধে, ভুল পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় বর্তমান যুগে খারেজি সালাফি গোষ্ঠী “জিহাদ” নাম দিয়ে মুসলমানদের, অলি-আউলিয়াদের মাযারে হামলা করে; অথচ প্রকৃত কুফরি শক্তি, যালিম শাসক ও ইহুদি-নাসারাদের বিরুদ্ধে তারা নিরব থাকে ক্বুরআন ও ছ্বহীহ হাদীছ অনুসারে জিহাদের প্রকৃত টার্গেট নির্ধারণ করতে হবে, নয়তো হক্ব জিহাদও ফিতনায় রূপ নেবে

কারা জিহাদের টার্গেট নয়?

কারা

কেন নয়

আহলে কিবলা মুলমান

কারণ তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহবলে

নিরস্ত্র কাফের

ইছলাম শান্তিপূর্ণ দাওয়াত আগে দেয়

নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অক্ষম

রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিষেধ করেছেন

মওতা বা লাশ

সাধারণ মৃত কাফেরের মর্যাদা নষ্ট করা হারাম

মুনাফিক, কিন্তু প্রকাশ্যে ঈমানদার

কারণ তারা ফাসিক হলেও মুসলমান

(عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ، حَتَّى يَقُولُوا: لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَإِذَا قَالُوهَا، عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ، إِلَّا بِحَقِّهَا، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ») আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ “আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন আমি মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি, যতক্ষণ না তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই) বলে যখন তারা এটি বলবে, তখন তারা আমার পক্ষ থেকে নিজেদের রক্ত ও সম্পদকে নিরাপদ করবে, তবে শরীয়তের হক্ব অনুযায়ী ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের হিসাব মহান আল্লাহ তা’আলার উপর” (বুখারী ১৪০০, ২৯৪৬, ৬৯২৪, ৭২৮৫; মুছলিম ২০, ২১:১-৩; তিরমিযী ২৬০৬-৭, নাসায়ী ২৪৪৩, ৩০৯০-৯৩, ৩০৯৫, ৩৯৭০-৭৮; আবূ দাঊদ ২৬৪০, আহমাদ ৬৮, ১১৮, ৩৩৭, ২৭৩৮০, ৮৩৩৯, ৮৬৮৭, ৯১৯০, ২৭২১৪, ৯৮০২, ২৭২৮৪, ১০১৪০, ১০৪৪১, ১০৪৫৯, সহীহাহ ৪০৭, সহীহ আবু দাউদ ১৩৯১-১৩৯৩, ২৩৭৩)

কার বিরুদ্ধে হাক্বিকি জিহাদ করা হয়?

১) আল কাফিরুল মুয়ানিদ (الكَافِرُ المُعَانِدُ): যারা প্রকাশ্যে কুফরী করে, ইছলাম ধ্বংসের চেষ্টা করে এবং মুছলিমদের জান-মালের ক্ষতি করে তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ ফরজ

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (قَاتِلُوا الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ وَ لَا بِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَ لَا یُحَرِّمُوۡنَ مَا حَرَّمَ اللّٰهُ وَ رَسُوۡلُهٗ وَ لَا یَدِیۡنُوۡنَ دِیۡنَ الۡحَقِّ مِنَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡكِتٰبَ حَتّٰی یُعۡطُوا الۡجِزۡیَۃَ عَنۡ یَّدٍ وَّ هُمۡ صٰغِرُوۡنَ) যাদের ইতোপূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা মহান আল্লাহ তায়ালা ও আখিরাতের উপর ঈমান আনে না, মহান আল্লাহ তায়ালা ও রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম যা কিছু হারাম করেছেন তাকে হারাম (বলে স্বীকার) করে না, (সর্বোপরি) যারা সত্য দ্বীনকে (নিজেদের) জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই চালিয়ে যাও, যে পর্যন্ত না তারা পদানত হয়ে রক্ষার (আনুগত্যের কর হিসেবে) জিজিয়া দিতে শুরু করে। (ছুরাহ আত-তাওবা ৯:২৯)

এই আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে, আহলে কিতাবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুকুম এসেছে, যখন তারা ইছলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়

) দখলদার যালিম কাফের রাষ্ট্র (الدَّوْلَةُ الْكَافِرَةُ الظَّالِمَةُ الْمُحْتَلَّةُ): যারা মুছলিমদের ভূমি দখল করে, মুছলমানদের হত্যা করে, মসজিদ ধ্বংস করে, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ফরযে আইন যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَ مَا لَكُمۡ لَا تُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ الۡمُسۡتَضۡعَفِیۡنَ مِنَ الرِّجَالِ وَ النِّسَآءِ وَ الۡوِلۡدَانِ الَّذِیۡنَ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَاۤ اَخۡرِجۡنَا مِنۡ هٰذِهِ الۡقَرۡیَۃِ الظَّالِمِ اَهۡلُهَا ۚ وَ اجۡعَلۡ لَّنَا مِنۡ لَّدُنۡكَ وَلِیًّا ۚۙ وَّ اجۡعَلۡ لَّنَا مِنۡ لَّدُنۡكَ نَصِیۡرًا) তোমাদের কী হয়েছে, তোমরা কেন যুদ্ধ করো না মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে এবং সেইসব অসহায় পুরুষ, নারী ও (দুস্থ) শিশুদের মুক্তির জন্য, “যারা (এই বলে) ফরিয়াদ করেঃ হে আমাদের রব! যালিমদের এই জনপদ থেকে আমাদেরকে বের করে আনুন, এবং আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিবাবক ও সাহায্যকারী প্রেরণ করুন (ছুরাহ আন-নিছা ৪:৭৫)

এখানে দাওয়াতি কাজ কর্মের কোন আলাপ হচ্ছেনা, প্রতিরোধমূলক কিতালের নির্দেশ করা হয়েছে

৩) যালিম মুছলিম শাসক, যদি প্রকাশ্য কুফরি করেঃ সাধারণ যুলুম, ঘুষ, ফিস্ক, ইত্যাদির কারণে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা নিষিদ্ধ তবে যদি তারা স্পষ্ট কুফর করে, যেমন ক্বুরআন অস্বীকার, রছূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার অবমাননা, শরীয়ত বিরোধী আইন চাপিয়ে দেয়, তাহলে শরঈ শর্তে বিদ্রোহ অনুমোদিত হয় রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (إِلَّا أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا عِندَكُمْ مِنَ اللَّهِ فِيهِ بُرْهَانٌ) যতক্ষণ না তোমরা স্পষ্ট কুফরি দেখো, যার উপর মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে প্রমাণ রয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কোরো না” (বুখারী শরীফ ৭০৫৬)

৪ ইহুদি-নাসারার দালাল, মুনাফিক শক্তিঃ যারা মুসলমান সেজে ইছলামের ভিতর ফেতনা সৃষ্টি করে, কাফেরদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে, তারা “আসল শত্রু” মহান আল্লাহ পাক বলেনঃ (هُمُ ٱلْعَدُوُّ فَٱحْذَرْهُمْ ۚ قَٰتَلَهُمُ ٱللَّهُ ۖ أَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ) তারা-ই আসল শত্রু, তাদের থেকে সাবধান হওআল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন (ছুরাহ আল-মুনাফিকূনঃ ৬৩:৪)

খারেজি, সালাফি, আধুনিক উদারপন্থী, প্রগতিশীল ইজম — এরা আজকের মুনাফিক গোষ্ঠী, যারা ইছলামের ভিতর থেকেই কুফর প্রতিষ্ঠা করে

৫ বাতিল ফেরকা যারা ইছলামের নামে কুফরি চালায় যেমনঃ

আহলে ক্বুরআন,

বেনবাজি সালাফি,

ইছলামের ভিত্তি অস্বীকারকারী শিয়া রাফেজি

এদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও প্রয়োজনে কিতাল প্রকারের জিহাদ বৈধ, যদি রাষ্ট্রীয় অনুমোদন থাকে

সারসংক্ষেপ: কাদের বিরুদ্ধে, কোন জিহাদ?

টার্গেটঃ স্পষ্ট কাফের

জিহাদের ধরনঃ কিতাল/দাওয়াহ

শর্তঃ দাওয়াহ দিলে না মানলে কিতাল

টার্গেটঃ দখলদার শত্রু

জিহাদের ধরনঃ প্রতিরক্ষামূলক কিতাল

শর্তঃ ফরযে আইন

টার্গেটঃ যালিম মুছলিম শাসক

জিহাদের ধরনঃ ফতোয়া, হিজর, কখনো কিতাল

শর্তঃ কুফর স্পষ্ট হলে

টার্গেটঃ মুনাফিক দালাল

জিহাদের ধরনঃ বুদ্ধিবৃত্তিক ও মিডিয়া যুদ্ধ

শর্তঃ দলিল, যুক্তি, কলম

টার্গেটঃ বাতিল ফেরকা

জিহাদের ধরনঃ ক্বলম ও উম্মাহকে হেফাজতের যুদ্ধ

শর্তঃ রাষ্ট্রীয় অনুমোদন জরুরি

জিহাদ পরিচালনার অধিকার কাদের?

ব্যক্তির?

গোষ্ঠীর?

রাষ্ট্রের?

আহলুল হাল ওয়াল আকদ এর?

“জিহাদ পরিচালনার অধিকার কাদের?” – শরয়ী অনুমোদনের ব্যাখ্যা

ভূমিকাঃ জিহাদ যেমন একটি ঈবাদাত, তেমনি এটি একটি শরয়ী রাষ্ট্রীয় ও সামষ্টিক দায়িত্ব কেউ যদি নিজের খেয়ালে, ব্যক্তিগত উগ্রতা বা আবেগ থেকে জিহাদ পরিচালনা করতে চায় - তবে তা জিহাদ নয় বরং ফাসাদ তাই ক্বুরআন ও হাদীছ অনুযায়ী নির্ধারিত করতে হবে - কে জিহাদ পরিচালনার অধিকার রাখে

ভুল ধারণাঃ যে কেউ জিহাদ শুরু করতে পারে

আজকের যুগে যেভাবে আইএস, আল-কায়েদা, খারেজি সালাফি দলগুলো- নিজেরা নেতা বানিয়ে নেয়, নিজেদের গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে জিহাদ ঘোষণা করে - এটা শরয়ী বিদ্রোহ, যা রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিষিদ্ধ করেছেন

ক্বুরআন শরীফে নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার গুরুত্বঃ (يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَأُو۟لِى ٱلْأَمْرِ مِنكُمْ) হে মুমিনগণ! তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার আনুগত্য করো, আনুগত্য করো রছূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলুল আমর তাদেরও আনুগত্য করো (ছুরাহ আন-নিছাঃ ৪:৫৯)

এই আয়াত শরীফের তাফসিরে ইমাম কুরতুবী রহমতুল্লাহ বলেনঃ “যে শাসক শরিয়তের পরিপন্থী নয়, তার নেতৃত্ব মানা ফরয - জিহাদ হোক বা শান্তি”

হাদীছ শরীফে স্পষ্ট বর্ণনাঃ (إِنَّمَا الْإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ) “ইমাম (খলীফা/রাষ্ট্রনেতা) হলেন ঢাল, যার পেছনে থেকে যুদ্ধ করা হয়, আর যার মাধ্যমে শত্রুদের থেকে রক্ষা পাওয়া যায়” (বুখারী শরীফ ২৯৫৭, মুছলিম শরীফ ১৮৪১)

অর্থাৎ: জিহাদের নেতৃত্ব একজন ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া কারও হাতে বৈধ নয়

আহলুল হাল ওয়াল আকদ (أهل الحل والعقد): উলামা, ফকীহ, অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ যারা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে শরীয়তের প্রতিনিধি - তাদের সমর্থন ছাড়া কেউ ইজতিহাদ করে জিহাদ ঘোষণাকরতে পারে নাইমাম নববী রহমতুল্লাহ বলেন (শরহে মুছলিম): জিহাদ ঘোষণার অধিকার কেবলমাত্র সেই নেতৃত্বের, যার মাধ্যমে উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ থাকে

কারা জিহাদ পরিচালনার অধিকার রাখে?

ইছলামী রাষ্ট্রের ইমামঃ খলীফা > সহীহ বুখারী ২৯৫৭

আহলুল হাল ওয়াল আকদ (উলামা পরিষদ) > সূরা নিসা: ৫৯

যুদ্ধক্ষেত্রে নিযুক্ত কমান্ডার > ইমামের আদেশক্রমে

আত্মরক্ষার প্রয়োজনে ব্যক্তি > শত্রু আক্রমণ হলে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ

কারা অধিকার রাখে নাঃ

ব্যাক্তি বা গোষ্ঠী যারা নিজে নিজে “আমীর” হয় > কারণ শরিয়ত বহির্ভূত

উগ্রবাদী সালাফি-খারেজি দল > কারণ আক্বিদা বিকৃত, নেতৃত্ব বৈধ নয়

বিদেশি এজেন্টঃ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত গোষ্ঠী > ইছলামী নয়, ফিতনা

বর্তমান যুগে করণীয়ঃ যেহেতু এখন খিলাফাহ নেই, এবং অধিকাংশ মুছলিম রাষ্ট্র পশ্চিমাদের এজেন্ট, তাইঃ

জিহাদ বলতে এখন নফস, ইলম, কলম ও দাওয়াহর জিহাদই সর্বাধিক জরুরি

রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে দখলদার শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বৈধ

ব্যক্তিগতভাবে জিহাদ ঘোষণার অধিকার কারো নেই

উপসংহারঃ জিহাদ পরিচালনার অধিকার ব্যক্তির নয়, বরং শরয়ী নেতৃত্ব ও স্বীকৃত উলামা:ইছলামিক রাষ্ট্রেরনেতৃত্বহীন জিহাদআসলে জিহাদ নয়, বরং তা ইহুদি-নাছারার পরিকল্পিত ফিতনা