Tuesday, January 27, 2026

ছ্বলাফ ও ছালফে ছ্বলেহীনদের তাওয়াচ্ছুল এবং ইস্তগ্বছাহ

ছ্বলাফ ও ছালফে ছ্বলেহীনদের তাওয়াচ্ছুল এবং ইস্তগ্বছাহ

অনলাইনে কিছু মরদুদ শয়তান আছে যারা নিজেদের ছ্বলাফি দাবী করে, বিপরীতে আহলে ছুন্নতের যারা প্রকৃত অনুসারী অর্থাৎ ছুন্নী, তাদের মাজারপূজারী, কবর পূজারী বলে তাকফির করে। যখন তাদের বলা হয় দলিল কি? তখন বলে ছ্বলাফদের কেউ মাজার যান নাই, উনারা কেউ কবর পূজারী না, অর্থাৎ তাদের ভাষ্যমতে কেউ বুজুর্গ অলী আউলিয়ার মাজার শরীফে জিয়ারতে গেলেই সেটা পূজা, যে যায় সে পূজারী, নাউযুবিল্লাহ।

তাদের যাদের ছ্বলাফ মনে করে, আর উনাদের অনুসরণ করে নিজেদের বাজার ঠিক রাখে, আদতে কি তাদের আক্বিদাহ-আমলের সাথে তাদের কোন মিল আছে? মোটেও নাই, এই মুনাফিকেরা ছ্বলাফদের উপর ও তাদের নাপাক তাকফির পতিত করে আম পাবলিকের উপর তাকফির করে।

হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (حَدَّثَنَا الحُسَيْنُ بْنُ إِسْحَاقَ التُّسْتَرِيُّ، حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ يَحْيَى الصُّوفِيُّ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ سَهْلٍ، حَدَّثَنِي أَبِي، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عِيسَى، عَنْ زَيْدِ بْنِ عَلِيٍّ، عَنْ عُتْبَةَ بْنِ غَزْوَانَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ: إِذَا أَضَلَّ أَحَدُكُمْ شَيْئًا أَوِ احْتَاجَ إِلَى غَوْثٍ وَهُوَ بِأَرْضٍ لَيْسَ فِيهَا أَنِيسٌ فَلْيَقُلْ: يَا عِبَادَ اللَّهِ أَغِيثُونِي، فَإِنَّ لِلَّهِ عِبَادًا لَا نَرَاهُمْ) হুছাইন ইবন ইছহাক আত-তুস্তরি আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেনতিনি বলেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন আহমদ ইবন ইয়াহইয়া আছ-ছূফিতিনি বলেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন আব্দুর রহমান ইবন ছাহলতিনি বলেন, আমার কাছে বর্ণনা করেছেন আমার পিতা, তিনি আব্দুল্লাহ ইবন য়ী’ছা থেকে, তিনি জায়েদ ইবন য়া’লী থেকে, তিনি উতবা ইবন গাযওয়ান রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেনতিনি বলেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কারো যদি কোনো জিনিস হারিয়ে যায়, অথবা সে এমন কোনো জায়গায় সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করে যেখানে কোনো মানুষ নেই, তবে সে বলবেঃ “হে আল্লাহ তা’য়ালার বান্দারা, আমাকে সাহায্য করুন” কারণ নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালার এমন অনেক বান্দা আছেন, যাদের আমরা দেখতে পাই না (কিতাবঃ আল-মু’জামুল কাবীর লিত-ত্ববারানী। খণ্ডঃ ১৭ হাদীছ নম্বরঃ ১১৭, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/১৩২)

হাদিছে আরো এসেছেঃ (حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ نَائِلَةَ الأَصْبَهَانِيُّ، حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عُمَرَ بْنِ شَقِيقٍ، حَدَّثَنَا مَعْرُوفُ بْنُ حَسَّانَ السَّمَرْقَنْدِيُّ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي عَرُوبَةَ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُرَيْدَةَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ: إِذَا انْفَلَتَتْ دَابَّةُ أَحَدِكُمْ بِأَرْضٍ فَلْيُنَادِ: يَا عِبَادَ اللَّهِ احْبِسُوا، فَإِنَّ لِلَّهِ مَلَائِكَةً فِي الْأَرْضِ يُحْبِسُونَهَا) ইবরাহীম ইবন নাইলা আল-আছফাহানী আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেনতিনি বলেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন হাছান ইবন উমর ইবন শাক্বীকতিনি বলেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন মা‘রূফ ইবন হাছছান আস-সমরকন্দীতিনি ছাঈদ ইবন আবী আরূবা থেকে, তিনি কাতাদা থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবন বুরাইদা থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবন মাছ’উদ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেনতিনি বলেন, “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কারো বাহন যদি কোনো জায়গায় (হঠাৎ) ছুটে পালিয়ে যায়, তবে সে ডেকে বলবে ‘হে আল্লাহ তা’য়ালার বান্দারা, একে থামাও’ কারণ নিশ্চয়ই পৃথিবীতে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার এমন ফেরেশতা আছেন, যারা সেটিকে থামিয়ে দেন”। (কিতাবঃ আল-মু‘জামুল কাবীর লিত-ত্ববারানী, খণ্ড ১০ হাদীছ নম্বর ১০৫১৮)

উক্ত হাদিছের বিষয়ে কিছু মুহাদ্দিছের মন্তব্য হচ্ছে ইহা দ্বয়ীফ। কিন্তু আমি দেখলাম উক্ত হাদিছের উপর য়া’মল করেছেন চতুর্থ মাজহাবের ইমাম, সকল ছুন্নী, ওহাবী, ছালাফি, দেওবন্দী, ফেরকার নিকট যিনি ১০০% গ্রহণযোগ্য সেই ইমাম, হযরত আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহী য়ালাইহি।

উনার য়ামলের দলিল হিসেবে যে বিশুদ্ধ রেওয়ায়েত পাওয়া যায় তা হলোঃ (قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَحْمَدَ بْنِ حَنْبَلٍ: سَمِعْتُ أَبِي أَحْمَدَ بْنَ حَنْبَلٍ يَقُولُ: حَجَجْتُ خَمْسَ حِجَجٍ، فَفِي إِحْدَاهُنَّ ضَلَلْتُ الطَّرِيقَ، فَجَعَلْتُ أَقُولُ: يَا عِبَادَ اللَّهِ أَرُونِي الطَّرِيقَ، فَمَا زِلْتُ أَقُولُ ذَلِكَ حَتَّى وَجَدْتُ الطَّرِيقَ) ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল রহমতুল্লাহ-এর পুত্র আব্দুল্লাহ বলেনঃ “আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি; আমি পাঁচবার হজ্জ আদায় করেছিসেই হজ্জগুলোর (একটিতে) একবার আমি পথ হারিয়ে ফেলেছিলামতখন আমি বলতে থাকি ‘হে আল্লাহ তা’য়ালার বান্দারা, আমাকে পথ দেখান’ আমি এভাবে বলতে থাকি, শেষ পর্যন্ত আমি সঠিক পথটি পেয়ে যাই (কিতাবঃ মাছায়িলুল ইমাম আহমদ, সংকলকঃ আব্দুল্লাহ ইবন আহমদ ইবন হাম্বল, অধ্যায়ঃ হজ্জ সংক্রান্ত বর্ণনা, ইমাম আহমদের হজ্জের ঘটনা বিষয়ক আছার, পৃষ্ঠা ২১৭ বা ২৪৫ বিভিন্ন সংস্করণে, এছাড়াও শু‘বুল ঈমান লিল-বায়হাকী, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ১৪১, তারীখ দিমাশক লি ইবন আসাকির খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৯৮, আল-আদাবুশ শার‘ইয়্যাহ লি ইবন মুফলিহ খণ্ড ১, সংশ্লিষ্ট অধ্যায়)

ইছলাম ওয়েব-এর ফতোয়াঃ

ফতোয়া শিরোনামঃ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহ উনার দোয়া শিরক নয় মর্মে ছালাফিদের ফাতওয়া, নম্বরঃ ৩৮৪৯৪৬

ইমাম ইবনু হিব্বান আল-বুস্তী রহিমাহুল্লাহ বিছাল শরিফঃ ৩৫৪ হিজরী, তিনি উনার কিতাবুছ্‌-ছিকাত “كتاب الثقات” গ্রন্থে, যেটা হাদিছের রাবিদের জীবনীগ্রন্থ বিষয়ে লিখিত, যেখানে কেবল বিশ্বস্ত (ثقة) রাবিদের নাম উল্লেখ আছে হাদিছের সনদ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যাদের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য, তাদের নাম, শায়েখ, ছাত্র, এবং সংক্ষিপ্ত তথ্য লিপিবদ্ধ করেন।

উক্ত কিতাবে ইমাম নিজের একটি ঘটনা বর্ননা করেন, যেখানে তিনি বলেনঃ (قد زرته مرارًا كثيرة وما حلت بي شدة في وقت مقامي بطوس زرت قبر علي بن موسى الرضا صلوات الله على جده وعليه، ودعوت الله إزالتها عني إلا استجيب لي وزالت عني تلك الشدة، وهذا شيء جربته مرارًا فوجدته كذلك، أمانتنا محبة المصطفى وأهل بيته صلى الله عليه وعليهم أجمعين) উক্ত আরবি ইবারতের খোলাছা হলোঃ আমি বহুবার ইমাম আলী ইবন মূসা আল-রিদ্বা য়া’লাইহিছ ছালামের মাজার জিয়ারত করেছিআর তুস শহরে অবস্থানকালে যখনই কোনো বিপদ আমার উপর এসেছে, আমি মহান আল্লাহ তা’য়ালার কাছে সেই বিপদ দূর করার জন্য তাঁর মাজারে গিয়ে, নবী করীম রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া আ’লা আলিহি ওয়া ছাল্লাম এবং ইমাম আলী ইবন মূসা আল-রিযা (আলাইহিস সালাম)-এর উপর দরূদ পাঠ করে, মহান আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে দোয়া করেছিতখনই আমার দোয়া কবুল হয়েছে এবং সেই কষ্ট দূর হয়ে গেছেএটি এমন একটি বিষয় যার অভিজ্ঞতা বহুবার আমি নিজে লাভ করেছি এবং প্রতিবারই আমি সাহায্য পেয়েছিআমাদের নিকট সবচেয়ে বড় আমানত হলোঃ রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়া’লাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এবং উনার আহলে বাইতের প্রতি মুহব্বত। (কিতাবুছ্‌-ছিকাতঃ পঞ্চম জিলদ, পৃষ্টা ৩২৫-২৬)

এই হলো ছ্বলাফদের আক্বিদাহ, মাজার শরিফ/কবর শরীফের ব্যপারে, এখন কেউ যদি এগুলোকে পূজা বলে আবার নিজের পরিচয় দিতে গেলে উনাদের নাম ব্যবহার করে তাহলে তারা মুনাফিক ব্যতীত আর কিছুই নয়।

আরেকটি ঘটনাঃ ইমাম ইবনু হাজার আল-আসকালানী রহিমাহুল্লাহ, বিছাল শরীফ ৮৫২ হিজরী। তিনি উনার রচিত বিখ্যাত রিজাল গ্রন্থ “تهذيب التهذيب” তাহযীবুত তাহযীব এর পঞ্চম খন্ডের ২৪০ পৃষ্টায়, ইমাম ইবনে খুজাইমাহ রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। ইমাম ইবনে খুজাইমাহ রহিমাহুল্লাহ, যিনি ইমামুল আয়্যিম্মাহ, ঐ ইমামুল আহলুল হাদিছ, যিনি ইমাম আলী ইবন মূসা আল-রিদ্বা য়া’লাইহিছ ছালামের মাজার শরীফে তাবারুক লাভ করতে যেতেন। ইমাম ইবনু হাজার আল-আসকালানী রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ (قال: وسمعت أبا بكر محمد بن الحسن بن عيسى يقول: خرجنا مع إمام أهل الحديث أبي بكر بن خزيمة، وعديله أبي علي الثقفي، مع جماعة من مشايخنا وهم إذ ذاك مَمَّمُوا إلى زيارة قبر علي بن موسى الرضا بطوس، قال: فرأيت من تعظيمه – يعني ابن خزيمة – لتلك البقعة، وتواضعه لها، وتضرعه عندها ما تحيّرنا.) আমি আবু বকর মুহাম্মদ ইবন আল-হাসান ইবন ঈসা-রহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি আমরা ইমামুল মুহাদ্দিসীন আবু বকর ইবন খুযাইমাহ রহিমাহুল্লাহ এবং উনার সঙ্গী আবু আলী আস-সাকাফি রহিমাহুল্লাহ’র সাথে, আমাদের শায়খদের একটি জামাত নিয়ে বের হয়েছিলাম, যখন উনারা সবাই ইমাম আলী ইবন মূসা আল-রিদ্বা য়া’লাইহিছ ছালামের মাজার শরীফের জিয়ারতের উদ্দেশ্যে তুসের দিকে যাচ্ছিলেনইমাম বলেনঃ আমি ইবন খুযাইমাহ রহিমাহুল্লাহ’র পক্ষ থেকে সেই পবিত্র স্থানের প্রতি যে গভীর সম্মান, উনার মাজারের তাযীম, এবং সেখানে বিনীতভাবে দোয়া করার এমন অবস্থা দেখেছি - যা দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম (অর্থাৎ এতো বড় একজন ইমামুম আহলে হাদিছ ক্ববরে আহলে বাইতের দিকে রুজু হয়েছেন) (তাহযীবুত তাহযীবঃ পঞ্চম খন্ড, ২৪০ পৃষ্টা)

এরা দাবী করে ছ্বলাফি, আহলে হাদিছ, কিন্তু বাস্তবে এরা আহলে ইবলিশ, কেননা যদি তারা আদতেই ছ্বলাফ, ও আহলুল হাদিছের মুহাদ্দিছদের অনুসারী হতো তাহলে তারা নিশ্চয়ই তাদের ইতিহাস, আক্বিদাহ, আমল সম্পর্কে অবগত হতো।

ব্রেইন ওয়াশ করা খারেজিরা দলিলাদিল্লায় সন্তুষ্ট হয়না তাদের নাকি কিতাবি শায়েখ লাগে, নেও একেবারে আরবি ভাষী, কিতাবি, ডিগ্রি, সার্টিফিকেট ওয়ালা শায়েখ এর জবানি দিলাম

Tawassul & Istighathah - Is seeking aid from other than Allah Shirk?

- By Hamzah Al-Bakri

ড. হামযাহ আল-বাকরী (Dr. Hamzah Al-Bakri)

১৯৮২ সালে জর্ডানে জন্মগ্রহণকারী ড. হামযাহ মুহাম্মদ ওয়াসিম বাকরী ২০০৪ সালে আল-বালকা অ্যাপ্লাইড ইউনিভার্সিটি থেকে সম্মানের সাথে ধর্মতত্ত্ব ও শরীয়াহর “Methodology of Religion” বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এরপর তিনি জর্ডান বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদীস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর (MA) এবং পিএইচডি (PhD) সম্পন্ন করেন

ড. বাকরী হাদীস ও ইসলামি জ্ঞানচর্চায় বহু উপকারী প্রবন্ধ ও গবেষণা রচনা করেছেনবর্তমানে তিনি তুরস্কের ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি বিজ্ঞান অনুষদে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন

এর পাশাপাশি তিনি ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠানে যেমন - সুলতান আহমেদ ভাক্‌ফ, EDEP, ISM, এবং ISAM-এ কালাম, আকীদাহ, ফিকহ, উসূল-উল-ফিকহ ও হাদীস বিষয়ে পাঠদান করেছেন এবং এখনো শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন

অফিসিয়াল লিংক [https://iss.ihu.edu.tr/tr/summer-school-instructors]

মুফতি ছাড়া নাকি কেউ ফতওয়া দিতে পারবেনা?

মুফতি ছাড়া নাকি কেউ ফতওয়া দিতে পারবেনা?

মুফতি ছাড়া নাকি কেউ ফতওয়া দিতে পারবেনা? মুফতি হতে নাকি কথিত মাদ্রাসার সার্টিফিকেট লাগবে, ইজাজাহ লাগবে? এই দাবী কি ভ্যালিড?

আল কুরআনে কিংবা হাদিছ শরীফে “মুফতী” শব্দ বা পদ ব্যবহার করার হুকুম আছে কি?

উত্তরঃ নাকুরআনে “মুফতী” শব্দ নেইতবে আছে ইস্তিফতা (হুকুম জিজ্ঞাসা করা) প্রসঙ্গমহান আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ (یَسۡتَفۡتُوۡنَكَ ؕ قُلِ اللّٰهُ یُفۡتِیۡكُمۡ فِی الۡكَلٰلَۃِ) তারা আপনার নিকট ফতোয়া জানতে চায়; আপনি বলুন মহান আল্লাহ তায়ালাই তোমাদেরকে কালালাহ বিষয়ে ফতোয়া দেন(ছুরাহ আন-নিছা ৪:১৭৬)

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ফতোয়া দিচ্ছেন স্বয়ং মহান আল্লাহ তায়ালা, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম কেবল পৌঁছে দিচ্ছেনএখানে কোথাও বলা হয়নি “মুফতী নামে একটি পদ থাকবে”।

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম কি কাউকে “মুফতী” বানিয়েছিলেন?

না, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামঃ

কাউকে ক্বারী হিসেবে পাঠিয়েছেন

কাউকে মু‘আল্লিম বানিয়েছেন

কাউকে ক্বাযী হিসেবে পাঠিয়েছেন

কাউকে আমীর/নাযির বানিয়েছেন

কিন্তু কোথাও বলেননিঃ “আমি তোমাকে মুফতী বানালাম” - এমন কোনো ছ্বহীহ হাদীছ শরীফ আমার জানা নেই। (কারো জানা থাকলে পেশ করুক)

বরং তিনি সতর্ক করেছেন এই বলে যে, “যে ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়াই ফতোয়া দেয়, তার গুনাহ তার উপর”। তিনি য়ালাইহিছ ছ্বলাতু ওয়াছ ছালাম বলেনঃ (عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ يَقُولُ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَعَلَىٰ آلِهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا يَنْتَزِعُهُ مِنَ النَّاسِ، وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ، حَتَّىٰ إِذَا لَمْ يَتْرُكْ عَالِمًا اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوسًا جُهَّالًا، فَسُئِلُوا فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ، فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا) আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ‘স রদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, আমি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের অন্তর থেকে হঠাৎ করে টেনে নিয়ে জ্ঞান উঠিয়ে নেন না; বরং য়া’লিমদেরকে তুলে নেওয়ার মাধ্যমেই জ্ঞান উঠিয়ে নেনঅতঃপর যখন তিনি আর কোনো য়া’লিম অবশিষ্ট রাখেন না, তখন মানুষ অজ্ঞ লোকদেরকেই নেতা বানিয়ে নেয়এরপর তাদেরকে প্রশ্ন করা হলে তারা জ্ঞান ছাড়া ফতোয়া দেয়; ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হয় এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করে (ছ্বহীহ বুখারী, কিতাবুল য়ী’লম, হাদীস নং ১০০ ছ্বহীহ মুছলিম, কিতাবুল য়ী’লম, হাদীছ নং ২৬৭৩ ছুনানে আবু দাউদ, হাদীছ নং ৩৬৫৭ ছুনানে তিরমিযী, হাদীছ নং ২৬৫২। “এই হাদীসটি মুত্তাফাকুন আলাইহ” অর্থাৎ বুখারী ও মুছলিম উভয়েই বর্ণনা করেছেন)

অর্থাৎ ফতোয়া দেওয়া একটি দায়িত্ব, কোনো ফখরের উপাধি নয়, এর জন্য য়ী’লম অর্জন ফরজ সার্টিফিকেট নয়। আজকাল মুফতির সার্টিফিকেট তো লাখ টাকা খরচ করলেই পাওয়া যায়, কিন্তু কোটি টাকা দিলেও তো য়া’লীম হওয়া সম্ভব না।

তাছাড়া, বর্তমানে মুছলমান দলে উপদলে বিভক্ত, প্রত্যেক গ্রুপের নিজস্ব মুফতি অন্য দলের উপর তাদের বিরুদ্ধে ফতওয়া দিচ্ছে, কোন এক বিষয়ে একদল ফরজ বলছে, একদল ছুন্নত বলছে, একদিল বিদআত বলছে, একদল যায়েজ বলছে, মানে মুফতিরাই মুফতিদের ফতওয়া মানেনা উলটো এক মুফতি অন্য মুফতিকে বাতিল বলে ফতওয়া দিয়ে থাকে, এখন তাহলে মুফতির কি কোন বেইল আর রইলো?

তাহলে ফতোয়া দেওয়ার বৈধতা কার জন্যে?

এখানে কুরআনের মূল উছুল হচ্ছেনঃ (فَسۡـَٔلُوٓا۟ أَهۡلَ ٱلذِّكۡرِ إِن كُنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ) (দ্বীনের কোন বিষয়ে) যদি তোমরা না জানো, তবে (যারা) আহলে জিকর তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো। (ছুরাহ আন-নাহল ১৬:৪৩, আল-আম্বিয়া ২১:৭)

এখানে বলা হয়েছে “আহলে জিকর” বলা হয়নি “মুফতী” উপাধিধারীর কাছে যাও। অর্থাৎ- প্রথমতো যার ক্বলবে জিকরে ইলাহী রয়েছে, যে কিতাব এর জাহির/বাতিন বোঝে, যে নাস বোঝে, যে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে রায় দিবে নিজের নফছের রায় না দিয়ে।

কিন্তু তাজ্জুব বিষয় হলো, আহলে জিকরের অনুবাদ বাংলা ইংরেজীতে যা করে থাকে অনুবাদকেরা তা হলো “কিতাবুল্লাহ এর জ্ঞান যারা রাখে/জ্ঞানীরা” অথচ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বা মহান আল্লাহ তায়ালা এরূপ বলেন নাই।

প্রশ্ন হচ্ছেঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের চেয়ে কি আল কুরআনের শব্দের মানে আমরা বেশী জানি নাকি বুঝি?

আসুন কুরআন ও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম দিয়েই কুরআন বুঝি, যা সর্বচ্চো নির্ভরযোগ্য। মহান আল্লাহ তায়ালা ছুরাহ নাহল-এর ৪৩ নম্বর আয়াতে বলেনঃ (فَسۡـَٔلُوٓا۟ أَهۡلَ ٱلذِّكۡرِ إِن كُنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ) (দ্বীনের কোন বিষয়ে) যদি তোমরা না জানো, তবে (যারা) আহলে জিকর তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলোঃ মহান আল্লাহ তায়ালা আহলে জিকর শব্দটি ব্যবহার করেছেন; তিনি বলেননি ফাছআলুল-উলামা, ফাছআলুল-ফুকাহা বা ফাছআলুল-মুফতূনঅর্থাৎ, প্রশ্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এমন এক শ্রেণির দিকে, যাদের পরিচয় কোনো ডিগ্রি বা টাইটেল দ্বারা নয়, বরং “জিকর”-এর সাথে বাস্তব সংযুক্তি দ্বারা নির্ধারিত

এই আয়াত শরীফের ঠিক পরের আয়াতে, অর্থাৎ ছুরাহ নাহল ১৬:৪৪, বিষয়টিকে একেবারে ফয়সালার জায়গায় নিয়ে যায় মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (بِٱلۡبَيِّنَٰتِ وَٱلزُّبُرِۗ وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلذِّكۡرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيۡهِمۡ وَلَعَلَّهُمۡ يَتَفَكَّرُونَ) অর্থাৎ, স্পষ্ট নিদর্শন ও (পূর্ববর্তী রাসূলদের উপর নাজিলকৃত) কিতাবসমূহসহ, এবং আপনার উপর আমি নাযিল করেছি জিকির (আল কুরআন) যাতে আপনি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে তা বয়ান করেন, যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে

এই আয়াত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় যে, এই উম্মাহর জন্যে “জিকর” প্রথমে কার কাছে নাযিল হয়েছে এবং কে সেটার ব্যাখ্যাকারীজিকর নাযিল হয়েছে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের উপর, এবং সেই জিকর ব্যাখ্যা করার দায়িত্বও উনাকেই দেওয়া হয়েছেসুতরাং কুরআনের ধারাবাহিকতায় (সিয়াক-সিবাক অনুযায়ী) “আহলে জিকর” বলতে সর্বপ্রথম ও মৌলিকভাবে বোঝায়, “যিনি জিকরের বাহক ও বয়ানকারী, অর্থাৎ নবীজি নিজেইউনার বাইরে যারা আসবেন, তারা আহলে জিকর হবেন উনার বয়ানের অনুসরণ ও সংযুক্তির মাত্রা অনুযায়ী, নিজেদের স্বতন্ত্র কর্তৃত্ব হিসেবে নয়

এই কুরআনিক অর্থকে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজেই হাদীসে ব্যবহারিকভাবে স্পষ্ট করেছেনছ্বহীহ হাদীসে এসেছেঃ (إِنَّ لِلَّهِ مَلَائِكَةً يَطُوفُونَ فِي الطُّرُقِ، يَلْتَمِسُونَ أَهْلَ الذِّكْرِ، فَإِذَا وَجَدُوا قَوْمًا يَذْكُرُونَ اللَّهَ، تَنَادَوْا: هَلُمُّوا إِلَى حَاجَتِكُمْ) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালার কিছু ফেরেশতা রয়েছেন, যারা দুনিয়ার (জমিনে) পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ান এবং মহান “আহলে জিকরদের” সন্ধান করেনযখন তারা এমন কোনো মাহফিল পেয়ে যান, যেখানে মহান আল্লাহ তা’য়ালার জিকির করা হচ্ছে। (বুখারি শরীফ ৬৪০৮, মুছলিম শরীফ ২৬৮৯) হাদিছে বিস্তারিত বৈশিষ্ট রয়েছে, অনেক বড় হাদিছ এইখানে প্রয়োজনীয় অংশ দেওয়া হয়েছে কেবল।

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলোঃ নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম “আহলে জিকর” শব্দটি নিজেই ব্যাখ্যা করে দিয়েছেনতিনি বলেননিঃ “যারা কিতাবের জ্ঞান রাখে” বা “যারা আলিম”; বরং সঙ্গে সঙ্গে বলেছেন (قَوْمًا يَذْكُرُونَ اللَّهَ) একটি দল যারা বাস্তবে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকরে লিপ্ত রয়েছেঅর্থাৎ, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ভাষায় “আহলে জিকর” মানে হলোঃ “যারা জিকর, তাছবিহ-হামদ, ও দোয়ার মাহফিলে নিমজ্জিত, যাদের ক্বলবে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির, ওহী ও তার জীবন্ত সংযোগ আছে

এখন এই কুরআন ও হাদীসের আলোকে স্পষ্ট হয় যে, “আহলে জিকর”-কে বাংলায় “কিতাবুল্লাহর জ্ঞানীরা” বা “আলিমগণ” বলে অনুবাদ করা শব্দগত অনুবাদ নয়, বরং একটি তাফসিরি পার্সোনাল সিদ্ধান্ত, যেটাকে অনুবাদের জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছেঅনুবাদে যেখানে মহান আল্লাহ তায়ালা ও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম যে শব্দ ব্যবহার করেছেন সেটাই রাখা উচিত ছিল, সেখানে ব্যাখ্যাকে মূল অর্থ বানানো হয়েছেঅথচ নবীজি নিজেই যখন “আহলে জিকর” শব্দের ব্যবহারিক মানে দেখিয়ে দিয়েছেন, তখন এর বাইরে গিয়ে নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করানো নাসের উপর নিজের বোজ-জ্ঞানকে প্রাধান্য দেওয়ারই শামিল

সবশেষে ছুরাহ নাহল ১৬:৪৪-এর শেষ অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণঃ (وَلَعَلَّهُمۡ يَتَفَكَّرُونَ) যাতে তারা চিন্তা করেঅর্থাৎ, আল কুরআনের উদ্দেশ্য মানুষকে শুধু তথ্য দেওয়া নয়; বরং ওহী, নবীজির বয়ান এবং বাস্তব জিকরের আলোকে চিন্তা ও অনুধ্যানের দিকে নিয়ে যাওয়াএই তাফাক্কুর তখনই সঠিক হবে, যখন শব্দের মানে নবীজির নির্ধারিত সীমার ভেতর থাকবে, তার বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে রূপান্তর করা হবে না আর তাফাক্কুরের জন্যে লাগবে এমন ক্বলব যেটায় নূর বিদ্যমান, আর নূর তো ইছমে জাত আল্লাহ উনার নামের বাহীরে হাছিল করা অসম্ভব, তাই উনি আহলে জিকর হিসেবে জিকরের মাহফিলে মত্ত থাকা লোকদের দিকেই নিছবত করেন। কেননা জবাব দিতে হলে আবে নিজে বোঝা ফরজ, আর বুঝতে হলে ক্বলব হতে হবে নূরানী, আর নূরানী ক্বলব কেবল জিকিরকারী ক্বলব ওয়ালাদের নিকট থাকে।

সুতরাং নাস-ভিত্তিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলোঃ “আহলে জিকর”কে “কিতাবুল্লাহর জ্ঞানীরা/আলিমগণ” বলে অনুবাদ করা কুরআন ও ছ্বহীহ হাদীসের আলোকে অনুবাদগতভাবে সঠিক নয়; এটি একটি তাফসিরি নিজস্ব ব্যাখ্যা মাত্রকুরআনের শব্দ কুরআনেরই থাকবে, আর তার মানে নির্ধারণে নবীজির বয়ানই চূড়ান্ত মাপকাঠি, এর বাইরে যাওয়ার কোনো বৈধতা নেই

অতএব ফতোয়া কেবল মুফতি দিতে পারে এইসব দাবীর কোন কুরআন-হাদিছের ভিত্তি নাই, বরং এরূপ দাবী আদতে বিদআত বলেই গন্য হবে।

ছালাফে ছ্বলিহীনের যুগে কী ছিল?

ছাহাবায়ে কেরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমঃ-

কেউ নিজেকে “মুফতী” বলে পরিচয় দিতেন না।

বরং ফতোয়া দিতে ভয় পেতেন।

একে অন্যের দিকে প্রশ্ন ঠেলে দিতেন।

ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, যায়েদ ইবনে সাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমারা ফতোয়া দিতেন, কিন্তু উপাধি হিসেবে নয়; দায়িত্ব হিসেবে

তাহলে আজ “মুফতী” উপাধির হুকুম কী?

এখানে আক্বিদাহ-সম্মত ও নাস-ভিত্তিক সিদ্ধান্তঃ-

“মুফতী” কুরআনি বা নববী কোনো শরঈ পদ নয়

এটি পরবর্তীকালে মাদরাসা-নির্ভর টেকনিক্যাল টার্ম

ফখর করে, অহংকার করে, নিজের নামের আগে জুড়ে নেওয়া আহলুছ ছুন্নাহ এর তো নয়ই এমনকি কথিত ছালাফি মেথডও নয়।

মুদ্দাকথা, য়ী’লম থাকলে মানুষ জিজ্ঞাসা করবে, নিজে ঘোষণা দেওয়া শরঈ আদবের বিপরীত।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (উপরোক্ত কুরআন হাদিছ ও মানতেক অনুযায়ী)

আল কুরআন ও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-এর নাস অনুযায়ীঃ-

ফতোয়া মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে

মানুষ কেবল বয়ানকারী।

“মুফতী” নামে ফখরের কোনো পদবীর বৈধ শরঈ ভিত্তি নেই।

ইলম থাকলে দায়িত্ব আছে, দাবি নয়।

Sunday, January 18, 2026

একই দিনে ও চাঁদ না দেখেও য়ী’দ করা নিয়ে প্রোপ্যাগান্ডার পোষ্ট মর্টেম ও ফতওয়া

একই দিনে ও চাঁদ না দেখেও য়ী’দ করা নিয়ে প্রোপ্যাগান্ডার পোষ্ট মর্টেম ও ফতওয়া

রায়ঃ খালি চোখে চাঁদ না দেখে হিসাবভিত্তিক হিজরি মাস নির্ধারণ বিদয়াত ও হারামমেঘলা হলে ৩০ দিন পূর্ণ না করে ২৯ দিনে মাস শুরু করা নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার হুকুমের বিরুদ্ধে অগ্রগামী হওয়াএছাড়াও একই দিনে সারা পৃথিবীতে রমাদ্বন, য়ীদ ও ক্বুরবানী পালন শরীয়ত-বিরোধী য়ামল; এই বিদয়াতি ত্বরীকাহ অনুসারে করা সময়নির্ভর য়ীবাদাত শরীয়তে মুহাম্মাদি অনুসারে বাতিল

ফতওয়ার বিষয়ঃ

(১) খালি চোখে চাঁদ না দেখে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবে হিজরি মাস নির্ধারণ বিদয়াত। (২) একই দিনে সারা পৃথিবীতে রমাদ্বন, য়ী, ক্বুরবানী পালন শরিয়ত-বিরোধী

প্রথমে আল ক্বুরআনের স্পষ্ট নাছ্বঃ অর্থাৎ স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন, চূড়ান্ত নির্দেশ (পবিত্র আল ক্বুরআন বা ছ্বহীহ হাদিছের এমন বক্তব্য যার বিপরীতে কোনো ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য নয়।)

মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ) হে মুওমিনগণ! মহান আল্লাহ তায়ালা ও উনার রছুল ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাদের সামনে অগ্রগামী হয়ো না (ছুরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১) উক্ত আয়াত শরীফের নাছ্ব অনুযায়ী যে বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা ও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম স্পষ্ট হুকুম দিয়েছেন, সেখানে কারো নিজস্ব পদ্ধতিসামনে আনা শরীয়তসম্মত নয়; স্পষ্ট নাছ্বের বিরুদ্ধে কোনো ইজতিহাদের সুযোগ থাকে না

মাস নির্ধারণে চাঁদের ব্যাপারে ক্বুরআনের সরাসরি নাছ্বঃ মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (یَسۡـَٔلُوۡنَكَ عَنِ الۡاَهِلَّۃِ ؕ قُلۡ هِیَ مَوَاقِیۡتُ لِلنَّاسِ وَ الۡحَجِّ) তারা আপনাকে নতুন চাঁদগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে (ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি বলে দিনঃ এগুলো মানুষের জন্য হজ্জ ও (য়ীবাদাতের) ওয়াক্ত নির্ধারণের মাধ্যম (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৯)

তাফছির ইবন জারীর ত্ববারী (রহিমাহুল্লাহ)-এর আলোকে উক্ত আয়াতের নয়া চাঁদ ও ওয়াক্ত শব্দগুলির স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন উক্ত আয়াতে পাক-এর আহিল্লা/চাঁদসমূহবলতে কেবল নতুন চাঁদের প্রথম রাত নয়; বরং চাঁদের উদয়, বৃদ্ধি, পূর্ণতা, ক্ষয়, অদৃশ্য হওয়া, চাঁদের পুরো পরিবর্তনশীল অবস্থা বোঝানো হয়েছে মহান আল্লাহ তায়ালা এই পরিবর্তনকে মানুষের জন্য মাওয়াক্বীতঅর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় ও মেয়াদ নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে স্থির করেছেন তাফছির অনুযায়ী, মানুষ চাঁদের এই অবস্থার মাধ্যমে, প্রত্যেক আরবি মাস, আইয়্যামুল্লাহ, রমাদ্বন শুরু ও শেষ করা, হজ্জ ও ক্বুরবানীর সময় নির্ধারন করা, নারীদের ইদ্দত নির্ধারণ করা, ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া বা পরিশোধের সময় জানা, ভাড়ার বা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া নির্ণয় করা, এমনকি কিছু বর্ণনায় তালাক ও হায়েজ-সংক্রান্ত সময়ও নির্ধারণ করাও এর অন্তর্ভুক্ত

অতএব, শরীয়ত আহিল্লাকে সময়/ওয়াক্ত নির্ধারণের মাধ্যম করেছেন; কোনো ক্যালেন্ডার-উদ্ভাবিত আর্টিফিশিয়াল সিদ্ধান্তকে নয়

রোজার শুরু ও শেষের বিষয়ে হাদিছের স্পষ্ট নাছ্বঃ রমাদ্বন শরীফ মাস শুরু-শেষের হুকুমকে একদম শর্তহিসেবে স্থির করে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ، وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ، فَإِنْ غُبِّيَ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا عِدَّةَ شَعْبَانَ ثَلاَثِينَ) চাঁদ দেখা গেলে তোমরা রোযা শুরু করো, আর চাঁদ দেখা গেলেই রোযা ভঙ্গ করো যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে তোমাদের কাছে চাঁদ আড়াল থাকে, তাহলে তোমরা শায়বান মাসের সংখ্যা পূর্ণ করে ত্রিশ দিন সম্পন্ন করো (ছ্বহীহ আল-বুখারী ১৯০৯) এখানে নাছ্বের শব্দ لِرُؤْيَتِهِঅর্থাৎ দেখার কারণে/দেখার ভিত্তিতেসুতরাং মাস নির্ধারণের শর'য়ী ভিত্তি হলো রুইয়াত”, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবনয়

এই একই হুকুমের নাছ্বের ভেতরেই মেঘলা অবস্থার বিধানও নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম চূড়ান্তভাবে বলে দিয়েছেনঃ (فَإِنْ غُبِّيَ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا عِدَّةَ شَعْبَانَ ثَلاَثِينَ) “যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে তোমাদের কাছে চাঁদ আড়াল থাকে, তাহলে তোমরা শায়বান মাসের সংখ্যা পূর্ণ করে ত্রিশ দিন সম্পন্ন করো এই নাছ্বের ফলে মেঘলা হলে কী করবোএখানে কোনো ইজতিহাদ অবশিষ্ট থাকে না; শরীয়তের নির্ধারিত ব্যাক-আপ হলো ৩০ দিন পূর্ণ করাঅতএব, মেঘলা অবস্থায় হিসাব বলছে চাঁদ উঠেছে, তাই মাস শুরুএটা এই নাছ্বের সরাসরি বিরোধিতা, কারণ নাছ্ব বলছে মেঘলা হলে ৩০ দিন পূর্ণ করো

উক্ত নাছ্বের সাথে আরেকটি হাদিছ শরীফের নাছ্ব পাওয়া যায়, যা ১০০% চাঁদ দেখার সম্ভবনা না থাকা স্বত্তেও হিসাব করে অমুক দিন সরকারী অনুসারে রোজা শুরু-শেষ, ক্বুরবানি, য়ী'দ পালন করা বাতিল বিদয়াতি য়া’মল।

হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (حَدَّثَنَا أَبُو مُوسَى، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ، عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ سِمَاكٍ، عَنْ عِكْرَمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: إِنِّي رَأَيْتُ الْهِلَالَ - يَعْنِي هِلَالَ رَمَضَانَ - فَقَالَ: "أَتَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ؟" قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: "أَتَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ؟" قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: "يَا بِلَالُ، أَذِّنْ فِي النَّاسِ فَلْيَصُومُوا غَدًا) আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন আবু মূছা রহমতুল্লাহ, তিনি বর্ণনা করেন আব্দুর রহমান রহমতুল্লাহ থেকে, তিনি সুফিয়ান রহমতুল্লাহ থেকে, তিনি সিমাক রহমতুল্লাহ থেকে, তিনি ইকরিমা রহমতুল্লাহ থেকে এবং তিনি ইবনে আব্বাস রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন; তিনি বলেনঃ এক বেদুইন নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-উনার নিকট এসে বললেন, “আমি নতুন চাঁদ দেখেছি (অর্থাৎ রমজানের চাঁদ)”নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে মহান আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই”? তিনি বললেন, “হ্যাঁ”নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে আমি মুহাম্মাদ মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রছুল”? তিনি বললেন, “হ্যাঁ”তখন নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, “হে বিলাল! মানুষের মাঝে ঘোষণা করে দাও যেন তারা আগামীকাল রোজা রাখে” (ছ্বহীহ ইবনে খুজাইমা ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯১০)

এই হাদিসের পূর্ণ ঘটনা এবং এর প্রেক্ষাপটঃ ঘটনাটি নিছক একটি সাক্ষ্য প্রদান ছিল না, বরং ইছলামিক মাস নির্ধারনের এটি ছিল একটি চূড়ান্ত নববী পদ্ধতি, এর বাহীরে গিয়ে যাই করা হবে তাই বিদয়াত বাতিল বলেই গন্য হবে।

প্রেক্ষাপটঃ সময়টি ছিল শা’য়বান মাসের ২৯ তারিখ দিবাগত রাতমদিনা শরীফের আকাশে চাঁদ দেখা নিয়ে সংশয় ছিলআকাশ মেঘলা থাকার কারণে মদিনা শরীফের সাধারণ মানুষ বা ছ্বহাবীগণ চাঁদ দেখতে পাননিফলে সবাই ধরে নিয়েছিলেন যে পরদিন রোজা হবে না এবং শা’য়বান মাস ৩০ দিন পূর্ণ হবে ঠিক সেই মুহূর্তে মদিনার বাইরের মরু অঞ্চল থেকে এক আ’য়রবি (বেদুইন বা গ্রাম্য লোক) নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-উনার দরবারে এসে হাজির হোনতিনি এসে দাবি করেন যে তিনি নতুন চাঁদ (হিলাল) দেখেছেন এইখানে এই বিষয় চূড়ান্তভাবে আজকের আকাশ মেঘে ঢাকা থাকলে টেলিস্কোপ লাগিয়ে জোর করে চাঁদ দেখে মাস শুরু-শেষ করাকে বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে, কেননা খোদ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হিসাব করেন নাই জ্যোতির্বিজ্ঞান দিয়ে, নাকি যারা আজকে এইসব করছে তারা এই আক্বিদাহ রাখে, “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-উনার এই জ্ঞান ছিলো না? বা উনার জামানায় জ্যোতির্বিজ্ঞান বলে কোন কিছুই ছিলোনা? রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নতুন চাঁদ কবে উঠবে এর কোন জ্ঞান ছিলোনা বলে ৩০ দিন পূর্ন করতেন? তাদের এই জ্ঞান হয়েছে তাই তারা নববী পদ্ধতীকে স্কিপ করে জ্যোতির্বিদদের ছুন্নতের অনুসরণ করছে?

অথচ ২৯ দিনের দিন আকাশ মেঘলা থাকার কারনে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ৩০ দিন পূর্ন করার নির্দেশ দিলেন, খাতা কলম নিয়ে হিসাবে বসেন নাই, অপরদিকে মদিনার মরুভূমির একজন বেদুইন যখন এসে বল্লেন যে আমি চাঁদ দেখেছি, তখন তিনি লোকটির বিশ্বস্ততা বা “ঈমানী মানদণ্ড” যাচাই করলেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-উনার প্রশ্নগুলো ছিল এমনঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামঃ “তুমি কি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” স্বীকার করো? বেদুইন বললেনঃ “হাঁ” রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আবারো বললেনঃ “তুমি কি সাক্ষ্য দাও আমি আল্লাহ তায়ালা উনার রছুল” বেদুইন বললেনঃ “হাঁ” অর্থাৎ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিশ্চিত হলেন যে লোকটি একজন মুছলিমএকজন মুছলিমের দেওয়া খবর (বিশেষ করে য়ী’বাদাতের বিষয়ে) সম্মানিত দ্বীন ইছলামে গ্রহণযোগ্য হয়ে গেলো কিয়ামত পর্যন্ত।

তাৎক্ষণিক পূর্বের সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা বাতিল করতে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম কোনো দ্বিধা করেননি। তিনি তৎক্ষণাৎ হযরত বিলাল রদ্বিআল্লাহু আনহুকে ডাকলেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেনঃ “হে বিলাল” মানুষের মাঝে ঘোষণা করে দাও, তারা যেন আগামীকাল অবশ্যই রোজা রাখে”। এই একটি ঘটনার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়ে গেল যে, রমজানের চাঁদ দেখার জন্য বিশাল জনসমষ্টির সাক্ষ্যও জরুরি নয়, যদি আকাশ মেঘলা থাকে তবে একজন বিশ্বস্ত মুছলিমের সাক্ষ্যই যথেষ্ট। কিন্তু য়ীলম থাকার পরেও জ্যোতির্বিদ্যার আলোকে মাস নির্ধারন করেন নাই।

এই পূর্ণ ঘটনা থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়ঃ

ব্যক্তিগত সাক্ষ্য বনাম রাষ্ট্রীয় প্রযুক্তিঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ওই ব্যক্তির চোখকে বিশ্বাস করেছেনতিনি কোনো টেলিস্কোপ বা অন্য শহরের খবরের জন্য অপেক্ষা করেননি

দ্রুত সিদ্ধান্তঃ দ্বীনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে কোনো কমিটি বা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন নেই যদি ক্বুরআন-ছুন্নাহর মূলনীতি সামনে থাকে

গ্রাম বনাম শহরঃ মদিনার শহরের ভেতরে চাঁদ দেখা যায়নি, কিন্তু মদিনার অদূরে মরুভূমিতে একই অঞ্চলে চাঁদ দেখা গিয়েছিলরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম সেই আঞ্চলিক চাঁদ দেখাকে গ্রহণ করেছেনএটি প্রমাণ করে যে ইছলাম “লোকাল সাইটিং” বা স্থানীয় দর্শনকে কতটা গুরুত্ব দেয়

দুই একজন ছাড়া উক্ত ইমামগণ সহ ৪ মাজহাবের সকল ফকিহগণ উক্ত হাদিছ শরীফটিকে নির্ভরযোগ্য মনে করেছেন এবং উনাদের কিতাবে স্থান দিয়েছেনঃ

-> ছ্বহীহ ইবনে খুজাইমা হাদিছ নং: ১৯১০, ইমাম ইবনে খুজাইমা এটিকে উনার ছ্বহীহ গ্রন্থে এনেছেন, যার অর্থ উনার মতে এটি ছ্বহীহ

-> ছ্বহীহ ইবনে হিব্বান হাদিছ নং: ৩৪৪১ তিনিও একে ছ্বহীহ বলেছেন

-> আল-মুস্তাদরাক আলাছ ছ্বহীহাইন, ইমাম হাকিম একে ছ্বহীহ বলেছেন এবং ইমাম যাহাবী উনার এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষণ করেছেন

-> ছুনানে আবু দাউদে ২৩৪০, ইমাম আবু দাউদ হাদিছ শরীফটি বর্ণনা করার পর কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করেননি, সুকুত ইখতিয়ার করেছেনউনার মূলনীতি অনুযায়ী, যা নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন না, তা “হাছান” বা য়া'মলযোগ্য

এছাড়াও স্পষ্ট নাছ্ব দ্বারা যেটা পাওয়া যায় সেটা হলোঃ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবকে শুরু-শেষের ভিত্তি বানানো বাতিল বলে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (إِنَّا أُمَّةٌ أُمِّيَّةٌ لَا نَكْتُبُ وَلَا نَحْسُبُ الشَّهْرُ هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا - وَعَقَدَ الإِبْهَامَ فِي الثَّالِثَةِ - وَالشَّهْرُ هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا) নিশ্চয়ই আমার উম্মতের অধিকাংশ উম্মি; (মাস গণনার বিষয়ে) আমরা লিখিও না এবং হিসাবও করি না মাস কখনো এমন হয়, কখনো এমন হয়, কখনো এমন হয় এ সময় তিনি তৃতীয়বারে বৃদ্ধাঙ্গুলি ভাঁজ করলেন, অর্থাৎ কোনো মাস কখনো ঊনত্রিশ দিনের হয়; আবার মাস কখনো এমন হয়, কখনো এমন হয়, কখনো এমন হয়, অর্থাৎ কোনো মাস ত্রিশ দিনেরও হয় (ছ্বহিহ বুখারী ১৯১৩, ছ্বহিহ মুছলিম ১০৮০) এই নাছ্বের মধ্যে الشَّهْرُশব্দ নিজেই প্রসঙ্গকে মাস নির্ধারণে লক করে দেয়; ফলে হিসাবকে মাস নির্ধারণের চূড়ান্ত ভিত্তিবানানো নবীজির ঘোষিত সুন্নাহ-বিরোধী পদ্ধতি

অতএব প্রথম সাবজেক্টের ফয়সালা স্পষ্ট নাছ্ব-ভিত্তিকভাবে এই দাঁড়ায়ঃ যে ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ রুইয়াতমেঘলা হলে ৩০ পূর্ণএই ছুন্নাহ-শর্ত বাদ দিয়ে শুধু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবকে মাস নির্ধারণের ভিত্তি বানায়, সে স্পষ্ট নাছ্বের বিরুদ্ধে গিয়ে নতুন নিয়ম স্থাপন করে; এটি বিদয়াত এবং হারাম কারণ এখানে কেবল সহায়ক তথ্যনয়, বরং নাছ্বের-স্থিরকৃত শর্তকে সরিয়ে দিয়ে বিকল্প ভিত্তি বসানো হচ্ছে, যা ছুরাহ (৪৯:১)-এর لَا تُقَدِّمُواএর আওতায়ও পড়ে

অতএব স্পষ্ট ফতওয়া হলোঃ চাঁদ খালি চোখে দেখেই যেকোন আরবি মাস শুরু করতে হবে, মেঘলা থাকলে হিসাব বা দূরবীন লাগিয়ে দেখে ২৯ দিনে মাস শেষ করা হারাম, য়ী’বাদাত করা বিদয়াতে ছাইয়্যিয়াহ

এখন দ্বিতীয় সাবজেক্টঃ একই দিনে সারা পৃথিবীতে রমাদ্বান, য়ী, ক্বুরবানী”-এর বিরোধিতা কেবল যুক্তিসঙ্গতই নয়, বরং ছ্বহীহ হাদিছ শরীফের সরাসরি নাছ্ব ছ্বহীহ মুছলিমে কুরাইব রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন তিনি শামে ছিলেন এবং সেখানে শুক্রবার রাতে চাঁদ দেখা হলো; পরে মদীনায় এসে ইবনে আব্বাস রদ্বিআল্লাহু আনহুকে জানালেন যে মু'য়াবিয়া রদ্বিআল্লাহু আনহু সহ শামের লোকেরা শুক্রবার রাতের রুইয়াতে রোযা শুরু করেছে ইবনে আব্বাস রদ্বিআল্লাহু আনহু বললেনঃ (لَكِنَّا رَأَيْنَاهُ لَيْلَةَ السَّبْتِ، فَلَا نَزَالُ نَصُومُ حَتَّى نُكْمِلَ ثَلَاثِينَ أَوْ نَرَاهُ) কিন্তু আমরা শনিবার রাতে চাঁদ দেখেছি; তাই আমরা রোযা পালন করতে থাকব, যতক্ষণ না ত্রিশ দিন পূর্ণ করি অথবা আবার চাঁদ দেখি কুরাইব রদ্বিআল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেনঃ (أَوَلَا تَكْتَفِي بِرُؤْيَةِ مُعَاوِيَةَ وَصِيَامِهِ؟) তাহলে কি মুআবিয়া ইবনু আবি সুফিয়ানএর চাঁদ দেখা এবং তাঁর রোযা রাখাই কি যথেষ্ট নয়? তখন ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু য়ানহু বললেনঃ (لَا، هَكَذَا أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَ آلِهِ وَسَلَّمَ) না; আমাদেরকে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এভাবেই পালনের নির্দেশ দিয়েছেন (ছ্বহিহ আবু দাউদ ২৩৩২, ছ্বহীহ মুছলিম ১০৮৭)

এই নাছ্ব দ্বারা প্রমাণিত যে শাম-মদীনার মতো নিকটবর্তী শহর (দামেশক থেকে মদীনা পর্যন্ত দূরত্ব আনুমানিক ১,৩০০-,৪০০ কিলোমিটার ছিলো) একই মুছলিম শাসন-পরিসরে থেকেও, ছ্বহাবায়ে কিরাম রদ্বিআল্লাহু আনহুমদের য়ামল ছিল স্থানীয়/অঞ্চলগত রুইয়াত অনুযায়ী; ফলে বিশ্বব্যাপী একদিনের আলাপ করাছুন্নাহ-সম্মত নয় যখন ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু, যিনি মুফাসসির ও মুহাদ্দিস ছ্বহাবী, শামের রুইয়াতকে মদীনার উপর একদিনে চাপাননি, তখন আজ আমাদের পক্ষে সারা পৃথিবী একদিনএমন ধৃষ্টতা দেখানো নাযায়েজ, হারাম, বাতিল, বিদয়াতি আক্বিদাহ

এখন মনগড়া দিনের য়ীবাদাত বাতিলকীভাবে হয়, এই অংশটি নাছ্ব দিয়ে স্থাপন করা প্রয়োজনঃ এখানেও ছ্বহীহ নাছ্ব আছে, যে সময়-শর্ত ভাঙলে য়ীবাদাত বাতিল হয় ছ্বহীহ বুখারী ও মুছলিমে এসেছে, এক ছ্বহাবী য়ীদের দিন নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছ্বলাতের আগে ক্বুরবানী করে ফেললে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (شَاتُكَ شَاةُ لَحْمٍ) “তোমারটা ক্বুরবানী নয়; এটা কেবল গোশত” (ছ্বহিহ আবু দাউদ ২৮০১) এই নাছ্ব প্রমাণ করেন, য়ীবাদাতের ক্ষেত্রে শরীয়ত নির্ধারিত সময়/শর্ত অতিক্রম বা লঙ্ঘন করলে, যা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নির্ধারন করে দিয়েছেন, উত্তম নিয়ত থাকলেও, য়ীবাদাত য়ীবাদাত হিসেবে গণ্য হয় না অতএব, রমাদ্বন/য়ীদ/ক্বুরবানীর মতো সময়নির্ভর ইবাদতে শরীয়তের নির্ধারিত ট্রিগার (রুইয়াত অথবা মেঘলা হলে ৩০ পূর্ণ) বাদ দিয়ে হিসাব-ভিত্তিক আগাম শুরুকরা হলে, তা একই উসূলের অধীনে পড়ে, য়ীবাদাতের শরীয়ত নির্ধারিত শর্তের বাইরে গিয়ে সংঘটিত হচ্ছে; ফলে তা বাতিল, বাতিল, বাতিল

চূড়ান্ত ফতোয়া এই যেঃ পবিত্র আল ক্বুরআন ও ছ্বহীহ হাদিছের স্পষ্ট নস দ্বারা প্রমাণিতঃ-

(ক) রমাদ্বান শুরু-শেষ এবং মাস নির্ধারণের শরঈ ভিত্তি হলেন রুইয়াত(খালি চোখে দেখা); মেঘলা হলে নাছ্বের হুকুম হলো ৩০ দিন পূর্ণ করা; সুতরাং খালি চোখে চাঁদ না দেখে কেবল হিসাবের উপর মাস নির্ধারণ বিদয়াত ও হারাম কেননা নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম যদি জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব নিতেন, তবে ওই বেদুইনের সাক্ষ্য দেওয়ার আগেই তিনি জানতেন চাঁদ উঠেছে কি নাকিন্তু তিনি হিসাবকে পাত্তা না দিয়ে “চোখে দেখা” (রু’ইয়াত)-কে দ্বীনি সিদ্ধান্ত বা “চূড়ান্ত ফয়সালা”র মানদণ্ড বানিয়েছেন

(খ) মদিনার মানুষ চাঁদ দেখেনি, কিন্তু মদিনার অদূরে একজন গ্রাম্য লোক চাঁদ দেখেছেননবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম পার্শ্ববর্তী এলাকার সেই সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেনতিনি কিন্তু পারস্য, সিরিয়া, রোম কিংবা সুদূর ইয়ামেন থেকে কোনো সংবাদ আসার অপেক্ষা করেননি আর ছ্বহীহ মুছলিমের কুরাইবইবনে আব্বাস রদ্বিআল্লাহু আনহুমার নাছ্ব দ্বারা প্রমাণিত, এক অঞ্চলের রুইয়াত অন্য অঞ্চলে বাধ্যতামূলকভাবে একদিনে চাপানো রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছুন্নাহ-এঁর বিপরীতে বিদয়াত; সুতরাং বিশ্বব্যাপী একই দিনে রমাদ্বান/য়ীদ/ক্বুরবানীশরীয়ত-বিরোধী বিদয়াতী য়ামল

(গ) সময়/শর্ত ভেঙে য়ীবাদাত করলে তা য়ীবাদাত হয় না, এর নাছ্ব شَاتُكَ شَاةُ لَحْمٍঅতএব বিদয়াতি ত্বরীকাহ অনুসারে মাস নির্ধারণ করে করা এই সময়নির্ভর য়ীবাদাত শরঈ মানদণ্ডে বাতিল

(ঘ) “ব্লাক-আউট” পরিস্থিতিতেঃ আজকে যারা প্রযুক্তি নির্ভর, ব্লাক-আউট হলে তারা কী করবে? বেদুইনের ঐ হাদিছ শরীফটিই তার উত্তর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সম্মানিত দ্বীন ইছলাম এতই সহজ যে, ইন্টারনেট, টেলিফোন, বিদ্যুৎ কোন কিছুর উপর নির্ভরশীল হতে হয়না, বরং ওই বেদুইন ব্যক্তির মতো একজন সাধারণ মুছলিমের চোখে দেখাই পুরো অঞ্চলে য়ী’বাদাত শুরু করার জন্য যথেষ্টযারা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে আরবি মাস শুরু-শেষ এর বিষয়ে, তারা আসলে ছুন্নতের এই স্বনির্ভর পদ্ধতিকে অস্বীকার করছে

Thursday, January 15, 2026

নফছের শেষ আঘাত টা কি?

নফছের শেষ আঘাত টা কি?

অনেক মানুষ মনে করে নফছের সবচেয়ে বড় চাল হলো গুনাহ। কিন্তু এটিই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। কারণ গুনাহ হলো নফছের প্রথম আঘাত, শেষ নয়। বাস্তবে নফছের শেষ চাল এতটাই সূক্ষ্ম যে সেখানে পৌঁছে মানুষ নিজেকেই সফল মনে করতে শুরু করে। সে ভাবে, এখন আমি বেঁচে গেছি, এখন আমি সামলে নিয়েছি, এখন আমার উপর নফছের আর কোনো প্রভাব নেই। আর ঠিক এই মুহূর্তেই নফছ তার শেষ আঘাতটি করে।

এই চাল চিৎকার করে আসে না। এটি নিঃশব্দে ক্বলবে আস্তানা গেড়ে নেয়। মানুষ টেরই পায় না যে সে ইতিমধ্যেই হেরে গেছে। অধিকাংশ মানুষ এই স্থানেই পড়ে যায়। কিন্তু তারা যেহেতু ইবাদতে থাকে, তাই তাদের মনে হয় তারা জিতে যাচ্ছে, পরাজয়ের চিন্তা-ফিকির তাদের ধারে কাছেও আসেনা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, নফছের সেই শেষ চালটি কী? নফছ মানুষকে কোন ভ্রান্ত ধারণায় ফেলে? আর এই বিষয়ে কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম কোন বিষয়ে সতর্ক করেছেন?

এই রহস্য তখনই খুলে যায়, যখন আমরা নফছের সেই শেষ দরজাটিকে বুঝতে পারি।

কামিল ছুফিয়ায়ে কেরামরা বলেন নফছের শেষ চাল এটা নয় যে সে মানুষকে গুনাহের দিকে নিয়ে যাবে; বরং তার শেষ চাল হলো মানুষকে নিজের ইছলাহি থেকে বেপরোয়া করে দেবে। এটি সেই মাক্বাম, যেখানে মানুষ গুনাহ ছেড়ে দিয়েছে, নামাজী হয়েছে, জাকির হয়েছে, নিজে দ্বীনের আলোচনা নছিহত করে দিন কাটায়, ঠিক তখন ক্বলবের ভেতরে এক নীরব কণ্ঠ জন্ম নেয়, “এখন আমার তোমার কোন নসিহতের দরকার নেই।”

এই কণ্ঠই নফছের শেষ চাল। নফছের সবচেয়ে ভয়ংকর ভ্রান্তি। এখানে নফছ অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি খেলা খেলে। সে মানুষের অন্তরে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেয়, আমি তো এখন ঠিক হয়ে গেছি, আমি তো অন্যদের থেকে আলাদা, এসব কথা সাধারণ মানুষের জন্য, আমার জন্য নয়।

কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, নফছের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো মানুষকে এই বিশ্বাসে পৌঁছে দেওয়া যে সে এখন নিরাপদ। কারণ যেদিন মানুষ নিজেকে নিরাপদ মনে করে, সেদিনই তার আত্মপর্যবেক্ষণ শেষ হয়ে যায়।

অনেকে এই কথা শুনে চমকে যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো নফছ ইবাদতের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে। নামাজে, জিকিরে, ইলমে, এমনকি নীরব নেকিতেও। নফছ বলে, আমি নিয়মিত, আমি খাঁটি, আমি লোক দেখানো করি না। আর যে নেকির ওপর হৃদয় নিশ্চিন্ত হয়ে যায়, সেটাই নফছের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে।

নফছের শেষ চালের একটি নীরব লক্ষণ হলো, নিজের চোখে অন্যদের দুর্বলতা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। সে নিজেকে কম কথা বলা মনে করে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অন্যদের হিসাব রাখে। মুখে কিছু বলে না, কিন্তু অন্তরে বিচার করতে থাকে। এটি সেই স্তর, যেখানে নফছ কথা বলে না, শুধু রায় ঘোষণা দেয়। আর এই বিচারপ্রবণতাই নফছের শেষ বিজয়।

যখন মানুষ নফছের শেষ চালে পড়ে যায়, তখন তার কাছে নসিহত ভারী মনে হয়। সে বলে, এগুলো তো বহুবার শোনা কথা, আমার সব জানা আছে, এসব বয়ান অন্যদের জন্য। কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, যে হৃদয়ে নসিহত বোঝা হয়ে যায়, বুঝে নিও সেখানে নফছ সিংহাসনে বসে গেছে। কারণ জীবিত হৃদয় সবসময় নসিহতের মুখাপেক্ষী থাকে।

নফছ তখন ভয়ংকর হয়ে ওঠে, যখন সে আর গুনাহের পথে থাকে না, বরং নেকির পথে চলতে চলতেই মানুষকে মহান আল্লাহ তায়ালা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এজন্যই দেখা যায়, কিছু মানুষ বাহ্যিকভাবে খুব ধার্মিক মনে হয়, কিন্তু তাদের হৃদয়ে কোমলতা নেই, দয়া নেই, বিনয় নেই। কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, যেখানে বিনয় শেষ হয়ে যায়, সেখানে যত ইবাদতই থাকুক নফছ জিন্দা থাকে।

যে ব্যক্তি নফছের শেষ চাল থেকে বাঁচতে চায়, তার একটি পরিচয় হলো সে নিজেকে সকল অবস্থায় ইছলাহীর মুখাপেক্ষী মনে করবে। সে কখনো বলবে না “আমি ঠিক আছি”; বরং বলবে “হে আল্লাহ তায়ালা, আমাকে রক্ষা করুন।” এই দোয়া নফছ সহ্য করতে পারে না।

নফছ সেদিনই হারে, যেদিন মানুষ নিজের নেকির থেকেও আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, বান্দা যখন নিজের নেকিকেও নিজের পক্ষে প্রমাণ বানায় না, তখন নফছ অসহায় হয়ে পড়ে।

নফছের শেষ চাল তখনই ব্যর্থ হয়, যখন মানুষ এমন একটি অবস্থা গ্রহণ করে, যেখানে নফছের কোনো অংশই অবশিষ্ট থাকে না। আর তা হলোঃ- সব অবস্থায় নিজেকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সামনে সম্পূর্ণ মুখাপেক্ষী মনে করা। এটি শুধু মুখের কথা নয়; এটি হৃদয়ের গভীরে নেমে আসা একটি অবস্থা।

নফছ ভয় পায়, কারণ সে কোনো না কোনো ভরসা চায়, কোনো দাবি চায়, কোনো ভিত্তি চায়। কিন্তু যখন বান্দা মেনে নেয়, আমার বোঝাপড়া অসম্পূর্ণ, আমার ইবাদত দুর্বল, মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রহমত ছাড়া আমি কিছুই নই, তখন নফছ দাঁড়ানোর জায়গা পায় না।

এখানেই আত্মনির্ভরতা আর তাওয়াক্কুলের সূক্ষ্ম পার্থক্য স্পষ্ট হয়। আত্মনির্ভরতা হলো আমি পারব। আর তাওয়াক্কুল হলো হে মহান আল্লাহ তায়ালা, আপনি না ধরলে আমি কিছুই নই। নফছ আত্মনির্ভরতায় বাঁচে, আর তাওয়াক্কুলে মারা যায়।

নফছের শেষ আশ্রয় হলো মানুষের নিজের মতামত। যখন মানুষ ভাবে, আমার ধারণাই ঠিক, আমি ভালো জানি, তখন নফছ বেঁচে থাকে। কিন্তু যেদিন সে বলে “হে মহান আল্লাহ তায়ালা, যদি আমার বুঝ আপনার হুকুমের বিরুদ্ধে যায়, তবে তা আমার থেকে কেড়ে নিন” - এই দোয়া নফছের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে।

কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, প্রকৃত নীরবতা মানে শুধু না বলা নয়; বরং নিজের মতকে পেছনে সরিয়ে রাখা। সব জায়গায় নিজের কথা না বলা, অধিকার থাকা সত্ত্বেও বিতর্কে না জড়ানো, সব সময় নিজেকে প্রমাণ না করা। এগুলো নফছের শিকড় কেটে দেয়।

নফছের মৃত্যুর একটি লক্ষণ হলোঃ- মানুষের চিন্তা বদলে যায়। সে আর ভাবে না “আমি কেমন দেখাচ্ছি”; বরং ভাবে “মহান আল্লাহ তায়ালা আমাকে কেমন দেখছেন, তিনি কি আমার উপর সন্তুষ্ট?” এই পরিবর্তন এলে বুঝে নিও নফছের শেষ চাল ব্যর্থ হয়েছে।

কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম বলতেনঃ- প্রতিদিন নিজেকে অপরাধী মনে করে দিন শুরু করো, আর মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রহমতের আশা নিয়ে দিন শেষ করো। এই আচরণ নফছকে আবার মাথা তুলতে দেয় না। কারণ নফছ হয় হতাশায় বাঁচে, নয়তো অহংকারে আর এই পথ দুটোই বন্ধ করে দেয়।

সবশেষে নফছ পুরোপুরি ভেঙে যায় তখনই, যখন মানুষ তার মুক্তিকে নিজের চেষ্টা নয়, বরং মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রহমতের সঙ্গে যুক্ত করে। যখন হৃদয় থেকে বলে “হে মহান আল্লাহ তায়ালা, আপনি না বাঁচালে আমি কিছুই নই।”

কুরআন অনুসারে, নফছ সেখানে বাদশাহ যেখানে মওজুদ থাকেন না ইলাহ, তাই ইকবালের ভাষায় আল্লাহ থেকে দূরে রাখে এমন তালীম ও ফিত্না, মাল, সম্পদ, আওলাদও ফিত্না, না হক্বের বিরুদ্ধে উঠা শমশির ও ফিত্না, শমশির তো কিয়া, নারায়ে তাকবীর ফিত্না।

আর সকল ফিত্নার মূল হলো এই নফছ, হে মহান আল্লাহ তায়ালা, আমাদের এক মুহূর্তের জন্যও আমাদের নফছের হাতে ছেড়ে দিয়েন না। আমাদের হৃদয়কে বিনয়ের মধ্যে জীবিত রাখুন। আপনার রহমত ছাড়া আর কোনো ভরসার ওপর আমাদের ছেড়ে দিয়েন না।

এইখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, নফছের সকল ওয়ার থেকে যিনি ব্যক্তিকে বাঁচাতে সাহায্য করেন তিনি হলেন মুর্শিদ। উপরে খোদা আর নিচে মুর্শিদ হলেন নফছের সবচেয়ে বড় দুষমন, তাই ইনছান যখন নফছের পূজারী হয় তখন উভয় খালিক-মাখলুক থেকে পালাতে থাকে। নফছ এমন এক চিজ, যে কেবল মুর্শিদে কামিলেই তাছলিম হয়, তার সম্মুখে কোনঃ হুজুর, মুল্লা, মুফিত, মুহাদ্দিস, ইমাম, মুস্তাহিদ, শায়েখের ও বেইল নাই কামিল মুর্শিদ ব্যতীত, তাই যাদের এই আকল আছে যে সে তার নফছকে কাবু করতে সক্ষম নয়, সে তার ডাক্তার তথা মুর্শিদে কামিলেই চিকিৎসা নিক।